বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি শাণিত ও দার্শনিক কবিতা হলো ‘উপলক্ষ’। মাত্র দুই চরণের এই ক্ষুদ্র কবিতায় কবি কাল (সময়) এবং ঘড়ির পারস্পরিক সম্পর্ক ও মানুষের আত্মম্ভরিতার এক দারুণ রূপক ফুটিয়ে তুলেছেন। মহাকাল যেখানে সমস্ত সৃষ্টির উৎস, সেখানে মানুষের তৈরি একটি কৃত্রিম যন্ত্র বা ঘড়ি নিজেকেই সেই সৃষ্টির স্রষ্টা বলে দাবি করে বসে—এই অহংকার ও ব্যঙ্গের প্রকাশ ঘটেছে এখানে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | উপলক্ষ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৯ |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও ব্যঙ্গাত্মক কবিতা (Philosophical and Satirical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন ও সমাজবাস্তবতা। ‘উপলক্ষ’ কবিতায় কবি মহাকালের অবিরাম প্রবাহ এবং মানুষের তৈরি ঘড়ি দিয়ে সময় মাপার এক অদ্ভুত অহংকারকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছেন। ঘড়ি তো কেবল সময় দেখার একটা মাধ্যম বা উপলক্ষ মাত্র, কিন্তু সে যখন কালকে ছাপিয়ে নিজে স্রষ্টা হওয়ার গৌরব দাবি করে, তখন তা মানুষের অন্ধ অহংকার ও আত্মপ্রচারের এক নিখুঁত ব্যঙ্গচিত্র হয়ে ওঠে।
উপলক্ষ – সম্পূর্ণ কবিতা
কাল বলে, আমি সৃষ্টি করি এই ভব।
ঘড়ি বলে, তা হলে আমিও স্রষ্টা তব।
উপলক্ষ Romanized Version
Kal bole, ami srishti kori ei bhobo.
Ghori bole, ta hole amio srishta tobo.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- রূপক ও ব্যঙ্গের ব্যবহার: কবিতায় ‘কাল’ বা মহাকাল হলো অসীম সময় ও প্রকৃত সৃষ্টির প্রতীক, আর ‘ঘড়ি’ হলো মানুষের তৈরি একটি সীমিত যন্ত্রের প্রতীক, যা দিয়ে কালকে পরিমাপ করা হয়।
- কালের সৃষ্টির দাবি: মহাকাল বা কাল ঘোষণা করে যে সে এই ‘ভব’ বা জগৎ এবং এর সমস্ত অস্তিত্বকে সৃষ্টি করেছে। কালই হলো বিশ্বচরাচরের মূল চালিকাশক্তি।
- ঘড়ির ভ্রান্ত অহংকার: কালের এই দাবির বিপরীতে ঘড়ি অত্যন্ত আস্ফালনের সাথে বলে ওঠে যে, যদি কালই সবকিছু সৃষ্টি করে থাকে, তবে সেই কালকে তো ঘড়িই তার টিকটিক শব্দের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখে ও প্রকাশ করে; সুতরাং ঘড়িই কালের স্রষ্টা!
- “ঘড়ি বলে, তা হলে আমিও স্রষ্টা তব।”— এই চরণের মাধ্যমে কবি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ অনেক সময় কোনো বৃহৎ প্রক্রিয়ার সামান্য উপলক্ষ বা বাহনমাত্র হয়েও নিজেকে সেই বিষয়ের মূল চালিকাশক্তি বা স্রষ্টা বলে মনে করার মতো হাস্যকর অহংকারে লিপ্ত হয়।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।