রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর পরিণত সৃষ্টিপর্বের কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে। এই কাব্যগ্রন্থে কবি জীবনের বাহ্যিক আচার ও অন্তর্গত সত্যের মধ্যেকার সূক্ষ্ম ব্যবধানকে গভীর দার্শনিক সংবেদনশীলতায় অনুসন্ধান করেছেন। নারীজীবন, সামাজিক রীতি, আত্মপ্রকাশ ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন এখানে নতুন তাৎপর্য পায়। “প্রকাশিতা” কবিতাটি সেই অনুসন্ধানেরই এক অনন্য নিদর্শন—যেখানে বিবাহের দৃশ্যকে কেন্দ্র করে নারীর ভবিষ্যৎ আত্মউন্মোচনের এক আশাবাদী ও গম্ভীর চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।
কবিতার শুরুতে আমরা দেখি এক নববধূকে—“আজ তুমি ছোটো বটে”—যার পরিচয় যেন অন্যের সঙ্গে “গাঁঠছড়া বাঁধা”। অধিকারবোধে ভর করে স্বামী তাকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়; সমাজের চোখে সে এখন কারও ছায়া, কারও আশ্রিত অস্তিত্ব। কবি এই অবস্থাকে রূপকের মাধ্যমে চিহ্নিত করেন—তামালগাছ ও মাধবীলতার সম্পর্কের মতো, যেখানে লতা গাছের অবলম্বনে থাকে।
রাঙা চেলি, ঘোমটা, শাঁখের ধ্বনি—সবই বিবাহের চেনা অনুষঙ্গ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই বাহ্যিক আবরণের মধ্যেই দেখতে পান এক “গূঢ় জয়ধ্বনি”। আজ যে নারী সংকোচে আবৃত, ভবিষ্যতে সে-ই নিজের মহিমা নিয়ে অন্তরে স্বাধীন হবে—এই বিশ্বাস কবিতার গভীরে প্রবাহিত। কবির দৃষ্টিতে, নারীর সত্যিকারের প্রকাশ বাহ্যিক স্বাধীনতার চেয়েও অন্তর্গত আত্মবোধে নিহিত।
কবিতার পরবর্তী অংশে ভবিষ্যতের সেই মুহূর্তের ইঙ্গিত আসে—যেদিন সে সংকোচের আবরণ সরিয়ে বলবে, “দেখো মোরে!” তখন তার আত্মপ্রকাশ হবে নিঃশব্দ অথচ দীপ্ত। গোধূলির ধূসরতা পেরিয়ে বসন্তের আকাশে যেমন একা জাগে পূর্ণচন্দ্র, তেমনি নারীর ব্যক্তিত্বও ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায়। এখানে প্রকৃতির চিত্রকল্পের সঙ্গে মানবজীবনের বিকাশ একাকার হয়ে যায়।
শেষ পংক্তিগুলিতে কবি দেখান, এই প্রকাশ কোনো বিদ্রোহী উচ্চারণ নয়—বরং স্বাভাবিক বিকাশ। যেমন তরু ও লতা পরস্পরের আলিঙ্গনে পূর্ণতা পায়, তেমনি নারী নিজের দেহ ও মনে আত্মমর্যাদার সত্য উপলব্ধি করে।
“প্রকাশিতা” কবিতা তাই কেবল একটি বিবাহচিত্র নয়; এটি নারীর অন্তর্গত শক্তি, ধৈর্য ও ভবিষ্যৎ আত্মপ্রতিষ্ঠার কাব্যিক ঘোষণা। বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের সামগ্রিক দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নীরবতার মধ্যেও এক গভীর প্রকাশ অপেক্ষা করে থাকে, সময় এলেই যা দীপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রকাশিতা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ তুমি ছোটো বটে, যার সঙ্গে গাঁঠছড়া বাঁধা
যেন তার আধা।
অধিকারগর্বভরে
সে তোমারে নিয়ে চলে নিজঘরে।
মনে জানে তুমি তার ছায়েবানুগতা–
তমাল সে, তার শাখালগ্ন তুমি মাধবীর লতা।
আজ তুমি রাঙাচেলি দিয়ে মোড়া
আগাগোড়া,
জড়োসড়ো ঘোমটায়-ঢাকা
ছবি যেন পটে আঁকা।
আসিবে-যে আর-একদিন,
নারীর মহিমা নিয়ে হবে তুমি অন্তরে স্বাধীন
বাহিরে যেমনি থাক্।
আজিকে এই-যে বাজে শাঁখ
এরি মধ্যে আছে গূঢ় তব জয়ধ্বনি।
জিনি লবে তোমার সংসার, হে রমণী,
সেবার গৌরবে।
যে-জন আশ্রয় তব তোমারি আশ্রয় সেই লবে।
সংকোচের এই আবরণ দূর ক’রে
সেদিন কহিবে– দেখো মোরে!
সে দেখিবে ঊর্ধ্বে মুখ তুলি
সৃপ্ত হয়ে পড়ে গেছে ধূসর সে কুণ্ঠিত গোধূলি–
দিগন্তের ‘পরে স্মিতহাসে
পূর্ণচন্দ্র একা জাগে বসন্তের বিস্মিত আকাশে।
বুঝিবে সে দেহে মনে।
প্রচ্ছন্ন হয়েছে তরু পুষ্পিত লতার আলিঙ্গনে
আরও দেখুনঃ
