বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্য রচনার অন্ত্যপর্বের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক ও মননশীল সৃষ্টি হলো ‘কথার উপরে কথা চলেছ সাজিয়ে দিনরাতি’। ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত এই কবিতায় অন্তহীন বাক্যালাপ, সৃষ্টির অহংকার ও নির্মাণ-নেশার বিরুদ্ধে নীরবতা, বিশ্রাম এবং মৌনের মহিমাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | কথার উপরে কথা চলেছ সাজিয়ে দিনরাতি |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | পত্রপুট |
| প্রকাশের বছর | ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ / ১৯৩৬ খ্রীস্টাব্দ (রচনাকাল: ৫ই বৈশাখ, ১৩৪৩) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও আত্মিক লিরিক কবিতা (Philosophical Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থটি গদ্যছন্দের অবাধ ব্যবহারের মাধ্যমে রচিত তাঁর জীবনের এক পরিণত মননশীল সৃষ্টি। এসময়ের কবিতায় মানবজীবনের কর্মব্যস্ততা, বাক্যের আধিক্য এবং তার বিপরীতে পরম শান্তির সন্ধান ও নিস্তব্ধতার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে। ‘কথার উপরে কথা চলেছ সাজিয়ে দিনরাতি’ কবিতায় কবি মানুষকে অবিরাম কথা বলা এবং বাক্য দিয়ে মন্দিরচূড়া গড়ার স্পর্ধা থেকে বিরত হয়ে বিশ্রামের ও মৌনের সুরকে গ্রহণ করার উপদেশ দিয়েছেন।
কথার উপরে কথা চলেছ সাজিয়ে দিনরাতি – সম্পূর্ণ কবিতা
কথার উপরে কথা চলেছ সাজিয়ে দিনরাতি,
এইবার থামো তুমি। বাক্যের মন্দিরচূড়া গাঁথি’
যত ঊর্ধ্বে তোল তা’রে তা’র চেয়ে আরো ঊর্ধ্বে ধায়
গাঁথুনির অন্তহীন উন্মত্ততা। থামিতে না চায়
রচনার স্পর্ধা তব। ভুলে গেছ, থামার পূর্ণতা
রচনার পরিত্রাণ; ভুলে গেছ নির্বাক দেবতা
বেদীতে বসিবে আসি’ যবে, কথার দেউলখানি
কথার অতীত মৌনে লভিবে চরমতম বাণী।
মহা নিস্তব্ধের লাগি অবকাশ রেখে দিয়ো বাকি,
উপকরণের স্তূপে রচিয়ো না অভ্রভেদী ফাঁকি
অমৃতের স্থান রোধি’। নির্মাণ-নেশায় যদি মাতো
সৃষ্টি হবে গুরুভার তার মাঝে লীলা র’বে না তো।
থামিবার দিন এলে থামিতে না যদি থাকে জানা
নীড় গেঁথে গেঁথে পাখি আকাশেতে উড়িবার ডানা
ব্যর্থ করি’ দিবে। থামো তুমি থামো। সন্ধ্যা হয়ে আসে
শান্তির ইঙ্গিত নামে দিবসের প্রগল্ভ প্রকাশে।
ছায়াহীন আলোকের সভায় দিনের যত কথা
আপনারে রিক্ত করি’ রাত্রির গভীর সার্থকতা
এসেছে ভরিয়া নিতে। তোমার বীণার শত তারে
মত্ততার নৃত্য ছিল এতক্ষণ ঝংকারে ঝংকারে
বিরাম বিশ্রামহীন,—প্রত্যক্ষের জনতা তেয়াগি’
নেপথ্যে যাক সে চ’লে স্মরণের নির্জনের লাগি’
ল’য়ে তা’র গীত অবশেষ, কথিত বাণীর ধারা
অসীমের অকথিত বাণীর সমুদ্রে হোক সারা॥
Romanized Version
Kothar upore kotha cholecho sajiye dinrati,
Eibar thamo tumi. Bakyer mondirchura ganthi’
Joto urdhwe tolo ta’re ta’r cheye aro urdhwe dhay
Ganhtunir ontehin unmottoota. Thamite na chay
Rochonar spordha tobo. Bhule gechho, thamar purnota
Rochonar poritran; bhule gechho nirbak debota
Bedete bosi-be ashi’ yobe, kothar deulkhani
Kothar otito moune lobhibe chorom-tomo bani.
Moha nishtobdher lagi obokash rekhe diyo baki,
Upokoroner stupe rochiyo na obhrobhedi faki
Omriter sthan rodhi’. Nirman-neshay jodi mato
Srishti hobe guruhbhar tar majhe lila r’be na to.
Thamibar din elo thamite na jodi thake jana
Nir genthe genthe pakhi akashete uribar dana
Byartho kori’ dibe. Thamo tumi thamo. Shondha hoye ashe
Shantir ingit name diboser progolbo prokase.
Chhayahin aloker sobhay diner joto kotha
Apanare rikto kori’ ratrir gobhir sarthokota
Eseche bhariya nite. Tomar binar shoto tare
Mottotar nrityo chhilo etokhoni zhongkare zhongkare
Biram bishram-hin,—protyokkher jonota teyagi’
Nephotye যাক সে চ’লে [jak se chole] smoroner nirjoner lagi’
L’ye ta’r git obosesh, kathito banir dhara
Oshimer okothito banir shumdure hok shara॥
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- বাক্যের আসক্তি ও থামার প্রয়োজনীয়তা:
“কথার উপরে কথা চলেছ সাজিয়ে দিনরাতি, / এইবার থামো তুমি। বাক্যের মন্দিরচূড়া গাঁথি’ / যত ঊর্ধ্বে তোল তা’রে তা’র চেয়ে আরো ঊর্ধ্বে ধায় / গাঁথুনির অন্তহীন উন্মত্ততা।”— মানুষ প্রতিনিয়ত শব্দ ও কথার পাহাড় জমায়, কিন্তু এই অন্তহীন বাক্যালাপ বা রচনার স্পর্ধার চেয়ে বড় হলো থামার পূর্ণতা এবং মৌনের প্রশান্তি।
- নির্বাক দেবতা ও নিস্তব্ধতার মহিমা:
“ভুলে গেছ নির্বাক দেবতা / বেদীতে বসিবে আসি’ যবে, কথার দেউলখানি / কথার অতীত মৌনে লভিবে চরমতম বাণী।”— অতিকথার আড়ালে ঈশ্বর ঢাকা পড়ে যান; তাই সমস্ত কথার অবসান ঘটিয়ে গভীর নিস্তব্ধতা বা মৌনের মাঝেই পরম সত্য বা চরম বাণীর প্রকাশ ঘটে।
- দিনের প্রগলভতা ও রাতের শান্তি:
“থামো তুমি থামো। সন্ধ্যা হয়ে আসে / শান্তির ইঙ্গিত নামে দিবসের প্রগল্ভ প্রকাশে। / … কথিত বাণীর ধারা / অসীমের অকথিত বাণীর সমুদ্রে হোক সারা॥”— দিনের বেলাকার সমস্ত কোলাহল ও কথার গুঞ্জন পেরিয়ে সন্ধ্যার শান্ত লগ্নে মানবজীবনের সীমিত বাণী অসীমের অকথিত বাণীর সাগরে হারিয়ে গিয়ে সার্থকতা লাভ করে।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (পত্রপুট কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
![পত্রপুট কাব্যগ্রন্থের ‘কথার উপরে কথা চলেছ সাজিয়ে দিনরাতি’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 কথার উপরে কথা চলেছ সাজিয়ে দিনরাতি [ পুত্রপুট কাব্যগ্রন্থ ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/1938/06/কথার-উপরে-কথা-চলেছ-সাজিয়ে-দিনরাতি.gif)