রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গানের সূচি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতিসৃষ্টির মধ্যে প্রেম পর্যায়ের গান এক বিশেষ ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। রবীন্দ্রসংগীতকে যে কয়েকটি ভাবপর্বে ভাগ করা হয়—পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, আনুষ্ঠানিক ইত্যাদি—তার মধ্যে প্রেম পর্যায় মানবহৃদয়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম, ব্যক্তিগত ও আবেগঘন অনুভূতিগুলিকে প্রকাশ করেছে। এই পর্যায়ে প্রেম কেবল নর–নারীর পার্থিব আকর্ষণে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে মিলন, বিরহ, অভিমান, প্রত্যাশা, আত্মসমর্পণ ও অনন্ত আকাঙ্ক্ষা একাকার হয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গানে প্রেমিকা কখনো কাছে, কখনো দূরে; কখনো সে বাস্তব মানুষ, কখনো সে স্বপ্ন, আবার কখনো সে অদৃশ্য সত্তা। “তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা”, “ওগো কাঙাল, আমারে তুমি”, “সখী, ভালোবাসা কারে কয়”, “আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি”—এমন অসংখ্য গানে প্রেমের নিবিড়তা, আকুলতা ও আত্মদানের সুর ধ্বনিত হয়েছে। মিলনের আনন্দের পাশাপাশি বিরহের বেদনাও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ; কারণ রবীন্দ্রনাথের কাছে বিরহই প্রেমকে গভীর করে, বিস্তৃত করে।

এই প্রেমগানগুলির ভাষা সহজ, কিন্তু ভাব অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কাব্যিক। সুরের দিক থেকেও এগুলি বৈচিত্র্যময়—কখনো ধীর, কখনো উচ্ছ্বসিত, কখনো নীরব ব্যথায় ভরা। অনেক গানে প্রেম প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়—চাঁদ, রাত, বসন্ত, বাতাস, ফুল, পাখি যেন প্রেমের অনুভূতির বাহক হয়ে ওঠে।

সব মিলিয়ে, রবীন্দ্রনাথের প্রেম পর্যায়ের গান বাংলা সংগীতে প্রেমের এক অনন্য দার্শনিক ও নান্দনিক ভাষা নির্মাণ করেছে। এই গানগুলি আজও মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, এবং সময় পেরিয়েও অমলিন, চিরনবীন।

চিত্ত পিপাসিত রে

আমার মনের মাঝে

কাহার গলায় পরাবি

যে ছায়ারে ধরব

গানগুলি মোর শৈবালেরই

তোমায় গান শোনাব

গানের ডালি ভরে

ওরে আমার হৃদয়

কাল রাতের বেলা

মনে রবে কি না রবে

আকাশে আজ কোন্

নিদ্রাহারা রাতের এ গান

আমার কণ্ঠ হতে

যায় নিয়ে যায়

দিয়ে গেনু বসন্তের

গান আমার যায়

সময় কারো যে

এই কথাটি মনে রেখো

আসা-যাওয়ার পথের ধারে

গানের ভেলায় বেলা

অনেক দিনের আমার

পাখি আমার নীড়ের

ছুটির বাঁশি বাজল যে

বাঁশি আমি বাজাই

তোমার শেষের গানের রেশ

আমার শেষ রাগিণীর

পাছে সুর ভুলি

বিরস দিন বিরল

বাজিল কাহার বীণা মধুর

সবার সাথে চলতেছিল

আমার পরান লয়ে কী

সুন্দর হৃদিরঞ্জন তুমি

আমারে করো তোমার

ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে

ওগো কাঙাল, আমারে

তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা

কত কথা তারে

সুনীল সাগরের শ্যামল

হে নিরুপমা, গানে

অজানা খনির নূতন

আজি এ নিরালা

ফিরে যাও কেন

আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া

জানি জানি তুমি

হে সখা বারতা

যদি জানতেম আমার কিসের

আমি যে আর

আমার নয়ন তব

আমরা দুজনা স্বর্গ-খেলনা

আরো কিছুখন নাহয়

এখনো কেন সময়

আজি গোধূলিলগনে এই

আমি চাহিতে এসেছি

ধরা দিয়েছি গো

কী রাগিণী বাজালে

ওগো শোনো কে

বড়ো বেদনার মতো

আমার মন মানে না

মরি লো মরি

এবার উজাড় করে

সখী, প্রতিদিন হায়

তুমি রবে নীরবে

তোমার গোপন কথাটি

এসো আমার ঘরে

ঘুমের ঘন গহন

মম রুদ্ধমুকুলদলে এসো

এসো এসো পুরুষোত্তম

আমার নিশীথরাতের বাদলধারা

একলা ব’সে হেরো

কেটেছে একেলা বিরহের

দে পড়ে দে

রাতে রাতে আলোর

অনেক কথা বলেছিলেম

জানি তোমার অজানা

পুরানো জানিয়া চেয়ো

আমার যদি বেলা

চপল তব নবীন

জয়যাত্রায় যাও গো

বিজয়মালা এনো আমার

আন্‌মনা, আন্‌মনা

ওলো সই, ওলো

হৃদয়ের এ কূল,

না বলে যেয়ো

আর নাই রে

বেদনায় ভরে গিয়েছে

আমি চিনি গো

যা ছিল কালো

আহা তোমার সঙ্গে

আমার সকল নিয়ে

আমি রূপে তোমায়

আমি তোমার প্রেমে

আমার নয়ন তোমার

ফুল তুলিতে ভুল

চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে,

তুমি একটু কেবল

ওগো, তোমার চক্ষু

হে নবীনা, প্রতিদিনের পথের

ওগো, শান্ত পাষাণমুরতি

তোমার পায়ের তলায়

অনেক পাওয়ার মাঝে

দিনশেষের রাঙা মুকুল

আছ আকাশ-পানে তুলে

না, না গো

চৈত্রপবনে মন চিত্তবনে

নূপুর বেজে যায়

আরো একটু বসো

বর্ষণমন্দ্রিত অন্ধকারে এসেছি

মেঘছায়ে সজল বায়ে

গোধূলিগগনে মেঘে ঢেকেছিল

আমার প্রাণের মাঝে

তোমার মনের একটি

উদাসিনী -বেশে বিদেশিনী

আমি যাব না

খোলো খোলো দ্বার,

বাজিবে, সখী, বাঁশি

কে বলেছে তোমায়,

সে আমার গোপন

এ কী সুধারস

ও যে মানে

মান অভিমান ভাসিয়ে

তোমারেই করিয়াছি জীবনের

যদি বারণ কর

কেন বাজাও কাঁকন

কেন যামিনী না

নিশি না পোহাতে

অলকে কুসুম না

নিশীথে কী কয়ে

মোর স্বপন-তরীর কে

ভালোবাসি, ভালোবাসি

এবার মিলন-হাওয়ায়

তোমার রঙিন পাতায়

আজ সবার রঙে

এই বুঝি মোর

আমার দোসর যে

আমার লতার প্রথম

দুঃখ দিয়ে মেটাব

একদিন চিনে নেবে

মম যৌবননিকুঞ্জে গাহে পাখি–

আহা, জাগি পোহালো

সে আসে ধীরে,

পুষ্পবনে পুষ্প নাহি

আমার পরান যাহা

আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি

সখী, ওই বুঝি বাঁশি

ওরে, কী শুনেছিস ঘুমের

কার চোখের চাওয়ার হাওয়ায়

অনেক কথা যাও

না বলে যায়

তবে শেষ করে

সখী, আমারি দুয়ারে

তবু মনে রেখো

তুমি যেয়ো না

আকুল কেশে আসে,

কে দিল আবার

না না নাই বা এলে

জয় ক’রে তবু

কাঁদালে তুমি মোরে

আমার মনের কোণের

মুখপানে চেয়ে দেখি,

স্বপনে দোঁহে ছিনু

মিলনরাতি পোহালো

হে ক্ষণিকের অতিথি

হায় অতিথি, এখনি

মুখখানি কর মলিন

ওকে বাঁধিবি কে

সকালবেলায় আলোয় বাজে

শেষ বেলাকার শেষের

কাঁদার সময় অল্প

কেন রে এতই

জানি, জানি হল

আমার যাবার বেলায়

কে বলে ‘যাও

কেন আমায় পাগল

যদি হল যাবার

ক্লান্ত বাঁশির শেষ

কখন দিলে পরায়ে

যাবার বেলা শেষ

জানি তুমি ফিরে

না রে, না

তোর প্রাণের রস

মরণ রে, তুঁহু

উতল হাওয়া লাগল

না না না

তোরা যে যা

ও আমার ধ্যানেরই

হায় রে, ওরে

ওহে সুন্দর, মম

কে আমারে যেন

সেদিন দুজনে দুলেছিনু

সেই ভালো সেই

কাছে যবে ছিল

আমার প্রাণের ‘পরে

মনে রয়ে গেল

ওগো আমার চির-অচেনা

কোথা হতে শুনতে

পান্থপাখির রিক্ত কুলায়

বাজে করুণ সুরে

জীবনে পরম লগন

সখী, তোরা দেখে

আমি আশায় আশায়

আমার নিখিল ভুবন

না না, ভুল

ভুল করেছিনু ভুল

ডেকো না আমারে,ডেকো

যে ছিল আমার

হায় হতভাগিনী, স্রোতে

কোন্ সে ঝড়ের

ছি ছি, মরি

শুভ মিলনলগনে বাজুক

আর নহে, আর

ছিন্ন শিকল পায়ে

যাক ছিঁড়ে, যাক ছিঁড়ে

দুঃখের যজ্ঞ-অনল-জ্বলনে

আমার মন কেমন

গোপন কথাটি রবে

বলো সখী, বলো

অজানা সুর কে

ধরা সে যে

কোন্ বাঁধনের গ্রন্থি

ওগো কিশোর, আজি

তুমি কোন্ ভাঙনের

আমি তোমার সঙ্গে

এই উদাসী হাওয়ার

বসন্ত সে যায়

মম দুঃখের সাধন

বাণী মোর নাহি

আজি দক্ষিণপবনে দোলা

যদি হায় জীবন

আমার আপন গান

অধরা মাধুরী ধরেছি

আমি যে গান

ওগো পড়োশিনি, শুনি

ওগো স্বপ্নস্বরূপিণী, তব

ওরে জাগায়ো না,

দিনান্তবেলায় শেষের ফসল

ধূসর জীবনের গোধূলিতে

দোষী করিব না

দৈবে তুমি কখন

ভরা থাক্ স্মৃতিসুধায়

ওকে ধরিলে তো

কেন ধরে রাখা,

ও চাঁদ, চোখের

হায় গো, ব্যথায়

তোমার বীণায় গান

তার হাতে ছিল

কেন নয়ন আপনি

আজি যে রজনী

এমন দিনে তারে

সকরুণ বেণু বাজায়ে

এ পারে মুখর

রোদনভরা এ বসন্ত

এসো এসো ফিরে

তোমার গীতি জাগালো

যুগে যুগে বুঝি

বনে যদি ফুটল

ধূসর জীবনের গোধূলিতে

আমার জ্বলে নি

নীলাঞ্জনছায়া, প্রফুল্ল কদম্ববন,

ফিরবে না তা

দিনের পরে দিন-যে

না চাহিলে যারে

বিরহ মধুর হল

ফিরে ফিরে ডাক্

প্রভাত-আলোরে মোর কাঁদায়ে

নাই যদি বা

শ্রাবণের পবনে আকুল

সে যে পাশে

কোন্ গহন অরণ্যে

কাছে থেকে দূর

অশান্তি আজ হানল

স্বপ্নমদির নেশায় মেশা

শুনি ক্ষণে ক্ষণে

দিন পরে যায়

আমার ভুবন তো

যখন এসেছিলে অন্ধকারে

এ পথে আমি-যে

মনে কী দ্বিধা

কী ফুল ঝরিল

লিখন তোমার ধুলায়

আজি সাঁঝের যমুনায়

সখী, আঁধারে একেলা

যখন ভাঙল মিলন-মেলা

আমার এ পথ

একলা ব’সে একে

তার বিদায়বেলার মালাখানি

আমি এলেম তারি

দীপ নিবে গেছে

তুমি আমায় ডেকেছিলে

সে যে বাহির

কবে তুমি আসবে

জাগরণে যায় বিভাবরী–

নাই নাই নাই

একদা তুমি, প্রিয়ে,

আমার একটি কথা

ও দেখা দিয়ে

কেন সারা দিন

কী সুর বাজে

গহন ঘন বনে

কে উঠে ডাকি

ওগো কে যায়

হেলাফেলা সারা বেলা

ওগো এত প্রেম-আশা

আমি নিশি নিশি

কখন যে বসন্ত

বাঁশরি বাজাতে চাহি,

পথিক পরান, চল্

তুই ফেলে এসেছিস

যে দিন সকল

আমায় থাকতে দে-না

হে বিরহী, হায়

ওগো সখী, দেখি

সখা, বহে গেল

ওলো রেখে দে

তারে দেখাতে পারি

এ তো খেলা

দিবস রজনী, আমি

অলি বার বার

দূরের বন্ধু সুরের

আমার মন চেয়ে

বিনা সাজে সাজি

বাহির-পথে বিবাগি হিয়া

এলেম নতুন দেশে

ঝড়ে যায় উড়ে

পূর্ণ প্রাণে চাবার

লুকালে ব’লেই খুঁজে

ঘরেতে ভ্রমর এল

কোথা বাইরে দূরে

দে তোরা আমায়

তোমার বৈশাখে ছিল

আমার এই রিক্ত

আমার অঙ্গে অঙ্গে

কোন্ দেবতা সে, কী

নারীর ললিত লোভন

ওরে চিত্ররেখাডোরে বাঁধিল

চিনিলে না আমারে

কঠিন বেদনার তাপস

সব কিছু কেন

নীরবে থাকিস, সখী,

প্রেমের জোয়ারে ভাসাবে

জেনো প্রেম চিরঋণী

কোন্ অযাচিত আশার

যদি আসে তবে

আমার মন বলে,

আমি ফুল তুলিতে

প্রাণ চায় চক্ষু

দ্বারে কেন দিলে

তুমি মোর পাও

এবার, সখী, সোনার

কী হল আমার!

আজি আঁখি জুড়ালো

সকল হৃদয় দিয়ে

তারে কেমনে ধরিবে,

ওই মধুর মুখ

সুখে আছি, সুখে

ভালোবেসে যদি সুখ

সখা, আপন মন

প্রেমের ফাঁদ পাতা

এসেছি গো এসেছি

যেয়ো না, যেয়ো

কাছে আছে দেখিতে

জীবনে আজ কি

পথহারা তুমি পথিক

তুমি কোন্ কাননের

আয় তবে সহচরী

আজ তোমারে দেখতে

মনে যে আশা

এখনো তারে চোখে

বঁধু, তোমায় করব

এরা পরকে আপন

সমুখেতে বহিছে তটিনী

বুঝি বেলা বহে

বনে এমন ফুল

আমি কেবল তোমার

আজ যেমন ক’রে

যৌবনসরসীনীরে মিলনশতদল

সখী, বলো দেখি

দেখে যা, দেখে

নিমেষের তরে শরমে

আমি হৃদয়ের কথা

ওকে বল্, সখী

কে ডাকে. আমি

সখী, সে গেল

বিদায় করেছ যারে

না বুঝে কারে

নয়ন মেলে দেখি

হাসিরে কি লুকাবি

যে ফুল ঝরে

সাজাব তোমারে হে

মন জানে মনোমোহন

হল না লো,

ও কেন চুরি

কেহ কারো মন

গেল গো– ফিরিল

বল্, গোলাপ, মোরে

আমার যেতে সরে