কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর পরিণত বয়সের কাব্যভাবনার এক অনন্য প্রকাশ হলো বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থ। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ইতিহাস, স্মৃতি, প্রেম ও মানবচেতনার গভীর স্তরকে রূপক ও কল্পনার আলোয় নতুনভাবে উন্মোচন করেছেন। বিচিত্রতা–র কবিতাগুলিতে সময় যেন সরলরৈখিক নয়—অতীত, বর্তমান ও স্মৃতির স্তর একে অপরের মধ্যে মিশে যায়। “পুষ্পচয়িনী” কবিতাটি এই প্রবণতার এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কাব্যময় উদাহরণ, যেখানে নারীচরিত্র, ইতিহাস ও স্মৃতির সম্মিলনে এক রহস্যময় সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়েছে।
“হে পুষ্প-চয়িনী”—এই সম্বোধনের মধ্য দিয়েই কবি পাঠককে নিয়ে যান এক অতীতমুখী কল্পনার জগতে। উজ্জয়িনীর স্মৃতি, মালিনীছন্দ, বকুল ও অশোক—সব মিলিয়ে কবিতার পরিসর হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গভীর। পুষ্পচয়িনী যেন কেবল বর্তমানের নারী নন; তিনি অতীতজন্মের স্মৃতি বহনকারী এক সত্তা, যাঁর সাজ, ভঙ্গি ও আচরণে বহু যুগের আভাস লুকিয়ে আছে। তাঁর নূপুরধ্বনি, পদচারণা ও ফুল তোলার ভঙ্গি যেন ইতিহাসের নিঃশব্দ পদচিহ্ন।
কবিতায় বারবার ফিরে আসে বিস্মৃত প্রেমের ইঙ্গিত। যে ফুল দিয়ে একদিন বিরহ গোনা হয়েছিল, তার নাম আজ হারিয়ে গেছে বিস্মৃতিতে—তবু সেই অনুভূতি রয়ে গেছে দেহভঙ্গি ও আচরণের মধ্যে। কবি অনুভব করেন, পুষ্পচয়িনীর বর্তমান পরিচয় সম্পূর্ণ নয়; তার মধ্যে অতীতের কোনো অচেনা প্রিয়জনের স্মৃতি এখনো নিঃশব্দে জেগে আছে। মালতীশাখার নিচে হাত তোলার মুহূর্তটি কেবল ফুল তোলার নয়—তা যেন যুগান্তর পেরিয়ে আসা এক দৃষ্টির আহ্বান।
এই কবিতায় নারীদেহ ও প্রকৃতি একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। লতার সঙ্গে দেহভঙ্গির মিল, মাঘীপূর্ণিমার রাত, বাতাসে ভেসে থাকা অদৃশ্য ভালোবাসা—সব মিলিয়ে কবিতাটি হয়ে ওঠে স্মৃতি ও কালের এক নৃত্যময় ভাষা। “পুষ্পচয়িনী” তাই কেবল একটি নারীচিত্র নয়; এটি সময়, প্রেম ও মানবস্মৃতির এক সূক্ষ্ম কাব্যিক রূপান্তর।
বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের এই কবিতা পাঠককে মনে করিয়ে দেয়—মানুষের অনুভব কখনো এককালের নয়। অতীতের ভালোবাসা, হারানো স্মৃতি ও অচেনা আকাঙ্ক্ষা বর্তমানের দেহ ও মনে নীরবে নৃত্য করে চলে।
পুষ্পচয়িনী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে পুষ্প-চয়িনী,
ছেড়ে আসিয়াছ তুমি কবে উজ্জয়িনী
মালিনীছন্দের বন্ধ টুটে।
বকুল উৎফুল্ল হয়ে উঠে
আজো বুঝি তব মুখমদে।
নূপুররণিত পদে।
আজো বুঝি অশোকের ভাঙাইবে ঘুম।
কী সেই কুসুম
যা দিয়ে অতীত জন্মে গণেছিলে বিরহের দিন।
বুঝি সে-ফুলের নাম বিস্মৃতিবিলীন
ভর্তৃপ্রসাদন ব্রতে যা দিয়ে গাঁথিতে মালা
সাজাইতে বরণের ডালা।
মনে হয় যেন তুমি ভুলে-যাওয়া তুমি–
মর্ত্যভূমি
তোমারে যা ব’লে জানে সেই পরিচয়
সম্পূর্ণ তো নয়।
তুমি আজ
করেছ যে-অঙ্গসাজ
নহে সদ্য আজিকার।
কালোয় রাঙায় তার
যে ভঙ্গীটি পেয়েছে প্রকাশ
দেয় বহুদূরের আভাস।
মনে হয় যেন অজানিতে
রয়েছ অতীতে।
মনে হয় যে-প্রিয়ের লাগি
অবন্তীনগরসৌধে ছিলে জাগি,
তাহারি উদ্দেশে
না জেনে সেজেছ বুঝি সে-যুগের বেশে।
মালতীশাখার ‘পরে
এই-যে তুলেছ হাত ভঙ্গীভরে
নহে ফুল তুলিবার প্রয়োজনে,
বুঝি আছে মনে
যুগ-অন্তরাল হতে বিস্মৃত বল্লভ
লুকায়ে দেখিছে তব সুকোমল ও-করপল্লব।
অশরীরী মুগ্ধনেত্র যেন গগনে সে
হেরে অনিমেষে
দেহভঙ্গিমার মিল লতিকার সাথে
আজি মাঘীপূর্ণিমার রাতে।
বাতাসেতে অলক্ষিতে যেন কার ব্যাপ্ত ভালোবাসা
তোমার যৌবনে দিল নৃত্যময়ী ভাষা।
