রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে—কবির সৃষ্টিজীবনের শেষ পর্বের এক গভীর আত্মসন্ধানী পর্যায়ে। এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ প্রেম, ব্যর্থতা, নীরবতা, আত্মসংকোচ ও মানবচেতনার দ্বন্দ্বকে সূক্ষ্ম প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। বিচিত্রতা নামটির মধ্যেই আছে বহুমুখী অনুভবের ইঙ্গিত—এখানে আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে অনিবার্য ক্ষতি ও অপূর্ণতার বেদনাও। এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত “হার” কবিতাটি সেই ব্যর্থতা ও অপূর্ণতার এক গভীর মানবিক রূপক, যেখানে ব্যক্তিগত প্রেমের মুহূর্তে এসে হঠাৎ ঢুকে পড়ে বাইরের জগতের ক্ষুদ্র কিন্তু তীব্র উত্তেজনা।
কবিতার পটভূমি রচিত হয়েছে এক বিশেষ রাতে—শুক্লা একাদশী। লাজুক রাত, বটগাছের ছায়া, নদীর কালো জল, জোৎস্নার নরম আলো—সব মিলিয়ে এক নিবিড়, স্বীকারোক্তির অনুকূল পরিবেশ। দিনের বেলায় যে ফুল তার গন্ধ লুকিয়ে রাখে, রাতে সে আর সংযম মানে না—এই উপমার মধ্য দিয়ে কবি বোঝান, কিছু অনুভূতি সময় এলেই নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। কবির মনেও তেমনই এক গভীর কথা জমে ছিল, যা আজ মুক্তি পাবে বলে তিনি ভেবেছিলেন।
এই রাতেই কবির প্রত্যাশা ছিল এক অন্তরঙ্গ মিলনের—এক চূড়ান্ত স্বীকৃতির। মালাবদলের প্রতীক, চরম মন্ত্র, অভিষেক—সবই প্রেমের পূর্ণতার ইঙ্গিত। কিন্তু সেই মুহূর্তে হঠাৎই দৃশ্যপট বদলে যায়। প্রিয় মানুষটি ক্রুদ্ধ চোখে জানায়—খেলার মাঠে তাদের দলের হার হয়েছে। এই ‘হার’ এখানে শুধু খেলাধুলার পরাজয় নয়; এটি জীবনের অসংখ্য ক্ষুদ্র ঘটনার প্রতীক, যা বড় অনুভূতির মুহূর্তে এসে সমস্ত আবহ ভেঙে দেয়।
কবিতার মূল ট্র্যাজেডি এখানেই—যে মুহূর্তে হৃদয় সর্বস্ব দিতে প্রস্তুত, সেই সময়ে তুচ্ছ বাস্তবতার হস্তক্ষেপ। প্রেমের গভীর ভাষা উচ্চারিত হওয়ার আগেই তা থেমে যায়। নিদ্রাবিহীন কোকিলের কুহু ডাক যেন এই অপূর্ণতারই প্রতিধ্বনি—রাত শেষ হয়, কিন্তু কথা বলা হয় না।
“হার” কবিতাটি আমাদের শেখায়, জীবনে সব ব্যর্থতা মহাকাব্যিক নয়। অনেক সময় ছোট ছোট ‘হার’ এসে বড় সম্ভাবনাকে নীরবে হারিয়ে দেয়। বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের অন্যান্য কবিতার মতোই, এখানে রবীন্দ্রনাথ মানবজীবনের সেই সূক্ষ্ম বেদনাকে ধরেছেন, যা শব্দের আড়ালেই থেকে যায়।
হার কবিতা বিচিত্রতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শুক্লা একাদশী।
লাজুক রাতের ওড়না পড়ে খসি
বটের ছায়াতলে,
নদীর কালো জলে।
দিনের বেলায় কৃপণ কুসুম কুণ্ঠাভরে
যে-গন্ধ তার লুকিয়ে রাখে নিরুদ্ধ অন্তরে
আজ রাতে তার সকল বাধা ঘোচে,
আপন বাণী নিঃশেষিয়া দেয় সে অসংকোচে।
অনিদ্র কোকিল
দূর শাখাতে মুহুর্মুহু খুঁজতে পাঠায় কুহুগানের মিল।
যেন রে আর সময় তাহা’র নাই,
এক রাতে আজ এই জীবনের শেষ কথাটি চাই।
ভেবেছিলেম সইবে না আজ লুকিয়ে রাখা
বদ্ধ বাণীর অস্ফুটতায় যে-কথা মোর অর্ধাবরণ-ঢাকা।
ভেবেছিলেম বন্দীরে আজ মুক্ত করা সহজ হবে,
ক্ষুদ্র বাধায় দিনে দিনে রুদ্ধ যাহা ছিল অগৌরবে।
সে যবে আজ এল ঘরে
জোৎস্নারেখা পড়েছে মোর ‘পরে
শিরীষ-ডালের ফাঁকে ফাঁকে।
ভেবেছিলেম বলি তাকে–
“দেখো আমায়, জানো আমায়, সত্য ডাকে আমায় ডেকে লহো,
সবার চেয়ে গভীর যাহা নিবিড় ভাষায় সেই কথাটি কহো।
হয় নি মোদের চরম মন্ত্র পড়া,
হয় নি পূর্ণ অভিষেকের তীর্থজলের ঘড়া,
আজ হয়ে যাক মালাবদল যে-মালাটি অসীম রাত্রিদিন
রইবে অমলিন।’
হঠাৎ বলে উঠল সে-যে, ক্রুদ্ধ নয়ন তার–
গড়ের মাঠে তাদের দলের হার হয়েছে, অন্যায় সেই হার।
বারে বারে ফিরে ফিরে খেলাহারের গ্লানি
জানিয়ে দিল ক্লান্তি নাহি মানি।
বাতায়নের সমুখ থেকে চাঁদের আলো নেমে গেল নীচে,
তখনো সেই নিদ্রাবিহীন কোকিল কুহরিছে।
