রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ চিত্রা (১৮৯৬) তাঁর কাব্যসাধনার এক স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ পর্বের প্রতিনিধিত্ব করে। উনিশ শতকের শেষভাগে রচিত এই গ্রন্থে কবি একদিকে যেমন তাঁর কাব্যভাষার সংযম ও দৃঢ়তা প্রতিষ্ঠা করেন, অন্যদিকে তেমনি প্রেম, আত্মমর্যাদা, মানবিক সম্পর্ক ও আত্মপ্রকাশের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচিত করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর মধ্যপর্বের কাব্যচর্চায় চিত্রা একটি সংহত, দীপ্ত ও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠস্বর হিসেবে বিশেষভাবে চিহ্নিত।
এই কাব্যগ্রন্থের মূল উপজীব্য নারী-চেতনা ও প্রেমের আত্মমর্যাদাপূর্ণ প্রকাশ। চিত্রা কেবল প্রেমের আবেগময়তা নয়, বরং প্রেমে আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে আত্মসম্মান ও ব্যক্তিসত্তার প্রশ্নকেও গুরুত্ব দেয়। এখানে প্রেম আর লীন হয়ে যাওয়ার নাম নয়; বরং প্রেমের মধ্য দিয়েই ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। এই দৃষ্টিভঙ্গি রবীন্দ্রনাথের পূর্ববর্তী রোমান্টিক আবেগপ্রবণতা থেকে এক ধরনের পরিণত বোধের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
চিত্রা কাব্যগ্রন্থে ভাষা সংযত, অলংকার সংক্ষিপ্ত এবং বক্তব্য দৃঢ়। এখানে অতিরিক্ত আবেগ বা অলংকারের ভার নেই; আছে স্পষ্ট উচ্চারণ ও সংহত ভাব। কবি প্রেমকে আদর্শিক বা অলীক করে তোলেননি—বরং মানবিক সম্পর্কের বাস্তবতা, আকাঙ্ক্ষা ও সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করেই তার সৌন্দর্যকে তুলে ধরেছেন। এই গ্রন্থে প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক একটি সমান অবস্থানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, যা সেই সময়ের সামাজিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চিত্রা-র নাট্যধর্মী ও সংলাপনির্ভর ভঙ্গি। অনেক কবিতায় কথোপকথনের মাধ্যমে ভাব প্রকাশ পেয়েছে, যা কবিতাগুলিকে জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ করে তোলে। এতে কবির নাট্যরুচি ও ভবিষ্যতের নাট্যসৃষ্টির পূর্বাভাসও ধরা পড়ে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, চিত্রা রবীন্দ্রনাথের কাব্যজগতে এক সংহত আত্মপ্রকাশের নিদর্শন। এটি প্রেমকে আবেগের সীমা ছাড়িয়ে আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ব ও মানবিক মর্যাদার আলোকে পুনর্বিবেচনা করেছে। বাংলা কাব্যধারায় চিত্রা তাই কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তার পরিণত রূপের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
চিত্রা কাব্যগ্রন্থ কবিতার তালিকা/সূচি
- চিত্রা
- সুখ
- জ্যোৎস্না রাত্রে
- প্রেমের অভিষেক
- সন্ধ্যা
- এবার ফিরাও মোরে
- দুঃসময়
- মৃত্যুর পরে
- অন্তর্যামী
- সাধনা
- ব্রাহ্মণ
- পুরাতন ভৃত্য
- দুই বিঘা জমি
- শীতে ও বসন্তে
- নগর-সংগীত
- পূর্ণিমা
- আবেদন
- ঊর্ব্বশী
- স্বর্গ হইতে বিদায়
- দিনশেষে
- সান্ত্বনা
- শেষ উপহার
- বিজয়িনী
- গৃহ-শত্রু
- মরীচিকা
- উৎসব
- প্রস্তর মূর্ত্তি
- নারীর দান
- জীবন দেবতা
- রাত্রে ও প্রভাতে
- ১৪০০ শাল
- নীরব তন্ত্রী
- দুরাকাঙ্ক্ষা
- প্রৌঢ়
- ধূলি
- সিন্ধু পারে