বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি গভীর শাণিত, কৌতুকপূর্ণ ও মনস্তাত্ত্বিক কবিতা হলো ‘প্রবীণ ও নবীন’। মাত্র চার চরণের এই কবিতায় কবি বয়সের বৈপরীত্য, বয়োবৃদ্ধির সামাজিক সম্মান এবং যৌবন বা কাঁচা বয়সের অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষাকে এক অসাধারণ রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনের দুটি ভিন্ন পর্যায়—যৌবন ও বার্ধক্যের চাওয়া-পাওয়ার চিরন্তন দ্বন্দ্ব এখানে চমৎকারভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | প্রবীণ ও নবীন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | কণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৯ |
| কবিতার ধরন | ব্যঙ্গাত্মক ও দার্শনিক কবিতা (Satirical and Philosophical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো আকারে ক্ষুদ্র হলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন ও সমাজবাস্তবতা। ‘প্রবীণ ও নবীন’ কবিতায় কবি ‘পাকা চুল’ (বার্ধক্য ও অভিজ্ঞতার প্রতীক) এবং ‘কাঁচা চুল’ (যৌবনের প্রতীক)-এর একটি চমৎকার কাল্পনিক কথোপকথন ব্যবহার করেছেন। সমাজে প্রবীণরা বয়সের ভারে ও অভিজ্ঞতার কারণে একধরনের সামাজিক সম্মান বা মর্যাদা পেয়ে থাকেন, যা দেখে অনেক সময় তরুণ বা যুবকরা হেসেই বা ঈর্ষা করে সময় কাটায়। কিন্তু বার্ধক্যের ভার ও জরাগ্রস্ততা বইতে থাকা পাকা চুল তখন উল্টো সেই তারুণ্যকে ফিরে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মানুষের জীবনের এই চিরন্তন চাওয়াপাওয়ার অমিল ও রূপকচিত্র এই কবিতায় দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রবীণ ও নবীন – সম্পূর্ণ কবিতা
পাকা চুল মোর চেয়ে এত মান্য পায়,
কাঁচা চুল সেই দুঃখে করে হায়-হায়।
পাকা চুল বলে, মান সব লও বাছা,
আমারে কেবল তুমি করে দাও কাঁচা।
প্রবীণ ও নবীন Romanized Version
Paka chul mor cheye eto manyo pay,
Kacha chul shei dukkhe kore hay-hay.
Paka chul bole, man shob low bacha,
Amare kebol tumi kore dao kacha.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- রূপক ও ব্যঙ্গের ব্যবহার: কবিতায় ‘পাকা চুল’ হলো বার্ধক্যের অভিজ্ঞতা, জরা এবং বয়সের প্রতীক, আর ‘কাঁচা চুল’ হলো যৌবনের তেজ, শক্তি ও জীবনের শুরুর দিকের প্রতীক।
- কাঁচা চুলের আক্ষেপ: কাঁচা চুল বা তরুণ বয়সীরা ভাবে যে সমাজের সম্মান, গুরুত্ব ও গুরুজনসুলভ মান্য কেবল পাকা চুল বা বয়স্করাই পেয়ে থাকে, আর তাই সে সেই সম্মান না পেয়ে মনে দুঃখ পায় ও আফসোস করে।
- পাকা চুলের উল্টো আকুতি: কিন্তু পাকা চুল তখন এক মজার ও গভীর বাস্তব সত্য তুলে ধরে। সে বলে যে ওই সামাজিক মান-মর্যাদা বা সম্মান সে সব কাঁচা চুলকে দিয়ে দিতে একশবার রাজি আছে, বিনিময়ে যদি কেউ তার বার্ধক্যের ক্লান্তি মুছে দিয়ে তাকে আবার ‘কাঁচা’ বা তরুণ করে দিতে পারে!
- “আমারে কেবল তুমি করে দাও কাঁচা।”— এই চরণের মাধ্যমে কবি মানুষের জীবনের এক গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন। তরুণ বয়সে মানুষ কেবল বয়স্কদের সম্মান বা কর্তৃত্ব দেখে আকৃষ্ট হয়, কিন্তু বার্ধক্যে পৌঁছানোর পর মানুষ বুঝতে পারে যে তারুণ্য ও প্রাণশক্তিই জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। হারানো যৌবন ফিরে পাওয়ার এই আকুলতাই মানুষের চিরন্তন স্বভাব।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।