বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক কবিতা হলো ‘নূতন ও সনাতন’। মাত্র চার চরণের এই কবিতায় কবি মানবীয় আইন এবং চিরন্তন ন্যায়ধর্মের মধ্যকার দ্বন্দ্ব অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। রাজা বা রাষ্ট্রক্ষমতার অহংকার এবং চিরকালের শাশ্বত ন্যায়ের শাশ্বত সত্তার রূপক রূপের মাধ্যমে এখানে আইনের সীমাবদ্ধতা ও ন্যায়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | নূতন ও সনাতন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৯ |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও রাজনৈতিক নীতিশিক্ষা কবিতা (Philosophical and Political Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর অন্তর্নিহিত দর্শন অত্যন্ত গভীর ও শাণিত। ‘নূতন ও সনাতন’ কবিতায় কবি রাজা বা ক্ষমতাশালীদের মানসিকতাকে রূপায়িত করেছেন, যারা মনে করে যে তাদের প্রণীত আইন বা নির্দেশই হলো ন্যায়বিচার। কিন্তু প্রকৃতির ও সমাজের শাশ্বত ‘ন্যায়ধর্ম’ তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই অহংকারকে চূর্ণ করে দেয় এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে কৃত্রিম আইন বা সাময়িক বিধানের চেয়ে চিরন্তন নৈতিকতাই আসল সত্য।
নূতন ও সনাতন – সম্পূর্ণ কবিতা
রাজা ভাবে, নব নব আইনের ছলে
ন্যায় সৃষ্টি করি আমি। ন্যায়ধর্ম বলে,
আমি পুরাতন, মোরে জন্ম কেবা দেয়–
যা তব নূতন সৃষ্টি সে শুধু অন্যায়।
নূতন ও সনাতন Romanized Version
Raja bhabe, nobo nobo ainer chhole
Nyay srishti kori ami. Nyaydhormo bole,
Ami puraton, more jonmo keba dey–
Ja tovo nuton srishti she shudhu onnyay.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- রূপক ও ক্ষমতার অহংকার: কবিতায় ‘রাজা’ হলো রাষ্ট্রক্ষমতা বা সাময়িক আইনপ্রণেতার প্রতীক, যে মনে করে তার ইচ্ছামতো তৈরি করা আইন বা বিধিবিধানই চূড়ান্ত ন্যায়।
- আইনের কৃত্রিমতা: রাজা মনে করে সে নিজের ক্ষমতা ও আইনের ছলে প্রতিদিন নতুন নতুন ন্যায় বা বিধান সৃষ্টি করছে। এটি মানুষের অহংকারী ক্ষমতার প্রতীক, যা মনে করে শক্তি প্রয়োগ বা শাসনের মাধ্যমেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
- ন্যায়ধর্মের শাশ্বত বাণী: রাজা যখন নিজের শক্তির বড়াই করে, তখন শাশ্বত ‘ন্যায়ধর্ম’ তার প্রতিবাদ করে অত্যন্ত শক্ত ভাষায়। ন্যায়ধর্ম বলে যে সে হলো আবহমানকালের ‘পুরাতন’, যার কোনো জন্ম বা শুরু নেই। মানুষের তৈরি করা সাময়িক বা নতুন আইন যদি সেই চিরন্তন সত্য ও ন্যায়ের পরিপন্থী হয়, তবে তা আইন নয়, বরং কেবলই ‘অন্যায়’।
- “যা তব নূতন সৃষ্টি সে শুধু অন্যায়।”— এই চরণের মাধ্যমে কবি এক চিরন্তন রাজনৈতিক ও নৈতিক সত্য তুলে ধরেছেন। বাহ্যিক ক্ষমতা বা কৃত্রিম আইনের জোরে সাময়িকভাবে কোনো শাসন চালানো যেতে পারে, কিন্তু শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়ের মানদণ্ডে যদি তা না টেকে, তবে সেই সমস্ত বিধান বা সৃষ্টি কেবলই অন্যায়ের নামান্তর।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।
