বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের কালো ঘোড়া কবিতা | Kalo Ghora Kobita | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা (১৯৩৩) তাঁর জীবনের শেষ পর্বের এক গভীর, দার্শনিক ও আত্মসংঘর্ষময় কাব্যভাষার দলিল। এই গ্রন্থে প্রেম, বিরহ, স্মৃতি ও সৃষ্টির পাশাপাশি মানবমনের অন্ধকার অঞ্চল—নৈরাশ্য, ব্যর্থতা, আত্মবিনাশী আকাঙ্ক্ষা—প্রতীকী রূপে প্রকাশ পেয়েছে। “কালো ঘোড়া” কবিতাটি সেই অন্ধকার মনস্তত্ত্বের এক তীব্র ও শক্তিশালী রূপক, যেখানে ‘কালো ঘোড়া’ হয়ে ওঠে কবির অন্তরের অবদমিত বাসনা, অন্ধ অভিলাষ ও ধ্বংসের দিকে ধাবিত এক অদম্য শক্তি।

কবিতার শুরুতেই কালো ঘোড়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে কবির “অন্ধ অভিলাষ” হিসেবে—যে সারারাত্রি নিঃশ্বাস ফেলে, অস্থির হয়ে ওঠে, এবং অসাধ্যের সাধনায় ছুটে যেতে চায়। এই ঘোড়া দুর্গম পথ দলে দলে অতিক্রম করে, খুরে খুরে ধরণী খুঁড়ে তোলে, অধীর হ্রেষাধ্বনিতে আকাশ ভারী করে। এখানে ঘোড়াটি শুধু বাহ্যিক কোনো প্রাণী নয়; এটি কবির মনের সেই অংশ, যা যুক্তি, সংযম ও আলোকে অস্বীকার করে অন্ধকারের দিকে ছুটে চলে।

রবীন্দ্রনাথ এই ঘোড়াকে যুগান্তের কালো অগ্নিশিখা ও কালো কুজ্ঝটিকার সঙ্গে তুলনা করেছেন—যেন এটি সভ্যতা, ব্যক্তিমানস বা সৃষ্টিশীলতার গভীর সংকটের প্রতীক। আকস্মিক নৈরাশ্যের আঘাতে রাত্রিতে মুক্ত হয়ে ওঠা এই কালো অশ্ব কবির প্রিয়তম ব্যথাকে সঙ্গে নিয়ে আসে, যার আর বাহিরে স্থান নেই; সে ধ্যানের আসনও দখল করে ফেলে। ফলে কবিতাটি ব্যক্তিগত বেদনা থেকে অস্তিত্বগত সংকটে উত্তীর্ণ হয়।

অমাবস্যার অন্ধকারে বল্গাহারা কালো ঘোড়ার ঊর্ধ্বশ্বাসে ধাবন কবির আত্মঘাতী চিন্তার রূপ। সে বিস্মৃতির চিরবিলুপ্তিতে ঝাঁপ দিতে চায়, নিরঙ্কুশ শূন্যতার দিকে ছুটে যেতে চায়—যেখানে সৃষ্টি নেই, দৃষ্টি নেই, ভাষা নেই। এই অংশে কবিতাটি ভয়াবহভাবে মানবমনের আত্মবিনাশী প্রবণতাকে উন্মোচিত করে।

কিন্তু কবিতার শেষাংশে আসে এক তাৎপর্যপূর্ণ রূপান্তর। সেই ধ্বংসযাত্রার পরেই কবি কল্পনা করেন বিরহের অগ্নিস্নানে শুদ্ধ মন, যা আশ্বিনের রৌদ্রস্নাত, বৃষ্টিশূন্য মেঘের মতো উন্মুক্ত আলোকে দীপ্ত হবে। অর্থাৎ অন্ধকারের মধ্য দিয়েই শুদ্ধি, নৈরাশ্যের মধ্য দিয়েই আলোর সম্ভাবনা।

কালো ঘোড়া কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কালো অশ্ব অন্তরে যে সারারাত্রি ফেলেছে নিশ্বাস

          সে আমার অন্ধ অভিলাষ।

অসাধ্যের সাধনায় ছুটে যাবে ব’লে

          দুর্গমেরে দ্রুত পায়ে দ’লে

                 খুরে খুরে খুঁড়েছে ধরণী,

                       করেছে অধীর হ্রেষাধ্বনি।

ও যেন রে যুগান্তের কালো অগ্নিশিখা,

              কালো কুজ্ঝটিকা।

  অকস্মাৎ নৈরাশ্য-আঘাতে

        দ্বার মুক্ত পেয়ে রাতে

              দুর্দাম এসেছে বাহিরিয়া।

যারে নিয়ে এল সে-যে ব্যথায় মূর্তিত মোর প্রিয়া,

        বাহিরে না স্থান পেয়ে

              ধ্যানের আসন ছিল ছেয়ে।

              এ-অমাবস্যায়

      বল্গাহারা কালো অশ্ব ঊর্ধ্বশ্বাসে ধায়।

                কালো চিন্তা মম

                 আত্মঘাতী ঝঞ্ঝাসম

              বিস্মৃতির চিরবিলুপ্তিতে

                   চলে ঝাঁপ দিতে

                       নিরঙ্কিত পথ বেয়ে।

                     যাক ধেয়ে।

              সৃষ্টিহীন দৃষ্টিহীন রাত্রিপারে

                    ব্যর্থ দুরাশারে

                           নিয়ে যাক্‌–

              অন্তিম শূন্যের মাঝে নিশ্চল নির্বাক্‌।

        তার পরে বিরহের অগ্নিস্নানে শুভ্র মন

              রৌদ্রস্নাত আশ্বিনের বৃষ্টিশূন্য মেঘের মতন

                             উন্মুক্ত আলোকে

                       দীপ্তি পাক্‌ সুনির্মল শোকে।

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন