কথা ও কাহিনী কাব্যগ্রন্থের পণরক্ষা কবিতা । Ponrokkha Kobita

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ কথা ও কাহিনী বাংলা সাহিত্যের কাহিনিনির্ভর কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। এই গ্রন্থে কবি ইতিহাস, উপকথা ও মানবিক নৈতিকতার সমন্বয়ে একের পর এক কাব্যনাট্য নির্মাণ করেছেন। কথা ও কাহিনী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “পণরক্ষা” কবিতাটি বীরত্ব, আনুগত্য ও ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞার এক গভীর ট্র্যাজেডি। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় গল্পগুচ্ছ (১৩০৭ বঙ্গাব্দ)-এ। এখানে রবীন্দ্রনাথ ইতিহাসের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে একটি চিরন্তন প্রশ্ন তুলেছেন—রাজাদেশ বড়, না ব্যক্তিগত পণ ও নৈতিক দায়?

পণরক্ষা কবিতা । ponrokkha kobita । কথা ও কাহিনী কাব্যগ্রন্থ । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পণরক্ষা

“মারাঠা দস্যু আসিছে রে ওই,

করো করো সবে সাজ’

আজমীর গড়ে কহিলা হাঁকিয়া

দুর্গেশ দুমরাজ।

বেলা দু’পহরে যে যাহার ঘরে

সেঁকিছে জোয়ারি রুটি,

দুর্গতোরণে নাকাড়া বাজিছে

বাহিরে আসিল ছুটি।

প্রাকারে চড়িয়া দেখিল চাহিয়া

দক্ষিণে বহু দূরে

আকাশ জুড়িয়া উড়িয়াছে ধুলা

মারাঠি অশ্বখুরে।

“মারাঠার যত পতঙ্গপাল

কৃপাণ-অনলে আজ

ঝাঁপ দিয়া পড়ি ফিরে নাকো যেন’

গর্জিলা দুমরাজ।

মাড়োয়ার হতে দূত আসি বলে,

“বৃথা এ সৈন্যসাজ,

হেরো এ প্রভুর আদেশপত্র

দুর্গেশ দুমরাজ!

সিন্দে আসিছে, সঙ্গে তাঁহার

ফিরিঙ্গি সেনাপতি–

সাদরে তাঁদের ছাড়িবে দুর্গ

আজ্ঞা তোমার প্রতি।

বিজয়লক্ষ্মী হয়েছে বিমুখ

বিজয়সিংহ-‘পরে–

বিনা সংগ্রামে আজমীর গড়

দিবে মারাঠার করে।’

“প্রভুর আদেশে বীরের ধর্মে

বিরোধ বাধিল আজ’

নিশ্বাস ফেলি কহিলা কাতরে

দুর্গেশ দুমরাজ।

মাড়োয়ার-দূত করিল ঘোষণা,

“ছাড়ো ছাড়ো রণসাজ।’

রহিল পাষাণ-মুরতি-সমান

দুর্গেশ দুমরাজ।

বেলা যায় যায়, ধূ ধূ করে মাঠ,

দূরে দূরে চরে ধেনু–

তরুতলছায়ে সকরুণ রবে

বাজে রাখালের বেণু।

“আজমীর গড় দিলা যবে মোরে

পণ করিলাম মনে,

প্রভুর দুর্গ শত্রুর করে

ছাড়িব না এ জীবনে।

প্রভুর আদেশে সে সত্য হায়

ভাঙিতে হবে কি আজ!’

এতেক ভাবিয়া ফেলে নিশ্বাস

দুর্গেশ দুমরাজ।

রাজপুত সেনা সরোষে শরমে

ছাড়িল সমর-সাজ।

নীরবে দাঁড়ায়ে রহিল তোরণে

দুর্গেশ দুমরাজ।

গেরুয়া-বসনা সন্ধ্যা নামিল

পশ্চিম মাঠ-পারে;

মারাঠি সৈন্য ধুলা উড়াইয়া

থামিল দুর্গদ্বারে।

“দুয়ারের কাছে কে ওই শয়ান,

ওঠো ওঠো, খোলো দ্বার।’

নাহি শোনে কেহ–প্রাণহীন দেহ

সাড়া নাহি দিল আর।

প্রভুর কর্মে বীরের ধর্মে

বিরোধ মিটাতে আজ

দুর্গদুয়ারে ত্যজিয়াছে প্রাণ

দুর্গেশ দুমরাজ।

 

 

কবিতার কাহিনি : আজমীর দুর্গ ও দুর্গেশ দুমরাজ

কবিতার পটভূমি রাজপুতানার আজমীর দুর্গ। মারাঠা আক্রমণের সংবাদে দুর্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। দুর্গাধ্যক্ষ দুর্গেশ দুমরাজ দৃঢ় কণ্ঠে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বান জানান। চারদিকে ধূলোর ঝড়, অশ্বক্ষুরের শব্দ—আসন্ন যুদ্ধের ভীতি স্পষ্ট।

কিন্তু হঠাৎই মোড় নেয় পরিস্থিতি। মাড়োয়ার থেকে আগত দূত জানায়—প্রভুর আদেশে বিনা যুদ্ধে দুর্গ মারাঠাদের হাতে তুলে দিতে হবে। এখানে শুরু হয় কবিতার মূল দ্বন্দ্ব—প্রভুর আদেশ বনাম বীরের ধর্ম

নৈতিক সংকট ও প্রতিজ্ঞার ভার

দুমরাজ স্মরণ করেন তাঁর অতীত পণ—

“প্রভুর দুর্গ শত্রুর করে
ছাড়িব না এ জীবনে।”

প্রভুর আদেশ সত্য, কিন্তু সেই আদেশ মানতে গেলে ভাঙতে হবে নিজের প্রতিজ্ঞা। এই দ্বন্দ্বে তিনি বিদ্রোহ করেন না, আদেশ অমান্যও করেন না। বরং গ্রহণ করেন তৃতীয় পথ—আত্মবিসর্জন

রাজপুত সেনারা নীরবে সরে যায়। সন্ধ্যার গেরুয়া আলোয় মারাঠা সৈন্যরা দুর্গদ্বারে এসে দেখে—দ্বার অখোলা, আর প্রহরায় দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গেশ দুমরাজ প্রাণহীন।

পণরক্ষার তাৎপর্য

দুমরাজের মৃত্যু কোনো পরাজয় নয়; এটি প্রতিজ্ঞার বিজয়। তিনি প্রভুর আদেশ ভাঙেননি, আবার নিজের পণও ভাঙেননি। নিজের জীবন দিয়েই তিনি দ্বন্দ্বের মীমাংসা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখিয়েছেন—

  • বীরত্ব মানে কেবল যুদ্ধ করা নয়
  • আনুগত্য মানে অন্ধ সমর্পণ নয়
  • নৈতিকতা কখনো কখনো আত্মত্যাগ দাবি করে

 

 

সাহিত্যিক গুরুত্ব

“পণরক্ষা” কবিতাটি কথা ও কাহিনী কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শক্তিশালী বীররসাত্মক রচনা। এর ভাষা দৃঢ়, চিত্রকল্প নাটকীয় এবং সমাপ্তি গভীরভাবে করুণ। কবিতাটি রাজনীতি ও নৈতিকতার সংঘাতে ব্যক্তিমানুষের অবস্থানকে প্রশ্ন করে—যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

মন্তব্য করুন