বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জীবনের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ধ্যা সঙ্গীত’-এর (১৮৮২) অন্তর্গত একটি অত্যন্ত প্রখর মননশীল, বিদ্রোহী ও আত্মপ্রতিষ্ঠামূলক কবিতা হলো ‘অনুগ্রহ’। এই কবিতায় কবির তরুণের অহংকার, ঈশ্বরের তথাকথিত দয়া বা কৃপার (‘অনুগ্রহ’) প্রতি তীব্র অনীহা এবং প্রেমের স্বাধীন ও মহীয়ান সত্তার এক আপসহীন রূপ অত্যন্ত জোরালো ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | অনুগ্রহ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | সন্ধ্যা সঙ্গীত |
| প্রকাশের বছর | ১৮৮২ (১২৮৯ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | মননশীল, দ্রোহাত্মক ও আত্মিক গীতি-কবিতা (Contemplative, Rebellious and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
অনুগ্রহ – সম্পূর্ণ কবিতা
এই-যে জগৎ হেরি আমি,
মহাশক্তি জগতের স্বামী,
এ কি হে তোমার অনুগ্রহ?
হে বিধাতা কহো মোরে কহো।
ওই-যে সমুখে সিন্ধু, এ কি অনুগ্রহবিন্দু?
ওই-যে আকাশে শোভে চন্দ্র সূর্য গ্রহ,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তব অনুগ্রহ?
ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্র একজন
আমারে যে করেছ সৃজন,
এ কি শুধু অনুগ্রহ করে
ঋণপাশে বাঁধিবারে মোরে?
করিতে করিতে যেন খেলা
কটাক্ষে করিয়া অবহেলা,
হেসে ক্ষমতার হাসি অসীম ক্ষমতা হতে
ব্যয় কয়িয়াছ এক রতি
অনুগ্রহ করে মোর প্রতি?
শুভ্র শুভ্র জুঁই দুটি ওই-যে রয়েছে ফুটি
ও কি তব অতি শুভ্র ভালোবাসা নয়?
বলো মোরে, মহাশক্তিময়,
ওই-যে জোছনা-হাসি ওই-যে তারকারাশি,
আকাশে হাসিয়া ফুটে রয়,
ও কি তব ভালোবাসা নয়?
ও কি তব অনুগ্রহ-হাসি
কঠোর পাষাণ লৌহময়?
তবে হে হৃদয়হীন দেব,
জগতের রাজ-অধিরাজ,
হানো তব হাসিময় বাজ,
মহা অনুগ্রহ হতে তব
মুছে তুমি ফেলহ আমারে–
চাহি না থাকিতে এ সংসারে।
ভালোবাসি আপনা ভুলিয়া,
গান গাহি হৃদয় খুলিয়া,
ভক্তি করি পৃথিবীর মতো,
স্নেহ করি আকাশের প্রায়।
আপনারে দিয়েছি ফেলিয়া
আপনারে গিয়েছি ভুলিয়া
যারে ভালোবাসি তার কাছে
প্রাণ শুধু ভালোবাসা চায়।
সাক্ষী আছ তুমি অন্তর্যামী
কতখানি ভালোবাসি আমি,
দেখি যবে তার মুখ হৃদয়ে দারুণ সুখ
ভেঙে ফেলে হৃদয়ের দ্বার,
বলে, “এ কী ঘোর কারাগার!”
প্রাণ বলে, “পারি নে সহিতে,
এ দুরন্ত সুখেরে বহিতে।”
আকাশে হেরিলে শশী আনন্দে উথলি উঠি
দেয় যথা মহাপারাবার
অসীম আনন্দ উপহার,
তেমনি সমুদ্র-ভরা আনন্দ তাহারে দিই
হৃদয় যাহারে ভালোবাসে,
হৃদয়ের প্রতি ঢেউ উথলি গাহিয়া উঠে
আকাশ পুরিয়া গীতোচ্ছ্বাসে।
ভেঙে ফেলি উপকূল পৃথিবী ডুবাতে চাহে,
আকাশে উঠিতে চায় প্রাণ–
আপনারে ভুলে গিয়ে হৃদয় হইতে চাহে
একটি জগতব্যাপী গান।
তাহারে কবির অশ্রু হাসি
দিয়েছি কত-না রাশি রাশি,
তাহারি কিরণে ফুটিতেছে
হৃদয়ের আশা ও ভরসা
তাহারি হাসি ও অশ্রুজল
এ প্রাণের বসন্ত বরষা।
ভালোবাসি, আর গান গাই–
কবি হয়ে জন্মেছি ধরায়
রাত্রি এত ভালো নাহি বাসে,
উষা এত গান নাহি গায়।
ভালোবাসা স্বাধীন মহান,
ভালোবাসা পর্বতসমান।
ভিক্ষাবৃত্তি করে না তপন
পৃথিবীরে চাহে সে যখন–
সে চাহে উজ্জ্বল করিবারে,
সে চাহে উর্বর করিবারে,
জীবন করিতে প্রবাহিত,
কুসুম করিতে বিকশিত।
চাহে সে বাসিতে শুধু ভালো
চাহে সে করিতে শুধু আলো
স্বপ্নেও কি ভাবে কভু ধরা,
তপনেরে অনু-গ্রহ করা?
যবে আমি যাই তার কাছে
সে কি মনে ভাবে গো তখন
অনু-গ্রহ ভিক্ষা মাগিবারে
এসেছে ভিক্ষুক একজন?
অনু-গ্রহ পাষাণমমতা
করুণার কঙ্কাল কেবল,
ভাবহীন বজ্রে গড়া হাসি–
স্ফটিককঠিন অশ্রু-জল।
অনু-গ্রহ বিলাসী গবিত,
অনু-গ্রহ দয়ালু-কৃপণ–
বহু কষ্টে অশ্রুবিন্দু দেয়
শুষ্ক আঁখি করিয়া মন্থন।
নীচ হীন দীন অনু-গ্রহ
কাছে যবে আসিবারে চায়
প্রণয় বিলাপ করি উঠে–
গীতগান ঘৃণায় পলায়।
হে দেবতা, অনু-গ্রহ হতে
রক্ষা করো অভাগা কবিরে,
অপযশ অপমান দাও–
দুঃখ জ্বালা বহিব এ শিরে।
সম্পদের স্বর্ণকারাগারে,
গরবের অন্ধকার-মাঝ,
অনু-গ্রহ রাজার মতন
চিরকাল করুক বিরাজ।
সোনার শৃঙ্খল ঝংকারিয়া
গরবের স্ফীত দেহ লয়ে
অনু-গ্রহ আসে নাকো যেন
আমাদের স্বাধীন আলয়ে।
গান আসে ব’লে গান গাই,
ভালোবাসি ব’লে ভালোবাসি,
কেহ ,যেন মনে নাহি করে
মোরা কারো কৃপার প্রয়াসী।
নাহয় শুনো না মোর গান,
ভালেবাসা ঢাকা রবে মনে।
অনু-গ্রহ করে এই কোরো–
অনু-গ্রহ কোরো না এ জনে।
Romanized Version
- দয়া বা কৃপার প্রতি কবির বিদ্রোহ:“এ কি শুধু অনুগ্রহ করে / ঋণপাশে বাঁধিবারে মোরে? / করিতে করিতে যেন খেলা / কটাক্ষে করিয়া অবহেলা…”— ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতার অহংকার থেকে মানুষকে দয়া করা বা ‘অনুগ্রহ’ করার ধারণার বিরুদ্ধে কবি তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন। কবির কাছে এই অনুগ্রহ কোনো আশীর্বাদ নয়, বরং তা মানুষের আত্মমর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করার এক কৃত্রিম ঋণের জাল মাত্র।
- ভালোবাসার স্বাধীন ও মহীয়ান সত্তা:“ভালোবাসা স্বাধীন মহান, / ভালোবাসা পর্বতসমান। / … গান আসে ব’লে গান গাই, / ভালোবাসি ব’লে ভালোবাসি…”— প্রকৃতির সূর্য যেমন কাউকেও কৃপা না করে নিখিল বিশ্বকে আলো ও উর্বরতা দান করে, তেমনি মানুষের ভালোবাসাও সম্পূর্ণ স্বাধীন, মহৎ ও স্বতঃস্ফূর্ত। কবি কোনো করুণা বা কৃপার কাঙাল নন—তিনি গান গোন কারণ তাঁর মনে গান আসে, তিনি ভালোবাসেন কারণ তাঁর অন্তরে ভালোবাসা আছে।
- অনুগ্রহের কঠোর ও হীন রূপ:“অনুগ্রহ পাষাণমমতা / করুণার কঙ্কাল কেবল, / ভাবহীন বজ্রে গড়া হাসি– / স্ফটিককঠিন অশ্রু-জল।”— কবি অনুগ্রহ বা কৃপার রূপটিকে অত্যন্ত কঠোর, অহংকারী ও প্রাণহীন হিসেবে দেখেছেন। কৃপার দান বা অনুগ্রহের মধ্যে হৃদয়ের উষ্ণতা থাকে না, থাকে কেবল দাতার গাব্বিত অবস্থান।
- কৃপামুক্ত স্বাধীন জীবনের আকুতি:“হে দেবতা, অনু-গ্রহ হতে / রক্ষা করো অভাগা কবিরে, / অপযশ অপমান দাও– / দুঃখ জ্বালা বহিব এ শিরে। … অনু-গ্রহ কoro না এ জনে।”— কবি ঈশ্বরের কাছে কৃপা বা অনুগ্রহ ভিক্ষা করার চেয়ে শতগুণ বেশি অপমান, দুঃখ ও জ্বালা সইতে রাজি আছেন। তবুও তিনি কারো কৃপার পাত্র হতে চান না। তাঁর স্বাধীন আলয়ে যেন দয়ার শৃঙ্খল বা অনুগ্রহের প্রকাশ না ঘটে—এই অহংকার ও আত্মমর্যাদাবোধই এই কবিতার মূল বাণী।


![পূরবী কাব্যগ্রন্থের অপরিচিতা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অপরিচিতা oporichita [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/অপরিচিতা-oporichita-কবিতা--1024x536.gif)

![সন্ধ্যা সঙ্গীত কাব্যগ্রন্থের ‘অনুগ্রহ’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 অনুগ্রহ anugraha [ কবিতা ]- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/অনুগ্রহ-anugraha-কবিতা--1024x536.gif)

![মাতাল maataal [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 2 মাতাল maataal [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/মাতাল-maataal-কবিতা--1024x536.gif)
![ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের ‘পাগল’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 পাগল paagol [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/পাগল-paagol-কবিতা-1-1-1024x536.gif)
![শেষের কবিতা [ Shesher Kobita ] – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষের কবিতা [ Shesher Kobita ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/02/শেষের-কবিতা-1024x536.gif)

![পূরবী কাব্যগ্রন্থের না-পাওয়া কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর না-পাওয়া na paoya [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/না-পাওয়া-na-paoya-কবিতা--1024x536.gif)