বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের সাজ কবিতা | Saj Kobita | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর কাব্যগ্রন্থ বিচিত্রতা প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে, কবির সৃজনজীবনের শেষ পর্যায়ে। এই পর্বে রবীন্দ্রনাথের কবিতা বাহ্যিক বর্ণনার চেয়ে অন্তর্লীন তাৎপর্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। জীবন, সময়, ভাগ্য ও মানুষের অসহায়তা—এই সবকিছুই এখানে ধরা পড়ে সংযত অথচ গভীর ভাষায়। বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থে নারীজীবন, স্মৃতি, প্রস্তুতি ও বিদায়ের মুহূর্তগুলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। “সাজ” কবিতাটি সেই ধারারই এক অনুপম উদাহরণ, যেখানে বাহ্যিক সাজের আড়ালে জীবনের অদৃশ্য নিয়তি ও খেলার ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে।

কবিতার শুরুতেই দেখা যায় বিবাহের আয়োজন—রাঙা চেলি, দ্বারের কাছে সানাইয়ের সুর। কিন্তু কবি প্রশ্ন তোলেন, এই সাজ কি কেবল সামাজিক আচার? নাকি এর পেছনে আছে “অদৃশ্য এক লিপি”—ভাগ্য বা নিয়তির কোনো গোপন লেখা, যা নতুন জীবনের ভূমিকায় রচিত হচ্ছে? এই প্রশ্নই কবিতাটির কেন্দ্রীয় সুর।

রবীন্দ্রনাথ শিশুকালের স্মৃতির দিকে ফিরে যান। ধুলোর ওপর বসে পুতুল সাজানোর খেলায় যেমন নিষ্পাপ আনন্দ ছিল, আজকের সাজ তেমন নয়। আজকের সাজ এক গভীরতর খেলায় অংশগ্রহণ—যেখানে হৃদয় খুলে দিতে হয়, অথচ খেলার নিয়ম সম্পূর্ণ অজানা। এখানে নারী নিজেই যেন পুতুল, আবার নিজেকেই সাজাচ্ছে—এই দ্বন্দ্ব কবিতাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।

কবির ভাষায়, এই “অখ্যাত প্রাণের কোণে” হঠাৎ নেমে আসে “বিশ্বখেলোয়াড়ের খেয়াল”—জীবনের অদৃশ্য নিয়ন্তা। দুঃখ-সুখের তুফানে পুতুল-ভাসান শুরু হয় ভাগ্যভেলায়। মানুষের সাজানো জীবনের ওপর যে তার নিজের নিয়ন্ত্রণ সামান্যই, এই উপলব্ধি কবিতার মধ্যভাগে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শেষ স্তবকে কবি স্মরণ করিয়ে দেন—সময় শেষে সব চিহ্ন মুছে যায়। রঙিন চেলি, সানাইয়ের সুর, ভাঙা খেলার চিহ্ন—কিছুই চিরস্থায়ী নয়। তবু এই সাজের অর্থ একটাই: যাঁর খেয়াল, যাঁর ইচ্ছা, খেলাটি তাঁরই। মানুষ জানে না, তবু সে সাজে, প্রস্তুত হয়, জীবনের মঞ্চে দাঁড়ায়।

“সাজ” কবিতা তাই কেবল বিবাহের ছবি নয়; এটি মানবজীবনের এক গভীর রূপক। এখানে সাজ মানে প্রস্তুতি, কিন্তু ফলাফলের নিশ্চয়তা নেই। বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্লীন দর্শনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে এই কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন এক অদৃশ্য খেলা, যেখানে আমরা সবাই কখনো খেলোয়াড়, কখনো সাজানো পুতুল।

 

সাজ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই-যে রাঙা চেলি দিয়ে তোমায় সা’জানো,

ওই-যে হোথায় দ্বারের কাছে সানাই বাজানো,

           অদৃশ্য এক লিপির লিখায়

           নবীন প্রাণের কোন্‌ ভূমিকায়

                         মিলছে, না জানো।

শিশুবেলায় ধূলির ‘পরে আঁচল এলিয়ে

সা’জিয়ে পুতুল কাটল বেলা খেলা খেলিয়ে।

           বুঝতে নাহি পারবে আজো

           আজ কী খেলায় আপনি সা’জো

                         হৃদয় মেলিয়ে।

অখ্যাত এই প্রাণের কোণে সন্ধ্যাবেলাতে

বিশ্বখেলোয়াড়ের খেয়াল নামল খেলাতে।

           দুঃখসুখের তুফান লেগে

           পুতুল-ভাসান চলল বেগে

                         ভাগ্যভেলাতে।

 

তার পরেতে ভোলার পালা, কথা কবে না–

অসীম কালের পটে ছবির চিহ্ন রবে না।

           তার পরেতে জিতবে ধুলো,

           ভাঙা খেলার চিহ্নগুলো

                         সঙ্গে লবে না।

রাঙা রঙের চেলি দিয়ে কন্যে সাজানো,

দ্বারের কাছে বেহাগ রাগে সানাই বাজানো,

           এই মানে তার বুঝতে পারি–

           খেয়াল যাঁহার খুশি তাঁরি

                         জানো না-জানো।

Amar Rabindranath Logo

মন্তব্য করুন