রবীন্দ্রনাথের পূজা ও প্রার্থনা পর্যায়ের গানের সূচি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “পূজা ও প্রার্থনা” পর্যায়ের গানগুলি তাঁর সংগীতসৃষ্টির এক গভীর আত্মিক অধ্যায়। এই পর্যায়ের গান কেবল উপাসনার আনুষ্ঠানিক ভাষ্য নয়; এগুলি মানুষের অন্তর্জগতের সঙ্গে অসীমের সংলাপ। এখানে ঈশ্বর কোনো দূরবর্তী অলৌকিক সত্তা নন—তিনি নিত্যদিনের জীবনে, কর্মে, বেদনায় ও আনন্দে নিবিড়ভাবে উপস্থিত। প্রার্থনা এখানে চাওয়ার ভাষা নয়; বরং আত্মসমর্পণ, উপলব্ধি ও আত্মশুদ্ধির পথ।

এই পর্যায়ের গানে রবীন্দ্রনাথ ভক্তি ও মানবিকতার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব রাখেননি। তাঁর প্রার্থনা ভয়ভিত্তিক নয়, আশ্রয়ভিত্তিক; তাঁর পূজা বাহ্য আচার নয়, অন্তরের জাগরণ। কখনো তিনি বলেন—“যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক”—কখনো বা অনুনয়ের সুরে নিজেকে অর্পণ করেন নির্ভরতার হাতে। ঈশ্বর এখানে করুণাময় পথপ্রদর্শক, যাঁর কাছে মানুষ নিজের দুর্বলতা ও শক্তি উভয়ই সমর্পণ করতে পারে।

“পূজা ও প্রার্থনা” পর্যায়ের গানগুলি আমাদের শেখায়—ধ্যান মানে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং জীবনের সঙ্গে গভীর সংযোগ। এই গানগুলিতে সুর ও বাণীর সংযম, ভাষার স্বচ্ছতা এবং ভাবের গভীরতা মিলিত হয়ে এক শান্ত, দীপ্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই সূচিতে সংকলিত গানগুলি তাই কেবল শ্রবণের জন্য নয়; এগুলি আত্মস্থ করার, নীরবে নিজের মধ্যে ধারণ করার আহ্বান জানায়—যেন সংগীতের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের অন্তরের সঙ্গে পুনরায় পরিচিত হতে পারে।

রবীন্দ্রনাথের পূজা ও প্রার্থনা পর্যায়ের গানের সূচি

 

গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে

এ হরিসুন্দর

আমরা যে শিশু অতি

মহাসিংহাসনে বসি

দিবানিশি করিয়া যতন

কোথা আছ, প্রভু

কী করিলি মোহের ছলনে

দেখ চেয়ে দেখ তোরা জগতের উত্সব

আজি শুভদিনে পিতার ভবনে

বড়ো আশা করে এসেছি গো

বর্ষ ওই গেল চলে

তুমি কি গো পিতা আমাদের

প্রভু এলেম কোথায়

সংসারেতে চারি ধার

কী দিব তোমায়

তোমারেই প্রানের আশা কহিব

হাতে লয়ে দ্বীপ অগণন

সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে

রজনী পোহাইল, চলেছে যাত্রীদল

আজি এনেছে তাঁহারি আশির্বাদ

চলিয়াছি গৃহ-পানে

দিন তো চলি গেলো প্রভু, বৃথা

ভবকোলাহল ছাড়িয়ে

তাঁহার প্রেমে কে ডুবে আছে

তবে কি ফিরিব ম্লানমুখে সখা

দেখা যদি দিলে ছেড়ো না আর

দুখ দূর করিলে দরশন দিয়ে

দাও হে হৃদয় ভরে দাও

দুয়ারে বসে আছি প্রভু

ডেকেছেন প্রিয়তম

চলেছে তরণী প্রসাদপবনে

পিতার দুয়ারে দাঁড়াইয়া সবে

তোমায় যতনে রাখিব রে

আইলো আজি প্রাণসখা

দুখের কথা তোমায় বলিব না

তাঁহার আনন্দধারা জগতে যেতেছে বয়ে

হরি, তোমায় ডাকি

আমায় ছজনায় মিলে

ঘোর রজনী, এ মোহঘনঘটা

সুমধুর শুনি আজি

মিটিল সব ক্ষুধা

তারো তারো, হরি, দীনজনে

তব প্রেমসুধারসে মেতেছি

আমারেও করো মার্জনা

ফিরো না ফিরো না আজি

সবে মিলি গাও রে

স্বরূপ তাঁর কে জানে

তোমারে জানি নে হে

এবার বুঝেছি সখা

চাহি নে সুখে থাকিতে হে

আজ বুঝি আইল প্রিয়তম

হে মন, তাঁরে দেখো আঁখি খুলিয়ে

জয় রাজরাজেশ্বর

আজি রাজ আসনে তোমারে বসাইবো

হে অনাদি অসীম সুনীল অকূল সিন্ধু

মহাবিশ্বে মহাকাশে

আইলো শান্ত সন্ধ্যা

উঠি চলো সুদিন আইল

আমারে করো জীবনদান

রক্ষা করো হে

মহানন্দে হেরো গো সবে

প্রভু, খেলেছি অনেক খেলা

আমি জেনে শুনে তবু ভুলে আছি

আমি সংসারে মন দিয়েছিনু, তুমি

কে জনিত তুমি ডাকিবে আমারে

তুমি কাছে নাই বলে

নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে

মাঝে মাঝে তব দেখা পাই

ওহে জীবনবল্লভ

ওগো দেবতা আমার পাষাণদেবতা

গভীর রাতে ভক্তিভরে

যাত্রী আমি ওরে

দুঃখ এ নয়, সুখ নহে গো

সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি

বলো বলো বন্ধু, বলো

মনের মধ্যে নিরবধি শিকল গড়ার কারখানা

খেলার সাথি, বিদায়দ্বার খোলো

যাওয়া-আসারই এই কি খেলা

বুঝি ওই সুদূরে

কোন ভীরুকে ভয় দেখাবি

হৃদয়-আবরণ খুলে গেল

মন প্রাণ কাড়িয়া লও হে হৃদয়স্বামী

শুভ্র প্রভাতে পূর্ব গগনে