রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যজীবনের সূচনাপর্বে প্রকাশিত সন্ধ্যা সংগীত বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ গ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থটি তাঁর কাব্যরচনার তথাকথিত “উন্মেষ পর্ব”–এর অন্তর্গত। গ্রন্থের মুদ্রিত প্রকাশকাল বাংলা ১২৮৮ সন (ইংরেজি ১৮৮২ সাল) হলেও, রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন যে বাস্তবে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল ১২৮৯ বঙ্গাব্দে। প্রথম সংস্করণে এই কাব্যগ্রন্থে ২৫টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত ছিল; পরবর্তীকালে এর মধ্যে তিনটি কবিতা বাদ দেওয়া হয়।
সন্ধ্যা সংগীত নামটি যেমন ইঙ্গিতবহ, তেমনি এর কবিতাগুলির আবহও। এখানে ‘সন্ধ্যা’ কেবল দিনের শেষ মুহূর্ত নয়—এ এক মানসিক ও দার্শনিক অবস্থান, যেখানে আলো ও অন্ধকার, আশা ও হতাশা, বিশ্বাস ও সংশয় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। এই কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তা আত্মমগ্ন, ভাবুক ও অন্তর্মুখী। প্রকৃতি এখানে বহির্জগতের বর্ণনা হয়ে ওঠে না; বরং তা কবির অন্তর্জগতের প্রতিচ্ছবি।
সমালোচক শিশিরকুমার দাশ এই কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন—
“এদের মূল সুর বিষাদের, রোম্যান্টিক বেদনা ও শূন্যতাবোধের। এই কবিতাগুলির মধ্যে বাংলা কবিতার এক নূতনধারার সূচনা হয়েছিল।”
এই মন্তব্য সন্ধ্যা সংগীত-এর প্রকৃত তাৎপর্যকে স্পষ্ট করে। গ্রন্থের কবিতাগুলিতে পাশ্চাত্য রোমান্টিক কবিতার প্রভাব—বিশেষত বিষণ্ণতা, নিঃসঙ্গতা ও আত্মঅনুসন্ধানের প্রবণতা—স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। তবু এগুলি নিছক অনুকরণ নয়; বরং বাংলা কাব্যভাষায় এক নতুন অনুভবের পরীক্ষা।
ভাষা ও ছন্দের দিক থেকে সন্ধ্যা সংগীত পরবর্তী পর্বের মতো পরিণত নয়, কিন্তু আবেগের আন্তরিকতা ও ভাবের গভীরতায় এই কবিতাগুলি আজও পাঠযোগ্য। ঈশ্বর, অসীম, প্রেম ও যন্ত্রণা—এই সমস্ত বিষয় এখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে উদ্ভাসিত হয়েছে। এই আত্মগত বেদনা ও শূন্যতার অনুভবই ভবিষ্যতের গীতাঞ্জলি–পর্বের আধ্যাত্মিক বিস্তারের পূর্বসূত্র রচনা করে।
সন্ধ্যা সংগীত কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ
- গান আরম্ভ
- সন্ধ্যা
- তারকার আত্মহত্যা
- আশার নৈরাশ্য
- পরিত্যক্ত
- সুখের বিলাপ
- হৃদয়ের গীতধ্বনি
- দুঃখ আবাহন
- শান্তিগীত
- অসহ্য ভালবাসা
- হলাহল
- পাষাণী
- অনুগ্রহ
- আবার
- দুদিন
- পরাজয় সঙ্গীত
- শিশির
- সংগ্ৰাম সঙ্গীত
- আমি-হারা
- কেন গান গাই
- কেন গান শুনাই
- গান সমাপন
- বিষ ও সুধা