কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থের ‘আহ্বান গীত’ কবিতা — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আহ্বান গীত’ কবিতাটি তাঁর কাব্যগ্রন্থ কড়ি ও কোমল-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপনামূলক কবিতা। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থে কবির যৌবনের আবেগ, আত্মজাগরণ, মানবতাবোধ, সমাজচেতনা ও বিশ্বমানবতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার নানা প্রকাশ দেখা যায়। কড়ি ও কোমল গ্রন্থটি ১২৯৩ বঙ্গাব্দে মুদ্রিত হয়েছিল এবং গ্রন্থটির উৎসর্গ ছিল সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি।

‘আহ্বান গীত’-এ কবি নিস্তব্ধতা, ভীরুতা ও আত্মসংকীর্ণতার বিপরীতে বাঙালিকে বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কবিতার শুরুতেই পৃথিবীব্যাপী জাগরণের প্রতীক হিসেবে “বিষাণ”-এর ধ্বনি শোনা যায়। সেই বিশ্ব-আহ্বানের সামনে কবির প্রশ্ন—“কইরে বাঙ্গালী কই!” অর্থাৎ বিশ্বের কর্মযজ্ঞে, মানবসমাজের বৃহত্তর অগ্রযাত্রায় বাঙালির অবস্থান কোথায়?

কবিতাটি তাই কেবল জাতিগত আত্মমর্যাদার আহ্বান নয়; এর গভীরে রয়েছে আত্মজাগরণ, কর্ম, মানবসমাজে অংশগ্রহণ, জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা এবং বিশ্বমানবতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। শেষদিকে এই আহ্বান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—মাতৃভাষার মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের মর্যাদা বিশ্বপরিসরে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় হিসেবে।

 

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়তথ্য
কবিতার নামআহ্বান গীত
কবিরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাব্যগ্রন্থকড়ি ও কোমল
প্রকাশকাল১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ
প্রকাশিত পৃষ্ঠা২৫৩–২৬২
প্রধান বিষয়আত্মজাগরণ, কর্ম, মানবতা, বিশ্বচেতনা, বাঙালির জাগরণ
প্রধান প্রতীকবিষাণ, পতাকা, সমুদ্র, সেতু, প্রভাত, সূর্যের কিরণ
ভাষাবাংলা
ধরনআহ্বানধর্মী ও উদ্দীপনামূলক কবিতা

কড়ি ও কোমল-এর মূল মুদ্রিত সংস্করণে “আহ্বান গীত” ২৫৩ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে শুরু হয়েছে এবং ২৬২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিস্তৃত।

 

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, সাহিত্যিক, সুরকার, গীতিকার, নাট্যকার ও চিন্তাবিদ। তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের প্রথম পর্বেই ব্যক্তিসত্তা, প্রকৃতি, প্রেম, সমাজ, দেশ, মানবতা ও বিশ্বমানবতার নানা প্রশ্ন তাঁর কবিতায় জায়গা করে নেয়।

কড়ি ও কোমল সেই প্রারম্ভিক ও বিকাশমান পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে “আহ্বান গীত”-এর মতো কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সমাজ ও মানবজগতের দিকে কবির দৃষ্টি প্রসারিত হতে দেখা যায়। গ্রন্থটির মূল সংস্করণে “আহ্বান গীত” ২৫৩–২৬২ পৃষ্ঠায় রয়েছে।

কবিতাটির বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নিজেকে ছোট করে, ভয়ে, সংকোচে বা আত্মতুষ্টিতে আবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। এই কারণে কবিতায় “ঘর”, “দ্বার”, “পথ”, “সমুদ্র”, “সেতু”, “আকাশ” ও “জগৎ”—এই স্থানিক প্রতীকগুলোও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

 

সম্পূর্ণ কবিতা

আহ্বান গীত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পৃথিবী জুড়িয়া বেজেছে বিষাণ,
শুনিতে পেয়েছি ওই—
সবাই এসেছে লইয়া নিশান,
কইরে বাঙ্গালী কই!
সুগভীর স্বর কাঁদিয়া বেড়ায়
বঙ্গসাগরের তীরে,
“বাঙ্গালীর ঘরে কে আছিস্‌ আয়”
ডাকিতেছে ফিরে ফিরে!
ঘরে ঘরে কেন দুয়ার ভেজানাে,
পথে কেন নাই লােক,
সারা দেশ ব্যাপি মরেছে কে যেন,
বেঁচে আছে শুধু শােক।
গঙ্গা বহে শুধু আপনার মনে
চেয়ে থাকে হিমগিরি,
রবিশশি উঠে অনন্ত গগণে
আসে যায় ফিরি ফিরি।

কত না সংকট, কত না সন্তাপ
মানব শিশুর তরে,
কত না বিবাদ কত না বিলাপ
মানব শিশুর ঘরে!
কত ভায়ে ভায়ে নাহি যে বিশ্বাস,
কেহ কারে নাহি মানে,
ঈর্ষা নিশাচরী ফেলিছে নিশ্বাস
হৃদয়ের মাঝখানে।
হৃদয়ে লুকানাে হৃদয় বেদনা,
সংশয় আঁধারে যুঝে,
কে কাহারে আজি দিবে গাে সান্তনা,
কে দিবে আলয় খুঁজে!
মিটাতে হইবে শােক তাপ ত্রাস,
করিতে হইবে রণ,
পৃথিবী হইতে উঠেছে উচ্ছ্বাস—
শােন শােন সৈন্যগণ।

পৃথিবী ডাকিছে আপন সন্তানে,
বাতাস ছুটেছে তাই—
গৃহ তেয়াগিয়া ভায়ের সন্ধানে
চলিয়াছে কত ভাই!
বঙ্গের কুটীরে এসেছে বারতা,
শুনেছে কি তাহা সবে?
জেগেছে কি কবি শুনাতে সে কথা
জলদ-গম্ভীর রবে?
হৃদয় কি কারো উঠেছে উথলি?
আঁখি খুলেছে কি কেহ?
ভেঙ্গেছে কি কেহ সাধের পুতলি?
ছেড়েছে খেলার গেহ?
কেন কানাকানি, কেনরে সংশয়?
কেন মর’ ভয়ে লাজে?
খুলে ফেল দ্বার ভেঙ্গে ফেল ভয়,
চল পৃথিবীর মাঝে।

ধরা-প্রান্তভাগে ধূলিতে লুটায়ে,
জড়িমা-জড়িত তনু,
আপনার মাঝে আপনি গুটায়ে,
ঘুমায় কীটের অণু!
চারিদিকে তার আপন উল্লাসে
জগৎ ধাইছে কাজে,
চারিদিকে তার অনন্ত আকাশে
স্বরগ সঙ্গীত বাজে1
চারিদিকে তার মানব মহিমা
উঠিছে গগণ পানে,
খুঁজিছে মানব আপনার সীমা,
অসীমের মাঝ খানে।
সে কিছুই তার করে না বিশ্বাস,
আপনারে জানে বড়,
আপনি গণিছে আপন নিশ্বাস,
ধূলা করিতেছে জড়!

সুখ দুঃখ লয়ে অনন্ত সংগ্রাম,
জগতের রঙ্গভূমি—
হেথায় কে চায় ভীরুর বিশ্রাম,
কেনগাে ঘুমাও তুমি!
ডুবিছ ভাসিছ অশ্রুর হিল্লোলে,
শুনিতেছ হাহাকার—
তীর কোথা আছে দেখ মুখ তুলে,
এ সমুদ্র কর পার।
মহা কলরবে সেতু বাঁধে সবে,
তুমি এস, দাও যােগ—
বাধার মতন জড়াও চরণ—
একিরে করম ভােগ!
তা যদি না পার’ সর’ তবে সর,
ছেড়ে দেও তবে স্থান,
ধূলায় পড়িয়া মর’ তবে মর’—
কেন এ বিলাপ গান!

ওরে চেয়ে দেখ্‌ মুখ আপনার,
ভেবে দেখ্‌ তােরা কারা?
মানবের মত ধরিয়া আকার,
কেনরে কীটের পারা?
আছে ইতিহাস আছে কুলমান,
আছে মহত্বের খণি,
পিতৃপিতামহ গেয়েছে যে গান,
শােন্ তার প্রতিধ্বনি!
খুঁজেছেন তারা চাহিয়া আকাশে
গ্রহতারকার পথ—
জগৎ ছাড়ায়ে অসীমের আশে
উড়াতেন মনােরথ।
চাতকের মত সত্যের লাগিয়া
তৃষিত আকুল প্রাণে,
দিবস রজনী ছিলেন জাগিয়া
চাহিয়া বিশ্বের পানে।

তবে কেন সবে বধির হেথায়,
কেন অচেতন প্রাণ,
বিফল উচ্ছাসে কেন ফিরে যায়
বিশ্বের আহ্বান গান।
মহত্বের গাথা পশিতেছে কানে,
কেনরে বুঝিনে ভাষা?
তীর্থযাত্রী যত পথিকের গানে,
কেন রে জাগে না আশা?
উন্নতির ধ্বজা উড়িছে বাতাসে,
কেনরে নাচেনা প্রাণ,
নবীন কিরণ ফুটেছে আকাশে
কেনরে জাগেনা গান?
কেন আছি শুয়ে, কেন আছি চেয়ে,
পড়ে আছি মুখোমুখি,
মানবের হােত চলে গান গেয়ে,
জগতের সুখে সুখী!

চল দিবালােকে, চল লােকালয়ে,
চল জন কোলাহলে—
মিশাব হৃদয় মানব হৃদয়ে
অসীম আকাশ তলে!
তরঙ্গ তুলিব তরঙ্গের পরে,
নৃত্য গীত নব নব,
বিশ্বের কাহিনী কোটি কণ্ঠ স্বরে
এক-কণ্ঠ হ’য়ে কব!
মানবের সুখ মানবের আশা
বাজিবে আমার প্রাণে,
শত লক্ষকোটি মানবের ভাষা
ফুটিবে আমার গানে!
মানবের কাজে মানবের মাঝে
আমরা পাইব ঠাঁই—
বঙ্গের দুয়ারে তাই শৃঙ্গ বাজে—
শুনিতে পেয়েছি ভাই।

 

 

 

Romanized Version

Ahobban Geet
Rabindranath Tagore

Prithibi juriya bejechhe bishan,
Shunite peyechhi oi—
Sobai eshechhe loiẏa nishan,
Koire Bangali koi!
Sugobhir swar kandiẏa beray
Bongosagorer tire,
“Bangali’r ghore ke achhis ay”
Dakitese phire phire!
Ghore ghore keno duyar bhejano,
Pothe keno nai lok,
Sara desh byapi morechhe ke jeno,
Benche achhe shudhu shok.
Ganga bohe shudhu apnar mone
Cheye thake Himgiri,
Robishoshi othe ananta gogone
Ase jay phiri phiri.

Koto na shongkot, koto na shontap
Manob shishur tore,
Koto na bibad koto na bilap
Manob shishur ghore!
Koto bhaye bhaye nahi je bishwas,
Keho kare nahi mane,
Irsha nishachori felichhe nishshash
Hridoyer majhkhane.
Hridoye lukano hridoy bedona,
Shongshoy andhare jujhe,
Ke kahare aji dibe go shantona,
Ke dibe aloy khuje!
Mitate hoibe shok tap tras,
Korite hoibe ron,
Prithibi hoite uthechhe uchchhash—
Shon shon soinyogon.

Prithibi dakichhe apon shontane,
Batash chhutechhe tai—
Griho teẏagiẏa bhayer shondhane
Choliẏachhe koto bhai!
Bonger kutire eshechhe barta,
Shunechhe ki taha sobe?
Jegechhe ki kobi shunate se kotha
Jolod-gombhir robe?
Hridoy ki karo uthechhe utholi?
Ankhi khulechhe ki keho?
Bhengechhe ki keho shader putuli?
Chherechhe khelār geho?
Keno kanakani, kenore shongshoy?
Keno mor’ bhoye laje?
Khule fel duyar bhenge fel bhoy,
Chol prithibir majhe.

Dhara-prantobhage dhulite lutaye,
Jorima-jorito tanu,
Aponar majhe aponi gutaẏe,
Ghumay kiter anu!
Charidike tar apon ullashe
Jagot dhaichhe kaje,
Charidike tar ananta akashe
Sworgo shongit baje!
Charidike tar manob mohima
Uthichhe gogon pane,
Khujichhe manob aponar shima,
Ashimer majh khane.
Se kichhui tar kore na bishwas,
Aponare jane boro,
Aponi gonichhe apon nishshash,
Dhula koritechhe jor!

Shukh dukh loye ananta shongram,
Jagoter rongobhumi—
Hethay ke chay bhirur bishram,
Kenogo ghumao tumi!
Dubichh bhashichh oshrur hillole,
Shunitechho hahakar—
Tir kotha achhe dekh mukh tule,
E shomudro kor par.
Maha kolorobe setu badhe sobe,
Tumi esho, dao jog—
Badhar moton jorao choron—
Eki re kormobhog!
Ta jodi na par’ sor’ tobe sor,
Chhere dio tobe sthan,
Dhulay poriya mor’ tobe mor’—
Keno e bilap gan!

Ore cheye dekh mukh aponar,
Bhebe dekh tora kara?
Manober moto dhoriya akar,
Kenore kiter para?
Achhe itihash achhe kulman,
Achhe mohotter khoni,
Pitri-pitamah geyechhe je gan,
Shon tar protidhwani!
Khujechhen tara chahiya akashe
Grohotarakar poth—
Jagot chharaye oshimer ashe
Uraten monoroth.
Chatoker moto shotyer lagiya
Trishito akul prane,
Dibosh rojoni chhilen jagiya
Chahiya bishwer pane.

Tobe keno sobe bodhir hethay,
Keno ochoton pran,
Bifol uchchhashe keno phire jay
Bishwer ahobban gan.
Mohotter gatha pashitechhe kane,
Kenore bujhine bhasha?
Tirthojatri joto pothiker gane,
Keno re jage na asha?
Unnotir dhwaja urichhe batase,
Kenore nache na pran,
Nobin kiran phutechhe akashe
Kenore jagena gan?
Keno achhi shuye, keno achhi cheye,
Pore achhi mukhomukhi,
Manober hot chole gan geye,
Jagoter shukhe shukhi!

Chol dibaloke, chol lokaloye,
Chol jon kolahole—
Mishab hridoy manob hridoye
Ashim akash tole!
Torongo tulib toronger pore,
Nritya git nob nob,
Bishwer kahini koti kontho swore
Ek-kontho hoye kob!
Manober shukh manober asha
Bajibe amar prane,
Shoto lokkho koti manober bhasha
Phutibe amar gane!
Manober kaje manober majhe
Amra paib thai—
Bonger duware tai shringgo baje—
Shunite peyechhi bhai.

Muchhe fel dhula, muchh oshrujal,
Fel bhikhari’r chir—
Por’ nob saj, dhor’ nob bol,
Tol’ tol’ noto shir!
Tomader kachhe aji eshechhe
Jagoter nimonton—
Din-hin besh phele jeyo pachhe—
Dasotter aboron.
Shobhar majhare darabe jokhon
Hasiya chahibe dhire—
Purbo Robir hiran kiran
Poribe tomar shire!
Bandhon tutiya uthibe phutiya
Hridoyer shotodol,
Jagot majhare jaibe lutiya
Probhater porimol.

Uth Bonggo kobi, mayer bhashay
Mumorshure dao pran—
Jagoter lok shudhar ashay
Se bhasha koribe pan.
Chahibe moder mayer bodone,
Bhashibe noyon jole,
Bandhibe jagot ganer bandhone
Mayer choron tole.
Bishwer majhare thai nai bole,
Kanditechhe Bongobhumi,
Gan geye kobi jagoter tole
Sthan kine dao tumi.
Ekbar kobi mayer bhashay
Gao jagoter gan—
Shokol jagot bhai hoye jay—
Ghuchhe jay opoman.

 

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

১. বিশ্বজাগরণের আহ্বান

কবিতার প্রথমেই কবি এমন এক পৃথিবীর ছবি আঁকেন যেখানে সর্বত্র জাগরণের সংকেত ধ্বনিত হচ্ছে—

“পৃথিবী জুড়িয়া বেজেছে বিষাণ,
সবাই এসেছে লইয়া নিশান”

“বিষাণ” এখানে শুধু যুদ্ধের বা সমাবেশের সংকেত নয়; এটি বৃহত্তর কর্মজাগরণ ও বিশ্বসমাজে অংশগ্রহণের প্রতীক হিসেবেও পাঠ করা যায়।

এর বিপরীতে বাঙালির ঘরে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। তাই কবির তীব্র প্রশ্ন—

“কইরে বাঙ্গালী কই!”

এই প্রশ্নের মধ্যেই কবিতার মূল আহ্বান নিহিত।

২. আত্মসংকীর্ণতা থেকে মুক্তি

কবি দেখছেন, মানুষ নিজের ঘর, ভয়, সংশয় ও ক্ষুদ্রতার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে। তাই তিনি বলেন—

“খুলে ফেল দ্বার ভেঙ্গে ফেল ভয়,
চল পৃথিবীর মাঝে।”

“দ্বার” এখানে বাস্তব দরজার পাশাপাশি মানসিক সীমাবদ্ধতার প্রতীক। পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হতে হলে প্রথমে নিজের তৈরি ভয় ও সংকোচের দরজা খুলতে হবে।

৩. কর্মের আহ্বান

কবিতায় নিছক আবেগ বা বিলাপের পরিবর্তে কর্মকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কবির প্রশ্ন—

“হেথায় কে চায় ভীরুর বিশ্রাম,
কেনগো ঘুমাও তুমি!”

বিশ্বকে তিনি একটি “রঙ্গভূমি” হিসেবে দেখেছেন, যেখানে সুখ ও দুঃখ মিলিয়ে অবিরাম সংগ্রাম চলছে। তাই নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. ব্যক্তিমানুষ থেকে মানবসমাজ

কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ব্যক্তিসত্তা বৃহত্তর মানবসমাজের দিকে প্রসারিত হয়—

“মিশাব হৃদয় মানব হৃদয়ে
অসীম আকাশ তলে!”

এখানে কবির আকাঙ্ক্ষা কেবল বাঙালির জাগরণ নয়; মানবহৃদয়ের সঙ্গে মানবহৃদয়ের মিলন। পরবর্তী পংক্তিতে তিনি আরও স্পষ্ট করেন—

“মানবের সুখ মানবের আশা
বাজিবে আমার প্রাণে”

অর্থাৎ মানুষের সুখ-দুঃখকে নিজের জীবনের অংশ করে নেওয়াই তাঁর কাম্য।

৫. ইতিহাস ও পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার

কবি বাঙালিকে তার অতীত স্মরণ করিয়ে দেন—

“আছে ইতিহাস আছে কুলমান,
আছে মহত্বের খণি”

পিতৃপুরুষদের জ্ঞানান্বেষণ, সত্যের অনুসন্ধান এবং মহত্তর বিশ্বের দিকে অগ্রসর হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে তিনি বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে তুলে ধরেছেন।

৬. জ্ঞান, উন্নতি ও নবজাগরণ

“উন্নতির ধ্বজা” এবং “নবীন কিরণ”—এই দুই প্রতীক কবিতায় নতুন যুগের সূচনার ইঙ্গিত বহন করে। কবির প্রশ্ন:

“নবীন কিরণ ফুটেছে আকাশে
কেনরে জাগেনা গান?”

অর্থাৎ পৃথিবীতে পরিবর্তন ও অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও মানুষ যদি জেগে না ওঠে, তবে সেই সম্ভাবনা অর্থহীন হয়ে পড়ে।

৭. বাংলা ভাষা ও বিশ্বমানবতা

শেষ স্তবকটি কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে কবি সরাসরি “বঙ্গ কবি”-কে আহ্বান করছেন—

“উঠ বঙ্গ কবি, মায়ের ভাষায়
মুমূর্ষুরে দাও প্রাণ”

বাংলা ভাষাকে তিনি কেবল একটি আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে দেখেন না। তাঁর কল্পনায় বাংলা ভাষার গান বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে—

“একবার কবি মায়ের ভাষায়
গাও জগতের গান—
সকল জগৎ ভাই হয়ে যায়—
ঘুচে যায় অপমান।”

এই সমাপ্তি কবিতাটির জাতীয় চেতনাকে বিশ্বমানবতার সঙ্গে যুক্ত করে।

কবিতাটির দার্শনিক তাৎপর্য

‘আহ্বান গীত’-এর গভীরে রয়েছে নিজেকে অতিক্রম করার দর্শন। ব্যক্তি যদি নিজের সংকীর্ণ পরিচয়, ভয় ও আত্মতুষ্টির মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তবে তার সম্ভাবনা সীমিত হয়ে যায়। কিন্তু সে যখন মানবসমাজের বৃহত্তর স্রোতে প্রবেশ করে, তখন তার জীবন বৃহত্তর অর্থ লাভ করে।

কবিতাটিতে তাই তিনটি পরিসর ক্রমশ বিস্তৃত হয়—

নিজের ঘর → মানবসমাজ → বিশ্বমানবতা

প্রথমে ঘরের দরজা খুলতে হবে, তারপর লোকালয়ে যেতে হবে, মানুষের সঙ্গে হৃদয় মিলাতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত “জগতের গান” গাইতে হবে।

এই অর্থে কবিতাটির আহ্বান কেবল বাঙালির প্রতি নয়; এটি মানুষের ভয় থেকে সাহসে, নিষ্ক্রিয়তা থেকে কর্মে, বিচ্ছিন্নতা থেকে সংযোগে এবং সংকীর্ণতা থেকে বিশ্বমানবতায় উত্তরণের আহ্বান।

ভাষা ও কাব্যশৈলী

‘আহ্বান গীত’-এর ভাষা অত্যন্ত গতিশীল। কবি বারবার ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন—“চল”, “খুলে ফেল”, “ভেঙ্গে ফেল”, “দাও”, “তোল”, “ধর”, “উঠ”—যার ফলে কবিতাটি একটি বক্তৃতামূলক ও সংগীতধর্মী গতি পেয়েছে।

“বিষাণ”, “নিশান”, “শৃঙ্গ”, “সমুদ্র”, “সেতু”, “প্রভাত”, “কিরণ”, “শতদল”—এই প্রতীকগুলো কবিতার উদ্দীপনামূলক আবহকে আরও শক্তিশালী করেছে।

একই সঙ্গে প্রশ্নবোধক বাক্যের ব্যাপক ব্যবহার কবিতাটিকে আত্মজিজ্ঞাসার রূপ দিয়েছে। যেমন—

“কেন আছি শুয়ে, কেন আছি চেয়ে”

অথবা—

“কেনরে নাচেনা প্রাণ,
নবীন কিরণ ফুটেছে আকাশে
কেনরে জাগেনা গান?”

এসব প্রশ্ন পাঠককেও কবিতার আহ্বানের অংশ করে নেয়।

‘আহ্বান গীত’-এর মূল বক্তব্য সংক্ষেপে

  • পৃথিবী এগিয়ে চলেছে; তাই আত্মসংকীর্ণতায় আবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
  • ভয়, সংশয় ও নিষ্ক্রিয়তা থেকে বেরিয়ে কর্মের পথে যেতে হবে।
  • ব্যক্তিমানুষকে বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।
  • ইতিহাস ও পূর্বপুরুষের মহত্তর সাধনা থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে।
  • জ্ঞান, উন্নতি ও নতুন যুগের আহ্বানে সাড়া দিতে হবে।
  • বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের বৃহত্তর মানবসমাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
  • জাতীয় আত্মমর্যাদা শেষ পর্যন্ত বিশ্বমানবতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পথ হতে পারে।
  • কবির কাছে প্রকৃত জাগরণ হলো—নিজেকে অতিক্রম করে মানবতার বৃহত্তর পরিসরে প্রবেশ করা।

উৎস

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কড়ি ও কোমল, ১৮৮৬; “আহ্বান গীত”, পৃষ্ঠা ২৫৩–২৬২। মূল গ্রন্থের ডিজিটাল পাঠ ও পৃষ্ঠাভিত্তিক সংস্করণে কবিতাটি সংরক্ষিত আছে।
  • বাংলা উইকিসংকলন, কড়ি ও কোমল—১৮৮৬ সংস্করণের ডিজিটাল পাঠ।
  • Parabaas-এ ‘আহ্বান গীত’-এর সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট ও কবিতার নির্বাচিত অংশ নিয়ে আলোচনা।
  • পশ্চিমবঙ্গের Netaji Subhas Open University-এর বাংলা সাহিত্য পাঠ্যসামগ্রীতে ‘আহ্বান গীত’-এর ছন্দ ও পঙ্‌ক্তি বিশ্লেষণের উল্লেখ রয়েছে।

মন্তব্য করুন