শ্যামলী কাব্যগ্রন্থের কালরাত্রে কবিতা | Kalratri Kobita

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “কালরাত্রে” কবিতাটি তাঁর পরিণত বয়সের কাব্যগ্রন্থ শ্যামলী (প্রকাশকাল: ১৯৩৬)–এর অন্তর্গত একটি গভীর আত্মদর্শনমূলক রচনা। শ্যামলী কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক জীবনের সংকট, মানুষের অন্তর্লৌকিক শূন্যতা, অস্তিত্বের প্রশ্ন এবং সেই শূন্যতা অতিক্রম করে আত্মবোধ ও আলোকপ্রাপ্তির অভিজ্ঞতাকে তীব্র ভাষা ও প্রতীকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এই পর্যায়ের কবিতায় তাঁর ভাষা হয়ে ওঠে গদ্যছন্দঘেঁষা, ভাবনায় আসে তীব্র দার্শনিকতা, আর অনুভবে ধরা পড়ে নিঃসঙ্গতা, ক্লান্তি, কামনা ও মুক্তির দ্বন্দ্ব।

“কালরাত্রে” কবিতাটি মূলত এক গভীর মানসিক অন্ধকারের বিবরণ—যেখানে মানুষ চাহিদা, কামনা ও শূন্যতার ভারে জর্জরিত—এবং তারই বিপরীতে ভোরের আলোয় এক মহামুক্তির অভিজ্ঞতা। রাত্রির অসহায় “চাই চাই” থেকে প্রভাতের “চাই নে কিছু”–তে উত্তরণ এই কবিতার কেন্দ্রীয় ভাব। এটি রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক মানবতাবাদের এক অনন্য দলিল।

কালরাত্রে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

   কাল রাত্রে

      বাদলের দানোয়-পাওয়া অন্ধকারে

            বর্ষণের রিমঝিম প্রলাপে

                  চাপা দিয়েছিল

                       সন্ন্যাসী নিশীথের ধ্যানমন্ত্র।

      জড়ত্বে ছিলেম পরাভূত,

                 ছিলেম উপবাসী;

              ছিল শিথিলশক্তি ধূলিশয়ান।

                    বুকে ভর দিয়ে বসেছিল

                       সমস্ত আকাশের সঙ্গহীনতা।

“চাই চাই” করে কেঁদে উঠেছিল প্রাণ

         প্রহরে প্রহরে নিশাচর পাখির মতো।

            নানা নাম ধরেছিল ভিক্ষা,

         অন্তরের অন্ধস্তরে শিকড় চালিয়েছিল

            আঁকাবাঁকা অশুচি কান্নার।

                     “চাই চাই” বলে

            শূন্য হাৎড়ে বেড়িয়েছিল রাত-কানা

                      যাকে চায় তাকে না জেনে।

            শেষে ক্রুদ্ধ গর্জনে হেঁকে উঠল,

                     “নেই সে নেই কোথাও নেই।”

            সত্যহারা শূন্যতার গর্ত থেকে

                 কালো কামনার সাপের বংশ

            বেরিয়ে এসে জড়িয়েছে কাঙালকে–

                 নাস্তিত্বের-সেই-শিকল-বাঁধা ভৃত্যকে–

                         নিরর্থের বোঝায়

                      বেঁকেছে যার পিঠ,

                              নেমেছে যার মাথা।

ভোর হল রাত্রি।

          আষাঢ়ের সকালে অকস্মাৎ হাওয়ায়

               ঘন মেঘের দুর্গপ্রাচীর

                       পড়ল ভেঙেচুরে।

            ছুটে বেরিয়ে এসেছে

                 প্রভাতের বাঁধন-ছেঁড়া আলো।

               মুক্তির আনন্দঘোষণা

                 বেজে উঠল আকাশে আকাশে

                      আগুনের ভাষায়।

               পাখিদের ছোটো কোমল তনুতে

                     দুরন্ত হয়ে উঠল প্রাণের উৎসুক ছন্দ।

                চলল তাদের সুরের তীর-খেলা

                     কণ্ঠ থেকে কণ্ঠ, শাখা থেকে শাখায়।

                সেতারের দ্রুত তালের বাজন যেন

                     পাতায় পাতায় আলোর চমক।

                          মন দাঁড়িয়ে উঠল;

                             বললে, আমি পূর্ণ।

                তার অভিষেক হল

                       আপনারই উদ্‌বেল তরঙ্গে।

                 তার আপন সঙ্গ

                       আপনাকে করলে বেষ্টন

                              শিলাতটকে ঝর্নার মতো;

                       উপচে উঠে মিলতে চলল

                                চার দিকের সব-কিছুর মধ্যে।

     চেতনার সঙ্গে আলোর রইল না কোনো ব্যবধান।

          প্রভাতসূর্যের অন্তরে

            দেখতে পেলেম আপনাকে

                     হিরন্ময় পুরুষ;

          ডিঙিয়ে গেলেম দেহের বেড়া,

            পেরিয়ে গেলেম কালের সীমা,

          গান গাইলেম “চাই নে কিছু চাই নে” —

              যেমন গাইছে রক্তপদ্মের রক্তিমা,

                 যেমন গাইছে সমুদ্রের ঢেউ,

                     সন্ধ্যাতারার শান্তি,

                            গিরিশিখরের নির্জনতা।

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন