রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ পূরবী (১৯২৫) তাঁর পরিণত কাব্যচেতনার এক অনুপম দলিল। পূরবীতে প্রেম, বিচ্ছেদ, স্মৃতি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি একসূত্রে মিশে আছে—যেখানে ব্যক্তিগত অনুভব ধীরে ধীরে বিশ্বচেতনায় উত্তীর্ণ হয়। এই গ্রন্থের অন্তর্গত “মিলন” কবিতাটি জীবনের সীমান্তে দাঁড়িয়ে দেখা এক অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতার কাব্যরূপ—যেখানে জীবন-মরণের স্রোত থেমে গিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের, আর মানুষের সঙ্গে অসীমের মিলন ঘটে।
Table of Contents
মিলন কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবন-মরণের স্রোতের ধারা
যেখানে এসে গেছে থামি
সেখানে মিলেছিনু সময়হারা
একদা তুমি আর আমি।
চলেছি আজ একা ভেসে
কোথা যে কত দূর দেশে,
তরণী দুলিতেছে ঝড়ে–
এখন কেন মনে পড়ে
যেখানে ধরণীর সীমার শেষে
স্বর্গ আসিয়াছে নামি
সেখানে একদিন মিলেছি এসে
কেবল তুমি আর আমি।
সেখানে বসেছিনু আপন-ভোলা
আমরা দোঁহে পাশে পাশে।
সেদিন বুঝেছিনু কিসের দোলা
দুলিয়া উঠে ঘাসে ঘাসে।
কিসের খুশি উঠে কেঁপে
নিখিল চরাচর ব্যেপে,
কেমনে আলোকের জয়
আঁধারে হল তারাময়,
প্রাণের নিশ্বাস কী মহাবেগে
ছুটেছে দশদিক্গামী–
সেদিন বুঝেছিনু যেদিন জেগে
চাহিনু তুমি আর আমি।
বিজনে বসেছিনু আকাশে চাহি
তোমার হাত নিয়ে হাতে।
দোঁহার কারো মুখে কথাটি নাহি,
নিমেষ নাহি আঁখিপাতে।
সেদিন বুঝেছিনু প্রাণে
ভাষার সীমা কোন্খানে,
বিশ্বহৃদয়ের মাঝে
বাণীর বীণা কোথা বাজে,
কিসের বেদনা সে বনের বুকে
কুসুমে ফোটে দিনযামী–
বুঝিনু যবে দোঁহে ব্যাকুল সুখে
কাঁদিনু তুমি আর আমি।
বুঝিনু কী আগুনে ফাগুন-হাওয়া
গোপনে আপনার দাহে,
কেন-যে অরুণের করুণ চাওয়া
নিজেরে মিলাইতে চাহে,
অকূলে হারাইতে নদী
কেন যে ধায় নিরবধি,
বিজুলি আপনার বাণে
কেন যে আপনারে হানে,
রজনী কী খেলা যে প্রভাত-সনে
খেলিছে পরাজয়কামী–
বুঝিনু যবে দোঁহে পরান-পণে
খেলিনু তুমি আর আমি।
সীমান্তের স্মৃতি : যেখানে সময় থেমে যায়
কবিতার সূচনাতেই কবি আমাদের নিয়ে যান এক স্মৃতিক্ষণে—যেখানে জীবন-মরণের স্রোত এসে থেমে যায়। সেই সীমান্তে একদা মিলেছিল “তুমি আর আমি”—সময়হারা হয়ে। এখন কবি একা ভেসে চলেছেন ঝড়ের মধ্যে; তরণী দুলছে। তবু স্মৃতি ফিরে আসে সেই স্থানে, যেখানে ধরণীর সীমার শেষে স্বর্গ নেমে এসেছিল। মিলন এখানে কোনো পার্থিব ঠিকানা নয়—এ এক অন্তর্গত প্রান্তর।
নিঃশব্দ সহাবস্থান : ভাষার অতীত উপলব্ধি
কবি স্মরণ করেন—সেদিন দু’জনে পাশে পাশে বসে ছিলেন, আপনভোলা। কথার প্রয়োজন ছিল না, চোখের পলকও পড়েনি। সেই নীরবতাতেই ধরা দিয়েছিল ভাষার সীমা—কোথায় ভাষা থামে, কোথায় বিশ্বহৃদয়ের বীণা বাজে। আলো কীভাবে অন্ধকারকে তারাময় করে, প্রাণের নিশ্বাস কীভাবে দশদিকে ছুটে যায়—এই সব প্রশ্নের উত্তর মিলেছিল দেখায় নয়, জাগরণে।
ব্যথা ও আনন্দের একাকারতা
কবিতার মধ্যভাগে আনন্দ ও বেদনা একাকার। বনের বুকে কুসুমে যে বেদনা ফোটে, ফাগুন-হাওয়ার যে গোপন দাহ—সেসবের মানে ধরা দেয় তখনই, যখন দু’জন ব্যাকুল সুখে কেঁদে ওঠেন। এখানে কান্না দুর্বলতা নয়; তা গভীর প্রাপ্তির স্বাক্ষর। নদী কেন অকূলে ছুটে যায়, বিজলি কেন নিজের বাণে নিজেকেই আঘাত করে—এই আত্মদহনই মিলনের অন্তর্লীন তীব্রতা।
খেলার দর্শন : পরাজয়ের মধ্যেই পূর্ণতা
শেষ স্তবকে রাত ও ভোরের খেলা—পরাজয়কামী রজনীর সঙ্গে প্রভাতের সহাবস্থান—মিলনের আরেক রূপ দেখায়। জীবনের খেলায় জিত-হার মিলেমিশে যায়; দু’জন “পরান-পণে” খেলেন—এ খেলায় পরাজয় মানেই সমর্পণ, আর সমর্পণেই পূর্ণতা।
দার্শনিক তাৎপর্য
“মিলন” কবিতাটি আমাদের শেখায়—
- মিলন কেবল প্রেমের ঘটনা নয়, চেতনার জাগরণ
- নীরবতা ভাষার চেয়েও গভীর সত্য বহন করে
- আনন্দ ও বেদনা একই অভিজ্ঞতার দুই দিক
- সীমার প্রান্তেই অসীমের দেখা মেলে
“মিলন” পূরবী কাব্যগ্রন্থের এক গভীর, স্মৃতিময় ও দার্শনিক রচনা। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখান—জীবনের ঝড়ের মাঝেও এমন এক মুহূর্ত থাকে, যেখানে সময় থেমে যায়, ভাষা নীরব হয়, আর মানুষ অসীমের সঙ্গে একাকার হয়ে ওঠে। সেই মিলন কোনো দিন ফুরোয় না—সে স্মৃতির ভিতর দিয়ে আজও আলোকিত করে পথ।