কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর–এর পরিণত বয়সের কাব্যভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো বিচিত্রতা কাব্যগ্রন্থ। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে কবি মানবসভ্যতার বহুমুখী গতি, ইতিহাসের সংঘাত, ক্ষমতা ও ব্যক্তিমানুষের নিভৃত জীবনের সূক্ষ্ম অনুভব—সবকিছুকে এক বিস্তৃত দার্শনিক দৃষ্টিতে দেখেছেন। “যাত্রা” কবিতাটি এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম শক্তিশালী রচনা, যেখানে কবি সভ্যতার বাহ্যিক গর্জন ও অন্তরালের নীরব মানবযাত্রাকে মুখোমুখি স্থাপন করেছেন।
কবিতার প্রথম অংশে আমরা দেখি রাজা, মন্ত্রী, পণ্ডিত ও বাণিজ্যের উন্মত্ত অগ্রযাত্রা। যুদ্ধযাত্রার ভেরি ও করতালের শব্দে বসুন্ধরা কেঁপে ওঠে; রাজনীতির ষড়যন্ত্র, বাণিজ্যের জোয়ার-ভাটা, পণ্যপোত ও সাম্রাজ্যবিস্তারের উল্লাস—সব মিলিয়ে এক বিশাল সভ্যতাযাত্রার ছবি আঁকা হয়। এই যাত্রার পথে গড়ে ওঠে বীরকীর্তিস্তম্ভ, কিন্তু তার ভিত গাঁথা লক্ষ লক্ষ মানবকঙ্কালে। কবি ব্যঙ্গ ও নির্মম সত্যের মধ্য দিয়ে দেখান, যে গৌরব স্বর্গের দিকে মাথা তোলে, তার নীচে চাপা পড়ে অসংখ্য মানুষের জীবন।
এর পরেই হঠাৎ দৃশ্যপট বদলে যায়। গ্রামপ্রান্তের নদী, ক্লান্ত স্রোত, এক তরীতে নববধূকে নিয়ে পল্লীর পথে যাত্রা—এই নীরব মানবিক যাত্রা কবিতার কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায়। সূর্য অস্ত যায়, মাঠ স্তব্ধ হয়, অন্ধকারে সন্ধ্যাতারা জ্বলে ওঠে, আর বালিকার হৃদয়ে জন্ম নেয় এক অনির্বচনীয় কাঁপন। এখানে কোনো করতাল নেই, কোনো ভেরি নেই—তবু এই যাত্রাই সবচেয়ে গভীর ও সত্য।
“যাত্রা” কবিতায় রবীন্দ্রনাথ দুটি ভিন্ন গতি পাশাপাশি রাখেন—একটি ক্ষমতা, যুদ্ধ ও জয়ের উল্লাসমুখর সভ্যতার যাত্রা; অন্যটি প্রেম, ভয়, ভবিষ্যৎ ও মানবিক জীবনের নীরব যাত্রা। কবির দৃষ্টিতে ইতিহাসের আসল তাৎপর্য প্রথমটিতে নয়, দ্বিতীয়টির মধ্যেই নিহিত। এই কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতার সমস্ত কোলাহলের আড়ালে যে নিঃশব্দ মানবযাত্রা চলে, সেটিই মানবজীবনের চূড়ান্ত সত্য ও সৌন্দর্য।
যাত্রা কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজা করে রণযা’ত্রা,
বাজে ভেরি, বাজে করতাল–
কম্পমান বসুন্ধরা।
মন্ত্রী ফেলি ষড়যন্ত্রজাল
রাজ্যে রাজ্যে বাধায় জটিল গ্রন্থি।
বাণিজ্যের স্রোত
ধরণী বেষ্টন করে জোয়ার-ভাঁটায়।
পণ্যপোত
ধায় সিন্ধুপারে-পারে।
বীরকীর্তিস্তম্ভ হয় গাঁথা
লক্ষ লক্ষ মানবকঙ্কালস্তূপে,
ঊর্ধ্বে তুলি মাথা
চূড়া তার স্বর্গ-পানে হানে অট্টহাস।
পণ্ডিতেরা–
আক্রমণ করে বারম্বার
পুঁথির-প্রাচীর-ঘেরা
দুর্ভেদ্য বিদ্যার দুর্গ।
খ্যাতি তার ধায় দেশে দেশে।
হেথা গ্রামপ্রান্তে নদী বহি চলে প্রান্তরের শেষে
ক্লান্ত স্রোতে।
তরীখানি তুলি লয়ে নববধূটিরে
চলে দূর পল্লী-পানে।
সূর্য অস্ত যায়।
তীরে তীরে
স্তব্ধ মাঠ।
দুরুদুরু বালিকার হিয়া।
অন্ধকারে
ধীরে ধীরে সন্ধ্যাতারা দেখা দেয় দিগন্তের ধারে।
