রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর শেষ জীবনের কাব্যচিন্তার এক গভীর সংকলন হলো পরিশেষ। এই কাব্যগ্রন্থে কবি জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে অস্তিত্ব, দায়, সংসার ও ঈশ্বর-চেতনার দিকে গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে ফিরে তাকিয়েছেন। পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “মিলন” কবিতাটি এক অন্তর্মুখী প্রার্থনা—যেখানে মানবজীবনের দুঃখ, ব্যর্থতা ও ভারের দায় ঈশ্বরের উপর আরোপ না করে কবি আত্মসমর্পণ ও সমন্বয়ের পথে অগ্রসর হন। এখানে মিলন মানে কেবল আবেগের একতা নয়, বরং দ্বন্দ্বহীন অস্তিত্বে উত্তরণ।
Table of Contents
মিলন ১ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমারে দিব না দোষ। জানি মোর ভাগ্যের ভ্রূকুটি,
ক্ষুদ্র এই সংসারের যত ক্ষত, যত তার ত্রুটি,
যত ব্যথা আঘাত করিছে তব পরম সত্তারে
অহরহ। জানি যে তুমি তো নাই ছাড়ায়ে আমারে
নির্লিপ্ত সুদূর স্বর্গে। আমি মোর তোমাতে বিরাজে;
দেওয়া-নেওয়া নিরন্তর প্রবাহিত তুমি-আমি-মাঝে
দুর্গম বাধারে অতিক্রমি। আমার সকল ভার
রাত্রিদিন রয়েছে তোমারি ‘পরে, আমার সংসার
সে শুধু আমারি নহে। তাই ভাবি এই ভার মোর
যেন লঘু করি নিজবলে, জটিল বন্ধনডোর
একে একে ছিন্ন করি যেন, মিলিয়া সহজ মিলে
দ্বন্দ্বহীন বন্ধহীন বিচরণ করি এ নিখিলে
না চেয়ে আপনা-পানে। অশান্তিরে করি দিলে দূর
তোমাতে আমাতে মিলি ধ্বনিয়া উঠিবে এক সুর।

কবিতার ভাবধারা : দোষারোপ থেকে দায়গ্রহণ
কবিতার সূচনাতেই কবি স্পষ্ট ঘোষণা করেন—
“তোমারে দিব না দোষ।”
জীবনের ক্ষুদ্র সংসারে যত ক্ষত, ত্রুটি ও আঘাত—তার জন্য ঈশ্বরকে দায়ী করার প্রবণতা কবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি উপলব্ধি করেন, এই দুঃখ ঈশ্বরের পরম সত্তাকেও আঘাত করে চলেছে, অথচ তিনি মানুষকে ছেড়ে কোথাও সরে যাননি। ঈশ্বর কোনো “নির্লিপ্ত সুদূর স্বর্গে” অবস্থানকারী সত্তা নন—বরং মানুষের মধ্যেই তাঁর বিরাজ।
এই উপলব্ধি থেকেই কবিতার কেন্দ্রীয় বোধ জন্ম নেয়—মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যে আছে নিরন্তর দেওয়া-নেওয়ার প্রবাহ।
সংসারের ভার ও মিলনের আকাঙ্ক্ষা
কবিতার দ্বিতীয় অংশে কবি বলেন—জীবনের দুর্গম বাধা অতিক্রম করতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, তাঁর সমস্ত ভার ঈশ্বরের ওপরেই ন্যস্ত। সংসার কেবল ব্যক্তিগত বোঝা নয়—তা এক বৃহত্তর মানবিক দায়। এই দায় হালকা করতে কবি চান—
- জটিল বন্ধন একে একে ছিন্ন করতে
- দ্বন্দ্ব ও অশান্তি দূর করে সহজ মিলনে পৌঁছাতে
- আত্মকেন্দ্রিকতার গণ্ডি ভেঙে নিখিলের সঙ্গে একাত্ম হতে
এখানে “মিলন” মানে ব্যক্তিগত মুক্তি নয়; এটি এক সার্বজনীন সামঞ্জস্য।
দার্শনিক তাৎপর্য
“মিলন” কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের পরিণত দর্শনের স্পষ্ট উচ্চারণ—
- ঈশ্বরকে দোষারোপ নয়, নিজের দায় স্বীকারই মুক্তির পথ
- সংসার ও আধ্যাত্মিকতা পরস্পরবিরোধী নয়
- দ্বন্দ্বহীন সুরে মিলিত হওয়াই চূড়ান্ত শান্তি
শেষ পঙ্ক্তির ইঙ্গিত অনুযায়ী—অশান্তি দূর হলে, মানুষ ও ঈশ্বরের মিলনে একটি সুর ধ্বনিত হবে—যা ব্যক্তিগত নয়, সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গীত।
“মিলন” কবিতাটি পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের এক সংযত, গভীর ও প্রার্থনামুখর রচনা। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের ভার, ব্যথা ও দ্বন্দ্বকে অস্বীকার না করে সেগুলোকেই মিলনের পথে রূপান্তর করতে চান। এই কবিতা আমাদের শেখায়—দোষারোপ নয়, আত্মসমর্পণই সত্যিকারের মিলন।