রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ মানসী বাংলা সাহিত্যে তাঁর মধ্যপর্বের কাব্যচিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মানসী কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতি, মানবমন, আধ্যাত্মিকতা ও জীবনের গভীর নৈতিক প্রশ্নকে কাব্যিক আখ্যানের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এই গ্রন্থের অন্তর্গত “নিষ্ফল উপহার” কবিতাটি একটি কাহিনিনির্ভর দার্শনিক রচনা, যেখানে দান ও উপহারের প্রকৃত মূল্য, শিষ্যত্ব ও আসক্তির দ্বন্দ্ব, এবং আত্মিক উপলব্ধির গুরুত্ব অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
Table of Contents
নিষ্ফল উপহার কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিম্নে আবর্তিয়া ছুটে যমুনার জল–
দুই তীরে গিরিতট, উচ্চ শিলাতল।
সংকীর্ণ গুহার পথে মূর্ছি জলধার
উন্মত্ত প্রলাপে ওঠে গর্জি অনিবার।
এলায়ে জটিল বক্র নির্ঝরের বেণী
নীলাভ দিগন্তে ধায় নীল গিরিশ্রেণী।
স্থির তাহা, নিশিদিন তবু যেন চলে–
চলা যেন বাঁধা আছে অচল শিকলে।
মাঝে মাঝে শাল তাল রয়েছে দাঁড়ায়ে,
মেঘেরে ডাকিছে গিরি ইঙ্গিত বাড়ায়ে।
তৃণহীন সুকঠিন শতদীর্ণ ধরা,
রৌদ্রবন বনফুলে কাঁটাগাছ ভরা।
দিবসের তাপ ভূমি দিতেছে ফিরায়ে–
দাঁড়ায়ে রয়েছে গিরি আপনার ছায়ে
পথশূন্য, জনশূন্য, সাড়া-শব্দ-হীন।
ডুবে রবি, যেমন সে ডুবে প্রতিদিন।
রঘুনাথ হেথা আসি যবে উত্তরিলা
শিখগুরু পড়িছেন ভগবৎ লীলা।
রঘু কহিলেন নমি চরণে তাঁহার,
“দীন আনিয়াছে, প্রভু, হীন উপহার।’
বাহু বাড়াইয়া গুরু শুধায়ে কুশল
আশিসিলা মাথায় পরশি করতল।
কনকে মাণিক্যে গাঁথা বলয়-দুখানি
গুরুপদে দিলা রঘু জুড়ি দুই পাণি।
ভূমিতল হইতে বালা লইলেন তুলে,
দেখিতে লাগিলা প্রভু ঘুরায়ে অঙ্গুলে।
হীরকের সূচীমুখ শতবার ঘুরি
হানিতে লাগিল শত আলোকের ছুরি।
ঈষৎ হাসিয়া গুরু পাশে দিলা রাখি,
আবার সে পুঁথি-‘পরে নিবেশিলা আঁখি।
সহসা একটি বালা শিলাতল হতে
গড়ায়ে পড়িয়া গেল যমুনার স্রোতে।
“আহা আহা” চীৎকার করি রঘুনাথ
ঝাঁপায়ে পড়িল জলে বাড়ায়ে দু হাত।
আগ্রহে সমস্ত তার প্রাণমনকায়
একখানি বাহু হয়ে ধরিবারে যায়।
বারেকের তরে গুরু না তুলিলা মুখ,
নিভৃত অন্তরে তাঁর জাগে পাঠসুখ।
কালো জল কটাক্ষিয়া চলে ঘুরি ঘুরি,
যেন সে ছলনাভরা সুগভীর চুরি।
দিবালোক চলে গেল দিবসের পিছু
যমুনা উতলা করি না মিলিল কিছু।
সিক্তবস্ত্রে রিক্তহাতে শ্রান্তনতশিরে
রঘুনাথ গুরু-কাছে আসিলেন ফিরে।
“এখনো উঠাতে পারি’ করজোড়ে যাচে,
“যদি দেখাইয়া দাও কোন্খানে আছে।’
দ্বিতীয় কঙ্কণখানি ছুঁড়ি দিয়া জলে
গুরু কহিলেন, “আছে ওই নদীতলে।’
কবিতার প্রেক্ষাপট ও প্রকৃতির ভূমিকা
কবিতার শুরুতেই কবি যমুনা নদী, গিরিশ্রেণী, গুহাপথ ও নির্জন প্রকৃতির এক গম্ভীর ও নাটকীয় পরিবেশ নির্মাণ করেছেন। প্রবল স্রোত, সংকীর্ণ পথ ও নীরব পাহাড়—সব মিলিয়ে এই প্রকৃতি যেন মানুষের অন্তর্গত সংকট ও পরীক্ষার প্রতীক। এই পরিবেশেই রঘুনাথ নামের শিষ্য তাঁর গুরুর কাছে উপস্থিত হন।
উপহারের ঘটনা ও শিষ্যের আকুলতা
রঘুনাথ বিনয়ের সঙ্গে গুরুর চরণে একজোড়া মূল্যবান স্বর্ণ-রত্নখচিত বলয় নিবেদন করেন। বাহ্যত এটি এক মূল্যবান উপহার, কিন্তু গুরু তার প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখান না। তিনি সামান্য দৃষ্টি দিয়ে এক পাশে রাখেন। হঠাৎ একটি বলয় যমুনার স্রোতে পড়ে গেলে রঘুনাথ আতঙ্কে ও আবেগে জলে ঝাঁপ দেন সেটি উদ্ধার করতে।
রঘুনাথের এই চেষ্টা কেবল একটি বস্তু উদ্ধারের প্রয়াস নয়—এটি তার বস্তুর প্রতি আসক্তি ও দানের প্রত্যাশার প্রকাশ।
গুরুর নীরব শিক্ষা
গুরু এই পুরো ঘটনায় নীরব থাকেন। তিনি রঘুনাথের চেষ্টা থামান না, সাহায্যও করেন না। সময় গড়িয়ে যায়, সন্ধ্যা নামে, কিন্তু বলয় আর পাওয়া যায় না। অবশেষে ক্লান্ত, ভেজা ও শূন্য হাতে রঘুনাথ ফিরে আসে।
তখন গুরু আরেকটি বলয় জলে ছুড়ে দিয়ে বলেন—
“আছে ওই নদীতলে।”
এই একটিমাত্র বাক্যেই কবিতার গভীরতম শিক্ষা নিহিত।
দার্শনিক তাৎপর্য
এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করে দেন—
দান যদি প্রত্যাশা ও আসক্তি থেকে আসে, তবে তা নিষ্ফল
গুরুর কাছে উপহারের মূল্য বস্তুতে নয়, শিষ্যের চেতনায়
প্রকৃত শিক্ষা শব্দে নয়, অভিজ্ঞতায়
রঘুনাথ বোঝে—যা সে দিতে চেয়েছিল, তা সে আসলে ছেড়ে দিতে পারেনি। তাই সেই উপহার গ্রহণযোগ্য হয়নি।
সাহিত্যিক গুরুত্ব
“নিষ্ফল উপহার” মানসী কাব্যগ্রন্থের অন্যতম গভীর কাহিনিকবিতা। প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার মেলবন্ধনে এটি এক অনন্য রূপক, যেখানে গুরুশিষ্য সম্পর্কের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ মানবমনের সূক্ষ্ম দুর্বলতাকে তুলে ধরেছেন।
