রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ কণিকা বাংলা সাহিত্যে ক্ষুদ্র কবিতার এক অনন্য সংকলন। কণিকা মূলত ছোট ছোট কাব্যরচনার ভাণ্ডার, যেখানে অল্প কথায় গভীর জীবনদর্শন, ব্যঙ্গ ও নৈতিক উপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে। এই গ্রন্থের অন্তর্গত “স্পর্ধা” কবিতাটি মাত্র কয়েকটি পঙ্ক্তিতে মানুষের অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনাকে তীক্ষ্ণ রসিকতায় উন্মোচিত করেছে। ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যেও এটি রবীন্দ্রনাথের তীক্ষ্ণ বোধ ও ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
স্পর্ধা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হাউই কহিল, মোর কী সাহস, ভাই,
তারকার মুখে আমি দিয়ে আসি ছাই!
কবি কহে, তার গায়ে লাগে নাকো কিছু,
সে ছাই ফিরিয়া আসে তোরি পিছু পিছু।

কবিতার ভাবার্থ ও বিশ্লেষণ
এই ক্ষুদ্র কবিতায় রবীন্দ্রনাথ এক চমৎকার রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন। “হাউই”—অর্থাৎ তুচ্ছ ও অস্থির সত্তা—নিজের সাহস জাহির করতে চায় আকাশের তারকার মুখে ছাই নিক্ষেপ করে। এখানে তারকা প্রতীক মহত্ত্ব, সত্য কিংবা অমর কীর্তির; আর ছাই প্রতীক ক্ষুদ্র অহংকার ও অর্থহীন আঘাতের।
কিন্তু কবির জবাব নির্মম সত্যে ভরা—তারকার গায়ে সেই ছাই লাগে না। মহত্ত্ব তুচ্ছ আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বরং সেই ছাই ফিরে আসে নিক্ষেপকারীর দিকেই। অর্থাৎ, অহংকারের আঘাত শেষ পর্যন্ত নিজের দিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়।
দার্শনিক তাৎপর্য
“স্পর্ধা” কবিতাটি আমাদের শেখায়—
- মহত্ত্ব ক্ষুদ্র বিদ্বেষে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না
- অহংকারের আঘাত শেষ পর্যন্ত নিজেরই অপমান
- সত্য ও কীর্তির সামনে তুচ্ছ সাহস হাস্যকর
রবীন্দ্রনাথ এখানে নীতিবাক্যের মতো সরল অথচ গভীর একটি সত্য উচ্চারণ করেছেন, যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরেই প্রযোজ্য।
মাত্র চারটি পঙ্ক্তিতে রচিত “স্পর্ধা” কবিতাটি কণিকা কাব্যগ্রন্থের এক উজ্জ্বল ব্যঙ্গরত্ন। অল্প কথায় মানুষের অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার পরিণতি যেভাবে কবি দেখিয়েছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতার মাধ্যমে মনে করিয়ে দেন—মহত্ত্বকে আঘাত করতে গিয়ে মানুষ আসলে নিজেকেই কলুষিত করে।