ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থ (১৮৮৪)

ছবি ও গান বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রারম্ভিক পর্বে রবীন্দ্রনাথের একটি তাৎপর্যপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রচিত এই গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে। কবির কাব্যসাধনার যে পর্যায়টিকে সমালোচকেরা “উন্মেষ পর্ব” নামে চিহ্নিত করেছেন, ছবি ও গান সেই পর্বেরই অন্তর্গত। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে নিজস্ব কাব্যভাষা ও অনুভবের জগৎ নির্মাণ করছেন—যেখানে প্রকৃতি, মানবমন ও জীবনের দৈনন্দিন অনুভূতি মিলিত হয়ে এক স্বতন্ত্র কাব্যধারা গড়ে তোলে।

কাব্যভাব ও বিষয়বস্তু

ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের প্রধান উপজীব্য মানবজীবনের হাসি–কান্নার কাহিনী। এখানে কবি মানুষের অন্তরজগতের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভূতি—আনন্দ, বেদনা, আশা, হতাশা, স্মৃতি ও বিচ্ছেদের রেশ—সবকিছুকেই সংবেদনশীল দৃষ্টিতে দেখেছেন। এই গ্রন্থে জীবনের নাটকীয়তা নেই, আছে জীবনের স্বাভাবিক ওঠানামা; ঠিক যেন দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যাবলি কবিতার ভাষায় রূপ পেয়েছে।

গ্রন্থের শিরোনামই ইঙ্গিত দেয় এর শিল্পভাবনার দিকে। ‘ছবি’ এখানে দৃশ্যমান জীবনের প্রতীক—মানুষের মুখ, আচরণ, সম্পর্ক ও পারিপার্শ্বিকতা। আর ‘গান’ হলো সেই দৃশ্যগুলির অন্তর্গত সুর—অর্থাৎ অনুভূতির ধ্বনি। এই দুইয়ের মিলনে কবিতাগুলি হয়ে ওঠে দৃশ্যধর্মী ও সংগীতধর্মী—যা পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

কবিজীবনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব

সন্ধ্যা সংগীত (১৮৮২) ও প্রভাত সংগীত (১৮৮৩)-এর পর ছবি ও গান রবীন্দ্রকাব্যে এক নতুন সংযোজন। সন্ধ্যার বিষণ্নতা ও প্রভাতের পুনর্জাগরণের পর এখানে কবি জীবনের বাস্তবতাকে আরও কাছ থেকে দেখছেন। মানবজীবনের সুখ-দুঃখকে তিনি আর কেবল ভাবগত স্তরে রাখছেন না; বরং দৃশ্য ও অনুভূতির সমন্বয়ে তাকে জীবন্ত করে তুলছেন।

ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের কবিতার সূচি

  • কে
  • সুখ স্বপ্ন
  • জাগ্রত স্বপ্ন
  • দোলা
  • একাকিনী
  • গ্রামে
  • আদরিণী
  • খেলা
  • ঘুম
  • বিদায়
  • বিরহ
  • সুখের স্মৃতি
  • যোগী
  • পাগল
  • মাতাল
  • বাদল
  • আর্ত্তস্বর
  • স্মৃতি-প্রতিমা
  • আবছায়া
  • আচ্ছন্ন
  • স্নেহময়ী
  • রাহুর প্রেম
  • মধ্যাহ্নে
  • পূর্ণিমায়
  • পোড়ো বাড়ি
  • অভিমানিনী
  • নিশীথ জগৎ
  • নিশীথ-চেতনা

 

ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাধনার উন্মেষপর্বে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এতে মানবজীবনের হাসি–কান্না, সহজ অনুভব ও অন্তরঙ্গ সুর একত্র হয়ে কবিতাকে দিয়েছে এক মানবিক গভীরতা। বাংলা কবিতায় এই গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথের পরিণত কাব্যভাষার পূর্বাভাস বহন করে—যেখানে জীবন নিজেই হয়ে ওঠে কবিতার প্রধান বিষয়।