ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের বিরহ কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জীবনের অন্যতম কাব্যগ্রন্থ ‘ছবি ও গান’-এর একটি অত্যন্ত বেদনামধুর ও দৃশ্যপ্রধান কবিতা হলো ‘বিরহ’। প্রভাতের স্নিগ্ধ আলো, ফুটন্ত ফুল আর মৃদু বাতাসের বিপরীতে এক বিরহিণী রমণীর অন্তরের গভীর হাহাকার ও অশ্রুসজল আকুতিকে কবি এখানে এক নিটোল ও করুণ চিত্রশিল্পের মতো উপস্থাপন করেছেন।

 

ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থের বিরহ কবিতা

বিরহ কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবিরহ
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থছবি ও গান
প্রকাশের বছর১৮৮৪ (১২৯১ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনরোমান্টিক বিরহের চিত্রধর্মী লিরিক (Descriptive Elegiac Lyric)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৮৮৪ সালে প্রকাশিত ‘ছবি ও গান’ কাব্যগ্রন্থে তরুণ রবীন্দ্রনাথের ইন্দ্রিয়ানুভূতির প্রখরতা ও আবেগঘন চিত্রকল্প রচনার বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এই পর্বে কবি দৃশ্যকে ছবির মতো এবং মনস্তাত্ত্বিক আবেগকে সুরের মতো রূপ দিতে আগ্রহী ছিলেন। প্রকৃতির নবজাগরণ ও প্রভাতের উজ্জ্বলতার সাথে বিরহী হৃদয়ের বেদনার যে তীব্র বৈপরীত্য, তা এই কবিতায় এক অসহায় রমনীর ক্রন্দন ও আত্মহারা গানের মাধ্যমে মূর্ত হয়ে উঠেছে।

বিরহ সম্পূর্ণ কবিতা:

ধীরে ধীরে প্রভাত হল,           আঁধার মিলায়ে গেল

                   উষা হাসে কনকবরণী,

বকুল গাছের তলে                কুসুম রাশির পরে

                   বসিয়া পড়িল সে রমণী,

আঁখি দিয়া ঝরঝরে               অশ্রুবারি ঝ’রে পড়ে

                   ভেঙে যেতে চায় যেন বুক,

রাঙা রাঙা অধর দুটি              কেঁপে কেঁপে ওঠে কতো,

                   করতলে সকরুণ মুখ।

অরুণ আঁখির ‘পরে,              অরুণের আভা পড়ে,

                   কেশপাশে অরুণ লুকায়,

দুই হাতে মুখ ঢাকে               কার নাম ধরে ডাকে

                   কেন তার সাড়া নাহি পায়।

বহিছে প্রভাত-বায়                আঁচলে লুটিয়ে যায়,

                   মাথায় ঝরিয়ে পড়ে ফুল,

ডালপালা দোলে ধীরে             কাননে সরসীতীরে

                   ফুটে ওঠে মল্লিকা মুকুল।

পা দুখানি ছড়াইয়া                 পুরবের পানে চেয়ে

                   ললিতে প্রাণের গান গায়

গাহিতে গাহিতে গান,             সব যেন অবসান

                   যেন সব-কিছু ভুলে যায়।

প্রাণ যেন গানে মিশে,             অনন্ত আকাশ-মাঝে

                   উদাসী হইয়ে চ’লে যায়,

ব’সে ব’সে শুধু গান গায়।

 

বিরহ সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Dhire dhire probhat holo, Andhar milaye gelo
Usha hashe konokoboroni,
Bokul gachher tole Kushum rashir pore
Boshiya porilo she romoni,
Ankhi diya jhorojhore Oshrubari jho’re pore
Bhenge jete chay jeno buk,
Ranga ranga odhor duti Kempe kempe othe koto,
Korotole shokorun mukh.
Orun ankhir ‘pore, Oruner abha pore,
Keshpashe orun lukay,
Dui hate mukh dhake Kar nam dhore dake
Keno tar shara nahi pay.
Bohichhe probhat-bay Anchole lutiye jay,
Mathay jhoriye pore phul,
Dalpala dole dhire Kanone shoroshitire
Phute othe mollika mukul.
Pa dukhani chhoraiya Purober pane cheye
Lolite praner gan gay
Gahite gahite gan, Shob jeno oboshan
Jeno shob-kichhu bhule jay.
Pran jeno gane mishe, Ononto akash-majhe
Udashii hoiye cho’le jay,
Bo’she bo’she shudhu gan gay.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • প্রকৃতির রূপ বনাম অন্তরের হাহাকার:
    “উষা হাসে কনকবরণী… / আঁখি দিয়া ঝরঝরে অশ্রুবারি ঝ’রে পড়ে / ভেঙে যেতে চায় যেন বুক,”
    — বাইরের প্রকৃতিতে সোনালি উষার হাসি, মৃদু বাতাস আর মল্লিকা মুকুলের প্রস্ফুটন থাকলেও বিরহিণীর বুক ভেঙে কান্না নামছে। প্রকৃতির সজীবতার সাথে অন্তরের একাকীত্বের এই বৈপরীত্য বেদনাকে আরও গভীর করে তোলে।
  • উত্তরহীন আর্তি ও অশ্রুপাত:
    “দুই হাতে মুখ ঢাকে কার নাম ধরে ডাকে / কেন তার সাড়া নাহি পায়।”
    — অশ্রুসিক্ত চোখে দুই হাতে মুখ ঢেকে প্রিয়জনের নাম ধরে ডাকা এবং কোনো সাড়া না পাওয়ার ব্যাকুলতা বিরহের নির্মম রূপটিকে প্রকাশ করে।
  • সুরের মাঝে আত্মবিসর্জন ও মুক্তি:
    “গাহিতে গাহিতে গান, সব যেন অবসান / যেন সব-কিছু ভুলে যায়। / প্রাণ যেন গানে মিশে, অনন্ত আকাশ-মাঝে / উদাসী হইয়ে চ’লে যায়,”
    — কান্নার পর বিরহিণী ললিত রাগে গান গাইতে শুরু করে। সেই গানের সুরে সে নিজের জাগতিক সমস্ত শোক ও স্মৃতি বিস্মৃত হয়। তার ব্যাকুল প্রাণ যেন সুরের ডানায় ভর করে অনন্ত আকাশে এক উদাসী সত্তা হয়ে মিলিয়ে যায়।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ছবি ও গান কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন