রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর নাট্যসাধনার সবচেয়ে সৃজনশীল ও মৌলিক দিকগুলির মধ্যে গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়। এই ধারায় তিনি নাটককে কেবল কাহিনি বা সংলাপনির্ভর শিল্প হিসেবে দেখেননি; বরং সংগীত, নৃত্য, ছন্দ, প্রতীক ও দার্শনিক ভাবনার এক গভীর সমন্বয়ে নাটককে রূপ দিয়েছেন এক সামগ্রিক মানবভাষ্যে। এখানে নাটক হয়ে ওঠে অনুভবের শিল্প—যা দেখা, শোনা ও অনুভব করা যায় একসঙ্গে।
রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্যে সংগীত হলো নাট্যের মূল চালিকা শক্তি। গান এখানে বিরতির উপাদান নয়, বরং কাহিনির অগ্রগতির প্রধান মাধ্যম। চরিত্রের সংকট, দ্বন্দ্ব, উপলব্ধি ও রূপান্তর গানের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়। বাল্মীকিপ্রতিভা–য় দস্যু রত্নাকরের অন্তর্লোকের পরিবর্তন, কালমৃগয়া–য় রাজক্ষমতার অহংকার ও নৈতিক বোধের সংঘর্ষ, কিংবা মায়ার খেলা–য় ভক্তি ও আত্মসমর্পণের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন—সব ক্ষেত্রেই সংগীত নাট্যবস্তুকে গভীরতর করে তোলে। গান এখানে কেবল শ্রুতিমাধুর্য নয়; এটি এক অন্তর্গত আত্মকথন।
নৃত্যনাট্যে রবীন্দ্রনাথ ভাষার নির্ভরতা আরও কমিয়ে দেন। দেহ, গতি ও স্থবিরতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় মানসিক অভিঘাত। চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা ও শ্যামা—এই তিন নৃত্যনাট্যে তিনি দেহকে রূপ দেন চিন্তার বাহকে। নৃত্যের প্রতিটি ভঙ্গি, থেমে থাকা, আকস্মিক বাঁক বা ছন্দবদ্ধ পদক্ষেপ চরিত্রের মানসিক অবস্থার ভাষ্য হয়ে ওঠে। ফলে দর্শক শব্দ ছাড়াও অনুভব করতে পারে চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব।
এই নৃত্যনাট্যগুলির কেন্দ্রে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ ও আত্মমর্যাদার দর্শন। চিত্রাঙ্গদা আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান—ভালোবাসার জন্য নিজেকে বদলে ফেলার প্রশ্ন ও শেষে নিজ সত্তার স্বীকৃতি। চণ্ডালিকা সামাজিক বৈষম্য ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে এক তীব্র মানবিক প্রতিবাদ, যেখানে প্রান্তিক মানুষের আত্মমর্যাদা প্রধান হয়ে ওঠে। শ্যামা প্রেম, অপরাধ, লোভ ও ক্ষমার নৈতিক জটিলতা তুলে ধরে—যেখানে মুক্তি আসে আত্মস্বীকারের মধ্য দিয়ে। এই নাটকগুলিতে নারীচরিত্ররা নিছক প্রেমিকা বা অনুগত নয়; তারা প্রশ্ন করে, সিদ্ধান্ত নেয় এবং নিজেদের দায় নিজেই বহন করে—যা রবীন্দ্রনাথকে আধুনিক নাট্যচিন্তকের আসনে স্থাপন করে।
মঞ্চভাবনার ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন যুগান্তকারী। বাস্তবানুগ সেট বা অতিরিক্ত আলংকারিকতা তাঁর নাট্যে গৌণ। শান্তিনিকেতনের খোলা প্রাঙ্গণ, সমবেত নৃত্য, সংযত আলো–ছায়া ও প্রতীকী দৃশ্যায়ন নাটককে এক আধ্যাত্মিক মাত্রা দেয়। এতে দর্শক কেবল দর্শক থাকে না; সে কল্পনাশক্তির মাধ্যমে নাটকের সহযাত্রী হয়ে ওঠে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য পাশ্চাত্য অপেরা কিংবা ভারতীয় শাস্ত্রীয় নাট্যের অনুকরণ নয়। এগুলি একান্তই তাঁর নিজস্ব শিল্পভাষা, যেখানে ভারতীয় সংগীত, লোকঐতিহ্য, শাস্ত্রীয় নৃত্য ও আধুনিক চিন্তার স্বাভাবিক মিলন ঘটেছে।
এই কারণেই রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য আজও প্রাসঙ্গিক। সময় বদলালেও মানুষের প্রেম, সংকট, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন অপরিবর্তিত। সেই চিরন্তন মানববোধই তাঁর এই নাট্যরচনাগুলিকে বাংলা নাট্যকলার ইতিহাসে শুধু স্মরণীয় নয়, অপরিহার্য করে তুলেছে।
