রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ কণিকা বাংলা সাহিত্যে ক্ষুদ্র কবিতার এক অনন্য ভাণ্ডার। এই কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ অল্প কথায় গভীর জীবনদর্শন প্রকাশ করেছেন। কণিকা মূলত ছোট ছোট কবিতার সংকলন, যেখানে রূপক, উপমা ও সংলাপের মাধ্যমে দান, ত্যাগ, মানবতা ও আত্মিক আনন্দের মতো চিরন্তন বিষয়গুলো সংক্ষেপে অথচ তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই গ্রন্থের অন্তর্গত “দীনের-দান” কবিতাটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ—মাত্র দুটি পঙ্ক্তির সংলাপে কবি দানের প্রকৃত অর্থকে উন্মোচন করেছেন।
দীনের দান কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মরু কহে, অধমেরে এত দাও জল,
ফিরে কিছু দিব হেন কী আছে সম্বল?
মেঘ কহে, কিছু নাহি চাই, মরুভূমি,
আমারে দানের সুখ দান করো তুমি।
কবিতার ভাবার্থ ও বিশ্লেষণ
এই ক্ষুদ্র কবিতায় রবীন্দ্রনাথ মরুভূমি ও মেঘের সংলাপের মাধ্যমে দানের এক গভীর দর্শন তুলে ধরেছেন। মরুভূমি নিজেকে “অধম” বলে চিহ্নিত করে জানায়—তার কাছে প্রতিদান দেওয়ার মতো কিছুই নেই। এটি আসলে দীন মানুষের আত্মবোধ, যে নিজেকে অযোগ্য মনে করে সাহায্য গ্রহণে সংকোচ বোধ করে।
কিন্তু মেঘের উত্তরেই কবিতার মূল দর্শন প্রকাশ পায়। মেঘ কোনো প্রতিদান চায় না; সে শুধু দানের আনন্দ চায়। এখানে কবি স্পষ্ট করে দেন—প্রকৃত দান কখনো লেনদেনের হিসাব করে না। দানের পরিমাপ গ্রহীতার সামর্থ্যে নয়, দাতার আনন্দে।
দার্শনিক তাৎপর্য
“দীনের-দান” কবিতায় রবীন্দ্রনাথ মানবতাবাদের এক মৌলিক সত্য উচ্চারণ করেছেন—
- দান দয়ার প্রকাশ, বিনিময়ের নয়
- দীন মানুষের গ্রহণও দাতার জন্য এক আশীর্বাদ
- দানের শ্রেষ্ঠ ফল হলো দানের সুখ নিজেই
এই দৃষ্টিভঙ্গি দানকে অহংকার থেকে মুক্ত করে, তাকে করে তোলে আত্মিক উপলব্ধির পথ।
মাত্র চারটি পঙ্ক্তিতে রচিত “দীনের-দান” কবিতাটি কণিকা কাব্যগ্রন্থের এক উজ্জ্বল রত্ন। এই কবিতা আমাদের শেখায়—দীনকে দেওয়া মানে তাকে ঋণী করা নয়, বরং নিজেকে মানবিক আনন্দে সমৃদ্ধ করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ক্ষুদ্র কবিতা তাই আকারে ছোট হলেও তার বাণী ব্যাপক ও চিরন্তন।