কল্পনা কাব্যগ্রন্থের রাত্রি কবিতা | Ratri Kobita

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ কল্পনা (১৯৫২) তাঁর কাব্যজীবনের অন্তিম পর্বের এক অনন্য সৃষ্টি। এই গ্রন্থে কল্পনা, ধ্যান, নৈঃশব্দ্য ও মহাবিশ্বের অন্তর্লীন সত্যের প্রতি কবির গভীর আকর্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। কল্পনা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “রাত্রি” কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের ধ্যানী ও দার্শনিক সত্তার এক অনুপম নিদর্শন, যেখানে রাত্রি শুধু সময়ের একটি পর্ব নয়—সে হয়ে ওঠে জ্ঞান, সাধনা ও নীরব জাগরণের এক মহাসভা।

রাত্রি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মোরে করো সভাকবি ধ্যানমৌন তোমার সভায়

           হে শর্বরী, হে অবগুণ্ঠিতা!

তোমার আকাশ জুড়ি যুগে যুগে জপিছে যাহারা

          বিরচিত তাহাদের গীতা।

তোমার তিমিরতলে যে বিপুল নিঃশব্দ উদ্‌যোগ

          ভ্রমিতেছে জগতে জগতে

আমারে তুলিয়া লও সেই তার ধ্বজচক্রহীন

          নীরবঘর্ঘর মহারথে।

তুমি একেশ্বরী রানী বিশ্বের অন্তর-অন্তঃপুরে

          সুগম্ভীরা হে শ্যামাসুন্দরী,

দিবসের ক্ষয়হীন বিরাট ভাণ্ডারে প্রবেশিয়া

          নীরবে রাখিছ ভাণ্ড ভরি।

নক্ষত্র-রতন-দীপ্ত নীলাকান্ত সুপ্তিসিংহাসনে

          তোমার মহান্‌ জাগরণ।

আমারে জাগায়ে রাখো সে নিস্তব্ধ জাগরণতলে

          নির্নিমেষ পূর্ণ সচেতন।

কত নিদ্রাহীন চক্ষু যুগে যুগে তোমার আঁধারে

          খুঁজেছিল প্রশ্নের উত্তর।

তোমার নির্বাক মুখে একদৃষ্টে চেয়েছিল বসি

          কত ভক্ত জুড়ি দুই কর।

দিবস মুদিলে চক্ষু, ধীরপদে কৌতূহলীদল

          অঙ্গনে পশিয়া সাবধানে

তব দীপহীন কক্ষে সুখদুঃখ জন্মমরণের

          ফিরিয়াছে গোপন সন্ধানে।

 

স্তম্ভিত তমিস্রপুঞ্জ কম্পিত করিয়া অকস্মাৎ

          অর্ধরাত্রে উঠেছে উচ্ছ্বাসি

সদ্যস্ফুট ব্রহ্মমন্ত্র আন্দোলিত ঋষিকণ্ঠ হতে

          আন্দোলিয়া ঘন তন্দ্রারাশি।

পীড়িত ভুবন লাগি মহাযোগী করুণাকাতর,

          চকিতে বিদ্যুৎরেখাবৎ

তোমার নিখিললুপ্ত অন্ধকারে দাঁড়ায়ে একাকী

          দেখেছে বিশ্বের মুক্তিপথ।

জগতের সে-সব যামিনীর জাগরূকদল

          সঙ্গীহীন তব সভাসদ্‌

কে কোথা বসিয়া আছে আজি রাত্রে ধরণীর মাঝে,

          গনিতেছে গোপন সম্পদ–

কেহ কারে নাহি জানে, আপনার স্বতন্ত্র আসনে

          আসীন স্বাধীন স্তব্ধচ্ছবি–

হে শর্বরী, সেই তব বাক্যহীন জাগ্রত সভায়

          মোরে করি দাও সভাকবি।

রাত্রির রূপ : অন্ধকার নয়, অন্তর্দৃষ্টি

এই কবিতায় রাত্রিকে কবি সম্বোধন করেছেন “শর্বরী”, “অবগুণ্ঠিতা”, “শ্যামাসুন্দরী”—রাজকীয় ও আধ্যাত্মিক অভিধায়। এখানে রাত্রি কোনো ভয়ংকর অন্ধকার নয়; বরং সে একেশ্বরী রানীর মতো, যিনি দিনের সমস্ত কর্ম ও ক্লান্তিকে নীরবে নিজের ভাণ্ডারে সঞ্চয় করেন। দিবসের আলো যেখানে থেমে যায়, সেখান থেকেই রাত্রির গভীর কাজ শুরু হয়।

রাত্রির তিমিরতলে যে “বিপুল নিঃশব্দ উদ্যোগ” চলমান—কবি নিজেকে সেই মহাযাত্রার অংশ করে নিতে চান। তিনি প্রার্থনা করেন, যেন রাত্রির নীরব রথে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়, যেখানে শব্দ নেই, আছে কেবল সচেতনতা।

নীরব জাগরণ ও আত্মঅন্বেষণ

রবীন্দ্রনাথ রাত্রিকে দেখেছেন জাগরণের সময় হিসেবে।
নক্ষত্রে-ভরা নীল আকাশের নিচে রাত্রি যেন এক সুপ্ত সিংহাসনে অধিষ্ঠিত—বাহ্যিক নিদ্রার আড়ালে তার অন্তর্গত জাগরণ চিরন্তন। কবি চান, এই স্তব্ধ জাগরণতলে তিনি যেন নির্নিমেষ সচেতন থাকতে পারেন।

ইতিহাসের বহু নিদ্রাহীন চক্ষু—ঋষি, সাধক, ভক্ত—রাত্রির আঁধারেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। দিবসের কোলাহল থেমে গেলে, মানুষ রাত্রির দীপহীন কক্ষে প্রবেশ করে জীবনের সুখ-দুঃখ, জন্ম-মৃত্যুর গোপন রহস্য অন্বেষণ করে।

রাত্রির সভা ও সভাকবি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা

কবিতার শেষ অংশে রাত্রি হয়ে ওঠে এক নীরব সভা—যেখানে কোনো কোলাহল নেই, নেই পারস্পরিক পরিচয়, অথচ সবাই নিজ নিজ আসনে বসে গভীর সাধনায় রত। এই সভার সদস্যরা জগতের মুক্তিপথের সন্ধানী।

কবি এই বাক্যহীন, স্তব্ধ সভায় নিজের স্থান চান—
তিনি চান, রাত্রি তাঁকে করুক “সভাকবি”
এখানে সভাকবি মানে বাহবা পাওয়া কবি নন, বরং নীরব সত্যের কণ্ঠস্বর, যিনি শব্দহীনতার মধ্যেও উপলব্ধির ভাষা খুঁজে পান।

“রাত্রি” কবিতাটি কল্পনা কাব্যগ্রন্থের এক গভীর দার্শনিক রচনা। এটি আমাদের শেখায়—অন্ধকার মানেই শূন্যতা নয়, নীরবতা মানেই নিষ্ক্রিয়তা নয়। রাত্রির স্তব্ধতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে গভীর জাগরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতার মাধ্যমে রাত্রিকে করেছেন মানবচেতনার অন্তর্লোকের দ্বার—যেখানে পৌঁছাতে হলে চাই নীরবতা, ধ্যান ও পূর্ণ সচেতনতা।

মন্তব্য করুন