স্তন ২ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কড়ি ও কোমল (১৮৮৬)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যগ্রন্থের পূর্ববর্তী কবিতারই এক অবিচ্ছেদ্য এবং গভীর রূপ হলো এই ‘স্তন ২’ কবিতাটি। প্রথম কবিতাটিতে নারীর সৌন্দর্য ও লজ্জাবতী মনের যে আবহ তৈরি হয়েছিল, এই দ্বিতীয় কবিতাটিতে কবিগুরু তাকে আরও এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে গিয়ে মাতৃত্বের এক বিশ্বজনীন ও স্বর্গীয় জয়গান গেয়েছেন।

কবিতার শুরুতেই কবি নারীর এই রূপকে তুলনা করেছেন পুরাণের পবিত্র সুমেরু পর্বত বা দেবতাদের কনক-অচলের (সোনার পাহাড়) সাথে। সতী নারীর এই উন্নত স্থানটি যেন স্বর্গের আলো দিয়ে মানুষের এই মর্ত্যের পৃথিবীকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। এরপর কবি এক অপূর্ব মহাজাগতিক রূপক ব্যবহার করে বলেছেন, এই মায়ের কোল থেকেই যেন মানবজীবনের ‘শিশু-সূর্য’ প্রতিদিন সকালে নতুন আশা নিয়ে জেগে ওঠে, আবার সারাদিনের ক্লান্তির পর ‘শ্রান্ত-সূর্য’ হয়ে সেখানেই পরম শান্তিতে পরম আশ্রয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এই নিঝুম পবিত্র দুটি শিখরে যেন স্বয়ং ঈশ্বরের আশীর্বাদ দিন-রাত জেগে থাকে।

নারীর এই রূপটি যে আসলে পৃথিবীর সমস্ত জীবকূলের বেঁচে থাকার মূল রসদ, কবি তা খুব সুন্দর করে মনে করিয়ে দিয়েছেন। এখান থেকেই অবিরাম ঝরে পড়ছে চিরন্তন স্নেহের অমৃত ধারা, যা তৃষ্ণার্ত পৃথিবীর অধর বা ঠোঁটকে পরম মমতায় সিক্ত করে তুলছে। ঘুমন্ত এই সুন্দর ধরণীর বুকে এটি যেন এক পরম সুখের আশ্রয় এবং পুরো অসহায় মানবজাতির এক অনন্য ও অসীম নির্ভরতার জায়গা।

কবিতার শেষে এসে রবীন্দ্রনাথ এক পরম সত্যকে প্রকাশ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, এই পৃথিবীর বুকে যদি কোথাও স্বর্গ সত্যি সত্যি নেমে এসে মাটিকে চুম্বন করে থাকে, তবে তা হলো মানবরূপী দেব-শিশুর এই ‘মাতৃভূমি’ বা মায়ের পবিত্র কোল। স্থূল বা শরীরী ভাবনাকে একপাশে সরিয়ে রেখে, মাতৃত্বের যে এক পরম নির্ভরতা, পবিত্রতা এবং ঈশ্বরদত্ত রূপ রয়েছে—রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত সুনিপুণ ও ভক্তিভরে এই কবিতায় সেই শাশ্বত সত্যটিই ফুটিয়ে তুলেছেন।

স্তন ২ [ কবিতা ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । কড়ি ও কোমল

পবিত্র সুমেরু বটে এই সে হেথায়,
দেবতা-বিহার-ভূমি কনক-অচল।
উন্নত সতীর স্ত’ন স্বরগ-প্রভায়
মানবের মর্ত্ত্যভূমি করেছে উজ্জ্বল!
শিশু-রবি হােথা হতে ওঠে সুপ্রভাতে,
শ্রান্ত-রবি সন্ধ্যাবেলা হােথা অস্ত যায়।
দেবতার আঁখিতারা জেগে থাকে রাতে
বিমল পবিত্র দুটী বিজন শিখরে।
চিরস্নেহ-উৎস-ধারে অমৃত নিঝরে
সিক্ত করি তুলিতেছে বিশ্বের অধর!
জাগে সদা সুখ-সুপ্ত ধরণীর পরে,
অসহায় জগতের অমীম নির্ভর।
ধরুণীর মাঝে কি স্বর্গ আছে চুমি,
দেব-শিশু মানবের ঐ মাতৃভূমি।

মন্তব্য করুন