রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “খে’লা” কবিতাটি তাঁর শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত কাব্যগ্রন্থ ছড়ার ছবি (প্রকাশকাল: ১৯৩৭)–এর একটি উল্লেখযোগ্য রচনা। ছড়ার ছবি গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ সহজ ছন্দ, প্রাণবন্ত ভাষা ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃতি ও জীবনের গভীর সত্যকে শিশুমনের বোধগম্য করে তুলেছেন। এই কাব্যগ্রন্থে কাজ ও খেলার দ্বন্দ্ব নেই—বরং কাজের মধ্যেই খেলার ছন্দ, আর খেলার মধ্যেই কাজের শৃঙ্খলা ধরা পড়ে।
“খে’লা” কবিতায় কবি দেখিয়েছেন, এই জগতের শক্ত ও কঠোর নিয়মের মধ্যেও আনন্দ, কৌতুক ও লীলার অবকাশ আছে। বাতাস, আকাশ, সাগর, ঝরনা, পাহাড়—সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেও খেলায় মেতে ওঠে। কবিতাটি আমাদের শেখায়, বিশ্বচরাচর কেবল শ্রম ও গাম্ভীর্যের নয়; এর অন্তরে আছে সৃষ্টির হাসি, কৌতুক ও অবিরাম খেলাধুলার স্পন্দন।
খেলা khela [ কবিতা ] -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এই জগতের শক্ত মনিব সয় না একটু ত্রুটি,
যেমন নিত্য কাজের পালা তেমনি নিত্য ছুটি।
বাতাসে তার ছেলেখে’লা, আকাশে তার হাসি,
সাগর জুড়ে গদ্গদ ভাষ বুদ্বুদে যায় ভাসি।
ঝরনা ছোটে দূরের ডাকে পাথরগুলো ঠেলে–
কাজের সঙ্গে নাচের খেয়াল কোথার থেকে পেলে।
ঐ হোথা শাল, পাঁচশো বছর মজ্জাতে ওর ঢাকা–
গম্ভীরতায় অটল যেমন, চঞ্চলতায় পাকা।
মজ্জাতে ওর কঠোর শক্তি, বকুনি ওর পাতায়–
ঝড়ের দিনে কী পাগলামি চাপে যে ওর মাথায়।
ফুলের দিনে গন্ধের ভোজ অবাধ সারাক্ষণ,
ডালে ডালে দখিন হাওয়ার বাঁধা নিমন্ত্রণ।
কাজ ক’রে মন অসাড় যখন মাথা যাচ্ছে ঘুরে
হিমালয়ের খে’লা দেখতে এলেন অনেক দূরে।
এসেই দেখি নিষেধ জাগে কুহেলিকার স্তূপে,
গিরিরাজের মুখ ঢাকা কোন্ সুগম্ভীরের রূপে।
রাত্তিরে যেই বৃষ্টি হল, দেখি সকালবেলায়,
চাদরটা ওর কাজে লাগে চাদর-খোলার খে’লায়।
ঢাকার মধ্যে চাপা ছিল কৌতুক একরাশি,
প্রকাণ্ড এক হাসি।
