ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের আদরিণী কবিতা | Adarinee Kobita

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “আদরিণী” কবিতাটি তাঁর কাব্যগ্রন্থ ছবি ও গান-এর অন্তর্গত এক অনন্য রচনা। ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ শব্দের সঙ্গে চিত্রকল্প ও সুরের আবেশ মিলিয়ে এক বিশেষ কাব্যভাষা নির্মাণ করেছিলেন। এই গ্রন্থের কবিতাগুলিতে প্রকৃতি, মানবমন ও কল্পনার জগৎ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছে।

“আদরিণী” কবিতায় কবি প্রকৃতির কোলে লালিত এক অচেনা, নিষ্পাপ ও স্নেহমাখা কন্যার রূপক এঁকেছেন। বন, পাতা, ফুল, আলো, পাখি, বাতাস ও তারা—সব মিলিয়ে এই কবিতা যেন মাতৃস্নেহে ঘেরা এক কোমল জীবনের কাব্যিক প্রতিচ্ছবি। এখানে আদরিণী কোনো নির্দিষ্ট মানুষ নয়; সে প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতির স্নেহে গড়ে ওঠা এক নির্ভার অস্তিত্ব। কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেম, মানবিক কোমলতা ও চিত্ররূপময় কাব্যভাবনার এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন।

আদরিণী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

একটুখানি সোনার বিন্দু, একটুখানি মুখ,

     একা একটি বনফুল ফোটে-ফোটে হয়েছে,

     কচি কচি পাতার মাঝে মাথা থুয়ে রয়েছে।

চার দিকে তার গাছের ছায়া, চার দিকে তার নিষুতি-

     চার দিকে তার ঝোপেঝাপে আঁধার দিয়ে ঢেকেছে,

বনের সে যে স্নেহের ধন আদরিণী মেয়ে,

    তারে বুকের কাছে লুকিয়ে যেন রেখেছে।

একটুখানি রূপের হাসি আঁধারেতে ঘুমিয়ে আলা,

     বনের স্নেহ শিয়রেতে জেগে আছে।

সুকুমার প্রাণটুকু তার কিছু যেন জানে না,

     চোখে শুধু সুখের স্বপন লেগে আছে।

একটি যেন রবির কিরণ ভোরের বেলা বনের মাঝে

     খেলাতেছিল নেচে নেচে,

নিরালাতে গাছের ছায়ে, আঁধারেতে শ্রান্তকায়ে

     সে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।

বনদেবী করুণ-হিয়ে তারে যেন কুড়িয়ে নিয়ে

     যতন করে আপন ঘরেতে।

থুয়ে কোমল পাতার ‘পরে মায়ের মতো স্নেহভরে

     ছোঁয় তারে কোমল করেতে।

ধীরি ধীরি বাতাস গিয়ে আসে তারে দোলা দিয়ে,

     চোখেতে চুমো খেয়ে যায়।

ঘুরে ফিরে আশেপাশে বার বার ফিরে আসে,

     হাতটি বুলিয়ে দেয় গায়।

 

একলা পাখি গাছের শাখে কাছে তোর বসে থাকে,

     সারা দুপুরবেলা শুধু ডাকে,

যেন তার আর কেহ নাই, সারা দিন একলাটি তাই

     স্নেহভরে তোরে নিয়েই থাকে।

ও পাখির নাম জানি নে, কোথায় ছিল কে তা জানে,

     রাতের বেলায় কোথায় চলে যায়,

দুপুরবেলা কাছে আসে- সারা দিন বসে পাশে

     একটি শুধু আদরের গান গায়।

রাতে কত তারা ওঠে, ভোরের বেলা চলে যায়-

     তোরে তো কেউ দেখে না,  জানে না।

এক কালে তুই ছিলি যেন ওদেরই ঘরের মেয়ে,

     আজকে রে তুই অজানা অচেনা।

নিত্যি দেখি রাতের বেলা একটি শুধু জোনাই আসে,

     আলো দিয়ে মুখপানে তোর চায়।

কে জানে সে কী যে করে! তারা-জন্মের কাহিনী তোর

     কানে বুঝি স্বপন দিয়ে যায়।

ভোরের বেলা আলো এল, ডাকছে রে তোর নামটি ধরে,

     আজকে তবে মুখখানি তোর তোল্‌,

     আজকে তবে আঁখিটি তোর খোল্‌,

লতা জাগে, পাখি জাগে গায়ের কাছে বাতাস লাগে,

     দেখি রে–ধীরে ধীরে দোল্‌ দোল্‌ দোল্‌।

মন্তব্য করুন