রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের ভুবনে প্রকৃতি পর্ব এক অনন্য স্বতন্ত্র জগৎ—যেখানে প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়, জীবন্ত সত্তা; কখনো সখী, কখনো গুরু, কখনো প্রেমিকা, কখনো আশ্রয়দাত্রী মাতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকৃতিকে দেখেছেন মানবজীবনের গভীরতম অনুভবের আয়নায়—ঋতুর আবর্তনে, আলো-ছায়ার খেলায়, বৃষ্টি-রোদ-হাওয়ার স্পর্শে তিনি আবিষ্কার করেছেন মানুষের আনন্দ-বেদনা, আশা-নৈরাশ্য ও আত্মবিকাশের ভাষা।
প্রকৃতি পর্বের গানগুলি মূলত ঋতুচক্রকে কেন্দ্র করে রচিত—গ্রীষ্মের ক্লান্তি, বর্ষার উন্মাদ উচ্ছ্বাস, শরতের স্বচ্ছ নির্মলতা, হেমন্তের স্নিগ্ধ পরিপক্বতা, শীতের নীরব সংযম এবং বসন্তের রঙিন উন্মেষ—সব মিলিয়ে এক পূর্ণাঙ্গ সঙ্গীতভূগোল। এই গানে প্রকৃতি কখনো বাহিরের দৃশ্য নয়, বরং অন্তরের আন্দোলনের প্রতিধ্বনি। পাখির ডাক, পাতার মর্মর, মেঘের গর্জন বা চাঁদের আলো—সবই হয়ে ওঠে মানবমনের ভাষ্য।
এই সূচিতে সংকলিত প্রকৃতি পর্বের গানগুলি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রকৃতি ছিল মুক্তির পথ। সভ্যতার কোলাহল ও যান্ত্রিকতার বিপরীতে প্রকৃতি তাঁর গানে এনে দেয় প্রশান্তি, সাম্য ও গভীর মানবিকতা। এখানে সৌন্দর্য কেবল দৃশ্যগত নয়—তা নৈতিক ও আধ্যাত্মিকও।
এই সূচিপত্র তাই শুধু গানের তালিকা নয়; এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অন্তরঙ্গ সহাবস্থানের এক মানচিত্র। যে পাঠক বা শ্রোতা এই পর্বে প্রবেশ করবেন, তিনি কেবল গান শুনবেন না—ঋতুর সঙ্গে চলতে শিখবেন, প্রকৃতির ভাষায় নিজেকেই নতুন করে চিনবেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পর্বের গানের সূচি
বিশ্ববীণারবে বিশ্বজন মোহিছে
কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন
একি আকুলতা ভুবনে
আজ তালের বনের
আঁধার কুঁড়ির বাঁধন
পূর্ণচাঁদের মায়ায় আজি
কত যে তুমি
আকাশভরা সূর্য-তারা
ব্যাকুল বকুলের ফুলে
নাই রস নাই
দারুণ অগ্নিবাণে রে
এসো এসো হে
হৃদয় আমার, ওই
এসো, এসো, এসো
নমো নমো, হে
মধ্যদিনে যবে গান
ওই বুঝি কালবৈশাখী
প্রখর তপনতাপে আকাশ
বৈশাখের এই ভোরের
বৈশাখ হে, মৌনী
শুষ্কতাপের দৈত্যপুরে দ্বার
হে তাপস, তব
মধ্যদিনের বিজন বাতায়নে
তপস্বিনী হে ধরণী
চক্ষে আমার তৃষ্ণা
এসো শ্যামল সুন্দর
ওই আসে ওই
ঝরঝর বরিষে বারিধারা
গহন ঘন ছাইল
হেরিয়া শ্যামল ঘন
শাঙনগগনে ঘোর ঘনঘটা
মেঘের ‘পরে মেঘ
আষাঢ়সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল
আজ বারি ঝরে
কাঁপিছে দেহলতা থরথর
আমার দিন ফুরালো
বাদল-মেঘে মাদল বাজে
ওগো আমার শ্রাবণমেঘের
তিমির-অবগুণ্ঠনে বদন তব
আকাশতলে দলে দলে
কদম্বেরই কানন ঘেরি
আষাঢ়, কোথা হতে
ছায়া ঘনাইছে বনে
এই শ্রাবণ-বেলা বাদল-ঝরা
শ্রাবণবরিষন পার হয়ে
আজ কিছুতেই যায়
গহন রাতে শ্রাবণধারা
যেতে দাও যেতে
ভেবেছিলেম আসবে ফিরে
আজি ওই আকাশ-‘পরে
ও আষাঢ়ের পূর্ণিমা
শ্যামল ছায়া, নাইবা গেলে
আহ্বান আসিল মহোৎসবে
কোন্ পুরাতন প্রাণের
নীল- অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়
আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে
পথিক মেঘের দল
বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা
ওরে ঝড় নেমে আয়
এই শ্রাবণের বুকের
মেঘের কোলে কোলে
উতল-ধারা বাদল ঝরে
ওই-যে ঝড়ের মেঘের
কখন বাদল-ছোঁওয়া লেগে
আজ নবীন মেঘের
আজ আকাশের মনের
এই সকাল বেলার
পুব-সাগরের পার হতে
আজি বর্ষারাতের শেষে
শ্রাবণমেঘের আধেক দুয়ার
বহু যুগের ও পার
বাদল-বাউল বাজায় রে
একি গভীর বাণী
আজি হৃদয় আমার
ভোর হল যেই
বৃষ্টিশেষের হাওয়া কিসের
বাদল-ধারা হল সারা
ঝরে ঝরো ঝরো
এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে
কোথা যে উধাও
আজ শ্রাবণের পূর্ণিমাতে
পুব-হাওয়াতে দেয় দোলা
অশ্রুভরা বেদনা দিকে
ধরণীর গগনের মিলনের
বন্ধু, রহো রহো
একলা বসে বাদল-শেষে
শ্যামল শোভন শ্রাবণ
নমো, নমো, নমো
তপের তাপের বাঁধন
ওই কি এলে
গগনে গগনে আপনার মনে
শ্রাবণ, তুমি বাতাসে
কেন পান্থ, এ চঞ্চলতা
আজি শ্রাবণঘনগহন মোহে
আজি ঝড়ের রাতে
চলে ছলোছলো নদীধারা
আমারে যদি জাগালে
আবার এসেছে আষাঢ়
এসো হে এসো
চিত্ত আমার হারালো
আবার শ্রাবণ হয়ে
ধরণী, দূরে চেয়ে
হৃদয়ে মন্দ্রিল ডমরু
মধু -গন্ধে ভরা
আমি তখন ছিলেম
আমি শ্রাবণ-আকাশে ওই
ভোর থেকে আজ
নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে
থামাও রিমিকি-ঝিমিকি বরিষন
আজি পল্লিবালিকা অলকগুচ্ছ
ওই মালতীলতা দোলে
আঁধার অম্বরে প্রচণ্ড
হৃদয় আমার নাচে
আজ বরষার রূপ
মনে হল যেন
তৃষ্ণার শান্তি, সুন্দরকান্তি
মম মন-উপবনে চলে
আজি বরিষনমুখরিত
যায় দিন, শ্রাবণদিন
আমি কী গান
কিছু বলব ব’লে
মন মোর মেঘের
মোর ভাবনারে কী
আমার প্রিয়ার ছায়া
ওগো সাঁওতালি ছেলে
বাদল-দিনের প্রথম কদম
আজি তোমায় আবার
এসো গো, জ্বেলে
আজি ঝরো ঝরো
শ্রাবণের গগনের গায়
স্বপ্নে আমার মনে
শেষ গানেরই রেশ
এসেছিলে তবু আস
এসেছিনু দ্বারে তব
নিবিড় মেঘের ছায়ায়
আমার যে দিন
পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে
আজি মেঘ কেটে
সঘন গহন রাত্রি
ওগো তুমি পঞ্চদশী
আজি শরততপনে প্রভাতস্বপনে
মেঘের কোলে রোদ
আজ ধানের ক্ষেতে
আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ
অমল ধবল পালে
আমার নয়ন-ভুলানো এলে
শিউলি ফুল, শিউলি
শরতে আজ কোন্
আজ প্রথম ফুলের
ওগো শেফালিবনের মনের
শরত-আলোর কমলবনে
তোমার মোহন রূপে
শরৎ, তোমার অরুণ
তোমরা যা বলো
কোন্ খেপা শ্রাবণ
আকাশ হতে খসল
হৃদয়ে ছিলে জেগে,
সারা নিশি ছিলেম
দেখো দেখো, দেখো
ওলো শেফালি, ওলো
এসে শরতের অমল
এবার অবগুণ্ঠন খোলো
তোমার নাম জানি
মরি লো কার
আমার রাত পোহালো
নির্মল কান্ত, নমো
আলোর অমল কমলখানি
সেই তো তোমার
পোহালো পোহালো বিভাবরী,
নব কুন্দধবলদলসুশীতলা
হিমের রাতে ওই
হায় হেমন্তলক্ষ্মী
হেমন্তে কোন্ বসন্তেরই
সে দিন আমায়
নমো, নমো, নমো
শীতের হাওয়ার লাগল
শিউলি-ফোটা ফুরোল যেই
এল যে শীতের
পৌষ তোদের ডাক
ছাড়্ গো তোরা
আমরা নূতন প্রাণের
আর নাই যে দেরি,
একি মায়া, লুকাও
মোরা ভাঙব তাপস
শীতের বনে কোন্
নমো, নমো. নমো
হে সন্ন্যাসী, হিমগিরি
নব বসন্তের দানের
এস’ এস’ বসন্ত,
আজি বসন্ত জাগ্রত
এনেছ ওই শিরীষ
ও মঞ্জরী, ও মঞ্জরী
কার যেন এই
দোলে দোলে দোলে
অনন্তের বাণী তুমি
এবার এল সময়
ওরে গৃহবাসী খোল্
একটুকু ছোঁওয়া লাগে
ওগো বধূ সুন্দরী
আমার বনে বনে
আমি পথভোলা এক
আজি দখিন-দুয়ার
বসন্তে কি শুধু
ওগো দখিন হাওয়া
আকাশ আমায় ভরল
মোর বীণা ওঠে
ওরে ভাই, ফাগুন
এতদিন যে বসেছিলেম
বসন্তে ফুল গাঁথল
ওরে আয় রে
বসন্ত, তোর শেষ
দিনশেষে বসন্ত যা
সব দিবি কে
বাকি আমি রাখব
ফল ফলাবার আশা
যদি তারে নাই
ধীরে ধীরে ধীরে
দখিন-হাওয়া, জাগো জাগো
সহসা ডালপালা তোর
সে কি ভাবে
ওই ভাঙল হাসির বাঁধ
ও আমার চাঁদের
ও চাঁদ, তোমায়
শুক্নো পাতা কে
তোমার বাস কোথা-যে
আজ দখিন-বাতাসে
বিদায় যখন চাইবে
এবেলা ডাক পড়েছে
না, যেয়ো না
এবার বিদায়বেলার সুর
আজ খেলা ভাঙার খেলা
আজ কি তাহার
চরণরেখা তব যে
নমো নমো, নমো
তোমার আসন পাতব
কে রঙ লাগালে
মন যে বলে
বকুলগন্ধে বন্যা এল
বাসন্তী, হে ভুবনমোহিনী
আন্ গো তোরা
ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায়
নিবিড় অমা-তিমির হতে
হে মাধবী, দ্বিধা কেন
ওরা অকারণে চঞ্চল
ফাগুনের নবীন আনন্দে
বেদনা কী ভাষায়
চলে যায় মরি
বসন্তে-বসন্তে তোমার কবিরে
আমার মল্লিকাবনে যখন
ক্লান্ত যখন আম্রকলির
তুমি কিছু দিয়ে
আজি এই গন্ধবিধুর
এবার ভাসিয়ে দিতে
বসন্তে আজ ধরার
তুমি কোন্ পথে
অনেক দিনের মনের
পুরাতনকে বিদায় দিলে
ঝরো-ঝরো ঝরো-ঝরো
পূর্বাচলের পানে তাকাই
নীল আকাশের কোণে
মাধবী হঠাৎ কোথা
নীল দিগন্তে ওই
বসন্ত তার গান
ফাগুনের শুরু হতেই
ফাগুনের পূর্ণিমা এল
এক ফাগুনের গান
ওরে বকুল, পারুল,
নিশীথরাতের প্রাণ
চেনা ফুলের গন্ধস্রোতে
মধুর বসন্ত এসেছে
আমার মালার ফুলের
আজি কমলমুকুলদল খুলিল
পুষ্প ফুটে কোন্
এই মৌমাছিদের ঘরছাড়া
বিদায় নিয়ে গিয়েছিলেম
এই কথাটাই ছিলেম
এবার তো যৌবনের
সেই তো বসন্ত
নিবিড় অন্তরতর বসন্ত
নব নব পল্লবরাজি
মম অন্তর উদাসে
ফাগুন-হাওয়ায় রঙে রঙে
ঝরা পাতা গো