বিপদে মোরে রক্ষা করো , পূজা ২২৭ | Bipode more rokkha koro

রবীন্দ্রসংগীতের বিশাল ভাণ্ডারে ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো’ একটি অত্যন্ত গভীর ও আত্মশক্তিতে বলীয়ান হওয়ার প্রার্থনামূলক গান। গীতবিতানের ‘পূজা’ পর্যায়ের এই গানটি মানুষের দুর্বলতাকে জয় করে স্রষ্টার কাছে মানসিক শক্তি কামনার এক অনন্য কাব্যিক ও সাঙ্গীতিক নিদর্শন। জীবনের কঠিনতম সময়ে এই গানটি আজও অগণিত মানুষকে সাহস, পরম প্রশান্তি ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়।

গানের মূল তথ্য

| গানের নাম | বিপদে মোরে রক্ষা করো |

| শিল্পী | রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীগণ |

| গীতিকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| সুরকার | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |

| পর্যায় ও নম্বর | পূজা পর্যায় (২২৭) |

| রাগ ও তাল | ইমনকল্যাণ ও ঝম্পক |

| রচনাকাল | ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দ (১৩১৩ বঙ্গাব্দ) |

গানের পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

এই বিখ্যাত ও অনুপ্রেরণাদায়ী গানটি ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে (১৩১৩ বঙ্গাব্দে) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন। এটি গীতবিতানের ‘পূজা’ পর্যায়ের ২২৭ নম্বর গান। ব্যক্তিগত জীবনের নানা শোক, জমিদারির দায়িত্ব এবং তৎকালীন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কবির জীবনে যে প্রবল মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তারই এক আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক উত্তরণ ঘটেছে এই গানে। চারপাশের প্রতিকূলতার মাঝে নিজেকে ভেঙে না পড়ে শক্ত রাখার যে আকুলতা, তা এই গানের ছত্রে ছত্রে বিদ্যমান।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শন ও জীবনবোধ সবসময়ই আত্মনির্ভরশীলতার কথা বলে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরের কাছে বিপদ থেকে পলায়নের বা মুক্তির প্রার্থনা করার চেয়ে বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করার শক্তি কামনাই প্রকৃত ভক্তি। শান্তিনিকেতনের তপোবনের আবহে রচিত এই গানটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনার গান নয়, বরং এটি যেকোনো বয়সের মানুষের মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির এক অন্যতম প্রধান মন্ত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

গানের সঠিক লিরিক ও কথা

বিপদে মোরে রক্ষা করো লিরিক্স বাংলা সংস্করণ

বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা–

বিপদে আমি না যেন করি ভয়।

দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,

দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।

সহায় মোর না যদি জুটে নিজের বল না যেন টুটে,

সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি, লভিলে শুধু বঞ্চনা

নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।

আমারে তুমি করিবে ত্রাণ এ নহে মোর প্রার্থনা–

তরিতে পারি শকতি যেন রয়।

আমার ভার লাঘব করি নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,

বহিতে পারি এমনি যেন হয়।

নম্রশিরে সুখের দিনে তোমারি মুখ লইব চিনে–

দুখের রাতে নিখিল ধরা যেদিন করে বঞ্চনা

তোমারে যেন না করি সংশয়।

Bipode More Rokkha Koro Romanized Version

Bipode more rokkha koro e nohe mor prarthona–

Bipode ami na jeno kori bhoy.

Dukkhotape byathito chite nai-ba dile santona,

Dukkhe jeno korite pari joy.

Sohay mor na jodi jute nijer bol na jeno tute,

Songsarete ghotile khoti, lobhile shudhu bonchona

Nijer mone na jeno mani khoy.

Amare tumi koribe tran e nohe mor prarthona–

Torite pari shokoti jeno roy.

Amar bhar laghob kori nai-ba dile santona,

Bohite pari emni jeno hoy.

Nomroshire sukher dine tomari mukh loibo chine–

Dukher rate nikhil dhora jedin kore bonchona

Tomare jeno na kori songshoy.

গানের সুর ও ভাবার্থ বিশ্লেষণ

গানটির সুর হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের অত্যন্ত সুপরিচিত ‘ইমনকল্যাণ’ রাগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি ‘ঝম্পক’ তালের এক চমৎকার ধ্রুপদ অঙ্গের গান। রাগ ইমনকল্যাণের গম্ভীর, প্রশান্ত ও আত্মপ্রত্যয়ী রূপ এই গানের প্রার্থনামূলক কথাগুলোর সাথে মিশে এক অদ্ভুত মানসিক শক্তির সঞ্চার করে। ঝম্পক তালের নিয়ন্ত্রিত গতির কারণে গানটি গাওয়ার সময় এক ধরণের ধ্যানমগ্ন ও ধীরস্থির আবহ তৈরি হয়, যা মানুষের বিক্ষিপ্ত মনকে স্থির করতে সাহায্য করে।

গানের মূল ভাবটি প্রচলিত প্রার্থনার ধারণাকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়। সাধারণ মানুষ ঈশ্বরের কাছে বিপদ থেকে মুক্তি চায়, কিন্তু কবি এখানে চাইছেন বিপদে ভয় না পাওয়ার সাহস। তিনি দুঃখের সময় সান্ত্বনা চান না, বরং দুঃখকে জয় করার শক্তি চান। সংসারে ক্ষতি বা বঞ্চনা এলেও যেন নিজের মনের জোর না কমে এবং চরম দুঃসময়েও যখন পৃথিবীর সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখনও যেন ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস বা সংশয় না জাগে—এটিই এই গানের মূল দর্শন।

এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক আবেদন। রবীন্দ্রসংগীতের ধ্রুপদী ধারার এই গানটিতে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে এক অত্যন্ত পরিণত, স্বাবলম্বী ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের চিত্র আঁকা হয়েছে। খুব বেশি বাদ্যযন্ত্রের বাহুল্য ছাড়াই কেবল হারমোনিয়াম বা এসরাজের মৃদু রেশ এবং শিল্পীর দরাজ ও স্পষ্ট গায়কী এই গানের মূল কথাগুলোকে সরাসরি শ্রোতার অন্তরে গেঁথে দিতে সক্ষম হয়।

উৎস (Sources)

এই নিবন্ধের ঐতিহাসিক, স্বরলিপি এবং ভাবার্থ সংক্রান্ত তথ্যসমূহ রবীন্দ্র-রচনাবলী (গীতবিতান, পূজা পর্যায়), বিশ্বভারতী সংগীত বোর্ড প্রকাশিত প্রামাণ্য স্বরলিপি গ্রন্থমালা এবং শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবন আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন