বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের পসারিনী কবিতা | Posarini Kobita

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে, কবির সৃজনজীবনের এক গভীর মননশীল ও দার্শনিক পর্বে। এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, শ্রম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে একসূত্রে গেঁথেছেন। বিচিত্রতা নামটির মতোই এখানে বিচিত্র চরিত্র ও অভিজ্ঞতার সমাবেশ—যেখানে দৈনন্দিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই চিরন্তন সত্যের ইঙ্গিত মেলে। এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “পসারিনী” কবিতাটি সেই প্রবণতার এক অসাধারণ নিদর্শন। বাজারে ঘুরে বেড়ানো এক সাধারণ নারী বিক্রেতার মধ্য দিয়ে কবি আবিষ্কার করেছেন মানুষের অন্তর্গত আদিম স্মৃতি, বৈরাগ্য ও অনন্তের আহ্বান।

কবিতার শুরুতেই আমরা দেখি পসারিনীকে—সকাল থেকে হাটে হাটে ঘুরে বিকিকিনি করে ক্লান্ত শরীর ও মন নিয়ে ফেরার পথে। কিন্তু হঠাৎই তার মনে কী এক অজানা টান জাগে। লাভের কড়ি ডালায় পড়ে থাকে, সে বসে পড়ে গাছের ছায়ায়। এই মুহূর্তেই কবি বাস্তবের সঙ্গে ভাবনার বিচ্ছেদ ঘটান। পসারিনীর চিন্তা আর হিসাবের জগতে নেই; সে যেন অজান্তেই প্রবেশ করে প্রকৃতি ও অন্তর্লোকের গভীরে।

মাঠের রাঙা ধূলি, হেমন্তের রোদ, শীতের হাওয়া, দূরের নদীর জলে আলোর রেখা—এই সমস্ত প্রাকৃতিক উপাদান পসারিনীর চেতনাকে ধীরে ধীরে বদলে দেয়। কবির ভাষায়, সৃষ্টির প্রথম স্মৃতি থেকে আদিম স্পন্দন তার রক্তস্রোতে সঞ্চারিত হয়। সে বুঝতে পারে তৃণ, তরু, মৃত্তিকা—সবই তার আপন। যুগযুগান্তরের খেলায় সে নিজেকে খুঁজে পায়।

কবিতার শেষাংশে সংসারের ত্বরিত আহ্বান স্তব্ধ হয়ে যায়। হাট, ঘাট, ঘর, বাট—সব মুখর শব্দ মিলিয়ে যায় এক অনন্ত নীরবতায়। সেই নীরবতার মধ্যেই ওঠে বৈরাগ্যের ব্যাকুলতা, যা কোনো পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং এক গভীর আত্মজাগরণ।

“পসারিনী” কবিতাটি তাই কেবল এক নারী বিক্রেতার ছবি নয়; এটি মানুষের চিরন্তন দ্বন্দ্বের প্রতীক—কর্ম ও ভাবনা, সংসার ও অনন্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানবসত্তা। বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের ভেতরে এই কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দৈনন্দিন জীবনের মাঝেই হঠাৎ এক মুহূর্তে অনন্ত এসে ধরা দিতে পারে।

পসারিনী কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

      পসারিনী, ওগো পসারিনী,

কেটেছে সকালবেলা হাটে হাটে লয়ে বিকিকিনি।

        ঘরে ফিরিবার খনে

        কী জানি কী হল মনে,

                বসিলি গাছের ছায়াতলে–

        লাভের জমানো কড়ি

        ডালায় রহিল পড়ি,

                ভাবনা কোথায় ধেয়ে চলে।

      এই মাঠ, এই রাঙা ধূলি,

অঘ্রানের-রৌদ্র-লাগা চিক্কণ কাঁঠালপাতাগুলি

        শীতবাতাসের শ্বাসে

        এই শিহরন ঘাসে–

                কী কথা কহিল তোর কানে।

বহুদূর নদীজলে

           আলোকের রেখা ঝলে,

                   ধ্যানে তোর কোন্‌ মন্ত্র আনে।

 

      সৃষ্টির প্রথম স্মৃতি হতে

সহসা আদিম স্পন্দ সঞ্চরিল তোর রক্তস্রোতে।

           তাই এ তরুতে তৃণে

           প্রাণ আপনারে চিনে

                   হেমন্তের মধ্যাহ্নের বেলা–

           মৃত্তিকার খেলাঘরে

           কত যুগযুগান্তরে

                   হিরণে হরিতে তোর খেলা।

      নিরালা মাঠের মাঝে বসি

সাম্প্রতের আবরণ মন হতে গেল দ্রুত খসি।

           আলোকে আকাশে মিলে

           যে-নটন এ নিখিলে

                   দেখ তাই আঁখির সম্মুখে,

           বিরাট কালের মাঝে

           যে ওঙ্কারধ্বনি বাজে

                   গুঞ্জরি উঠিল তোর বুকে।

      যত ছিল ত্বরিত আহ্বান

পরিচিত সংসারের দিগন্তে হয়েছে অবসান।

           বেলা কত হল, তার

           বার্তা নাহি চারিধার,

                   না কোথাও কর্মের আভাস।

           শব্দহীনতার স্বরে

           খররৌদ্র ঝাঁ ঝাঁ করে,

                   শূন্যতার উঠে দীর্ঘশ্বাস।

      পসারিনী, ওগো পসারিনী,

ক্ষণকাল-তরে আজি ভুলে গেলি যত বিকিকিনি।

           কোথা হাট, কোথা ঘাট,

           কোথা ঘর, কোথা বাট,

                   মুখর দিনের কলকথা–

           অনন্তের বাণী আনে

           সর্বাঙ্গে সকল প্রাণে

                   বৈরাগ্যের স্তব্ধ ব্যাকুলতা।

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন