পূরবী কাব্যগ্রন্থের অপরিচিতা কবিতা | Oporichita Kobita

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ পূরবী (১৯২৫) তাঁর পরিণত কাব্যচেতনার এক অনন্য প্রকাশ। পূরবী কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রেম, বিচ্ছেদ, স্মৃতি ও সংগীতের অন্তর্লীন সম্পর্ককে সূক্ষ্ম অনুভবে রূপ দিয়েছেন। এই গ্রন্থের অন্তর্গত “অপরিচিতা” কবিতাটি এক গভীর আত্মকথনমূলক রচনা—যেখানে কবি দেখা না-হওয়া এক সম্পর্কের স্মৃতি, সম্ভাবনা ও সংগীতময় উত্তরাধিকারকে কবিতার ভাষায় চিরস্থায়ী করে তুলেছেন। এখানে প্রেম বাস্তব মিলনে নয়, বরং অনুভব, কল্পনা ও গানের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকে।

অপরিচিতা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পথ বাকি আর নাই তো আমার, চলে এলাম একা,

        তোমার সাথে কই হল গো দেখা?

কুয়াশাতে ঘন আকাশ, ম্লান শীতের ক্ষণে

ফুল ঝরাবার বাতাস বেড়ায় কাঁপন-লাগা বনে।

সকল শেষের শিউলিটি  যেই ধুলায় হবে ধূলি,

সঙ্গিনীহীন পাখি যখন গান যাবে তার ভুলি,

        হয়তো তুমি আপন-মনে আসবে সোনার রথে

                  শুকনো পাতা ঝরা ফুলের পথে।

পুলক লেগেছিল মনে পথের নূতন বাঁকে

            হঠাৎ সেদিন কোন্‌ মধুরের ডাকে।

দূরের থেকে ক্ষণে-ক্ষণে রঙের আভাস এসে

গগন-কোণে চমক হেনে গেছে কোথায় ভেসে।

মনের ভুলে ভেবেছিলাম তুমিই বুঝি এলে

গন্ধরাজের গন্ধে তোমার গোপন মায়া মেলে —

      হয়তো তুমি এসেছিলে, যায় নি আড়ালখানা,

                  চোখের দেখায় হয় নি প্রাণের জানা।

হয়তো সেদিন তোমার আঁখির ঘন তিমির ব্যেপে

        অশ্রুজলের আবেশ গেছে কেঁপে।

হয়তো আমায় দেখেছিলে বাঁকিয়ে বাঁকা ভুরু,

বক্ষ তোমার করেছিল ক্ষণেক দুরু দুরু,

সেদিন হতে স্বপ্ন তোমার ভোরের আধো-ঘুমে

রঙিয়েছিল হয়তো ব্যথার রক্তিমকুঙ্কুমে —

     আধেক-চাওয়ায় ভুলে-যাওয়ায় হয়েছে জাল বোনা

                  তোমায় আমায় হয় নি জানাশোনা।

তোমার পথের ধারে ধারে তাই এবারের মতো

     রেখে গেলাম গান গাঁথিলাম যত।

মনের মাঝে বাজল যেদিন দূর চরণের ধ্বনি

সেদিন আমি গেয়েছিলাম তোমার আগমনী;

দখিন বাতাস ফেলেছে শ্বাস রাতের আকাশ ঘেরি,

সেদিন আমি গেয়েছি গান তোমার বিরহেরি;

     ভোরের বেলায় অশ্রুভরা অধীর অভিমান

                 ভৈরবীতে জাগিয়েছিল গান।

এ গানগুলি তোমার বলে চিনবে কখনো কি?

            ক্ষতি কী তায়, নাই চিনিলে সখী!

তবু তোমায় গাইতে হবে নাই তাহে সংশয়,

তোমার কন্ঠে বাজবে তখন আমার পরিচয় —

যারে তুমি বাসবে ভালো, আমার গানের সুরে

বরণ করে নিতে হবে সেই তব বন্ধুরে।

     রোদন খুঁজে ফিরবে তোমার প্রাণের বেদনখানি,

              আমার গানে মিলবে তাহার বাণী।

তোমার ফাগুন উঠবে জেগে, ভরবে আমের বোলে,

            তখন আমি কোথায় যাব চলে।

পূর্ণ চাঁদের আসবে আসর, মুগ্ধ বসুন্ধরা,

বকুলবীথির ছায়াখানি মধুর মূর্ছাভরা —

হয়তো সেদিন বক্ষে তোমার মিলন-মালা গাঁথা,

হয়তো সেদিন ব্যর্থ আশায় সিক্ত চোখের পাতা —

     সেদিন আমি আসব না তো নিয়ে আমার দান,

                তোমার লাগি রেখে গেলেম গান।

 

কবিতার ভাবধারা ও প্রেক্ষাপট

“অপরিচিতা” কবিতার সূচনাতেই এক নিঃসঙ্গ পথচলার দৃশ্য—কুয়াশাঘেরা আকাশ, শীতল বন, ঝরা পাতা—এই সব প্রকৃতি-চিত্র আসলে মনের ভেতরের শূন্যতা ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। কবি প্রশ্ন করেন, কোথায়, কবে, কীভাবে সেই অচেনা সত্তার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর নেই—আছে শুধু অনুভবের অনুরণন।

এখানে প্রেম কোনো নির্দিষ্ট স্মৃতির নয়; বরং হয়তো শব্দের পুনরাবৃত্তিতে গড়ে ওঠা সম্ভাবনার প্রেম। দেখা না-হওয়ার আক্ষেপ, অচেনা চোখের সম্ভাব্য অশ্রু, বুকের অজানা কম্পন—সব মিলিয়ে প্রেমটি রয়ে যায় অনির্দিষ্ট, অথচ গভীর।

গান, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ

এই কবিতায় সংগীত একটি মুখ্য রূপক। কবি বলেন—যে গানগুলো তিনি গেয়েছেন, সেগুলো হয়তো সেই অপরিচিতার আগমন, বিরহ ও অভিমানকে কেন্দ্র করেই রচিত। ভৈরবী রাগের উল্লেখ সংগীতের আবহকে আরও গভীর করে তোলে। গান এখানে কেবল শিল্প নয়—এটি স্মৃতি বহনের মাধ্যম, অনুভূতির আশ্রয়।

কবি নিশ্চিত জানেন, হয়তো সেই অপরিচিতা কখনোই তাঁকে চিনবে না। তবু তাঁর গান একদিন সেই প্রিয়জনের কণ্ঠে ধ্বনিত হবে—যে মানুষটিকে সে ভালোবাসবে, তার মধ্য দিয়েই কবির পরিচয় ফিরে আসবে। এভাবেই কবি নিজেকে গানের মধ্যে বিলীন করে দেন।

দার্শনিক তাৎপর্য

“অপরিচিতা” আমাদের শেখায়—

  • সব প্রেমের পরিণতি মিলনে হয় না
  • না-পাওয়া সম্পর্কও শিল্পের মাধ্যমে অমর হতে পারে
  • ব্যক্তিগত অনুভব সমষ্টিগত সংগীতে রূপ নিয়ে টিকে থাকে

রবীন্দ্রনাথ এখানে এক অনন্য আত্মত্যাগী প্রেমের দর্শন উপস্থাপন করেছেন—যেখানে নিজের উপস্থিতি নয়, প্রিয়ের আনন্দই মুখ্য।

“অপরিচিতা” পূরবী কাব্যগ্রন্থের এক অতুলনীয় রচনা, যেখানে প্রেম বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে সংগীত ও স্মৃতির আকাশে বিচরণ করে। দেখা না-হওয়া সম্পর্কের মধ্যেও যে গভীর সৌন্দর্য ও মানবিক সত্য লুকিয়ে থাকে—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতার মাধ্যমে সেটিকেই কাব্যিক ভাষায় উদ্‌যাপন করেছেন। শেষ পর্যন্ত কবির একমাত্র দান রয়ে যায়—গান

মন্তব্য করুন