কথা ও কাহিনী কাব্যগ্রন্থের দীন দান কবিতা | Deen Daan Kobita

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর কাব্যগ্রন্থ কথা ও কাহিনী বাংলা সাহিত্যে নৈতিকতা ও মানবিক দর্শনের এক শক্তিশালী দলিল। এই গ্রন্থের কাহিনিনির্ভর কবিতাগুলোতে রবীন্দ্রনাথ রাজশক্তি, ধর্ম, দান ও মানবিক দায়িত্বের প্রকৃত অর্থ অনুসন্ধান করেছেন। কথা ও কাহিনী কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত “দীন দান” কবিতাটি সেই অনুসন্ধানেরই এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে কবি প্রশ্ন তুলেছেন—দান কি কেবল ঐশ্বর্যের প্রদর্শন, না কি দয়ার অন্তরঙ্গ প্রকাশ? রাজা ও সাধুর সংলাপের মাধ্যমে এই কবিতায় উন্মোচিত হয়েছে ধর্ম ও মানবতার গভীর দ্বন্দ্ব।

দীন দান কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

নিবেদিল রাজভৃত্য, “মহারাজ, বহু অনুনয়ে

সাধুশ্রেষ্ঠ নরোত্তম তোমার সোনার দেবালয়ে

না লয়ে আশ্রয় আজি পথপ্রান্তে তরুচ্ছায়াতলে

করিছেন নামসংকীর্তন। ভক্তবৃন্দ দলে দলে

ঘেরি তাঁরে দরদর-উদ্‌বেলিত আনন্দধারায়

ধৌত ধন্য করিছেন ধরণীর ধূলি। শূন্যপ্রায়

দেবাঙ্গন; ভৃঙ্গ যথা স্বর্ণময় মধুভান্ড ফেলি

সহসা কমলগন্ধে মত্ত হয়ে দ্রুত পক্ষ মেলি

ছুটে যায় গুঞ্জরিয়া উন্মীলিত পদ্ম-উপবনে

উন্মুখ পিপাসাভরে, সেইমতো নরনারীগণে

সোনার দেউল-পানে না তাকায়ে চলিয়াছে ছুটি

যেথায় পথের প্রান্তে ভক্তের হৃদয়পদ্ম ফুটি

বিতরিছে স্বর্গের সৌরভ। রত্নবেদিকার ‘পরে

একা দেব রিক্ত দেবালয়ে।’

                             শুনি রাজা ক্ষোভভরে

সিংহাসন হতে নামি গেলা চলি যেথা তরুচ্ছায়ে

সাধু বসি তৃণাসনে; কহিলেন নমি তাঁর পায়ে,

“হেরো প্রভু, স্বর্ণশীর্ষ নৃপতিনির্মিত নিকেতন

অভ্রভেদী দেবালয়, তারে কেন করিয়া বর্জন

দেবতার স্তবগান গাহিতেছ পথপ্রান্তে বসে?’

“সে মন্দিরে দেব নাই’ কহে সাধু।

                             রাজা কহে রোষে,

“দেব নাই! হে সন্ন্যাসী, নাস্তিকের মতো কথা কহ।

রত্নসিংহাসন-‘পরে দীপিতেছে রতনবিগ্রহ–

শূন্য তাহা?’

          “শূন্য নয়, রাজদম্ভে পূর্ণ’ সাধু কহে,

“আপনায় স্থাপিয়াছ, জগতের দেবতারে নহে।’

ভ্রূ কুঞ্চিয়া কহে রাজা, “বিংশ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দিয়া

রচিয়াছি অনিন্দিত যে মন্দির অম্বর ভেদিয়া,

পূজামন্ত্রে নিবেদিয়া দেবতারে করিয়াছি দান,

তুমি কহ সে মন্দিরে দেবতার নাহি কোনো স্থান!’

শান্ত মুখে কহে সাধু, “যে বৎসর বহ্নিদাহে দীন

বিংশতি সহস্র প্রজা গৃহহীন অন্নবস্ত্রহীন

দাঁড়াইল দ্বারে তব, কেঁদে গেল ব্যর্থ প্রার্থনায়

অরণ্যে, গুহার গর্ভে, পথপ্রান্তে তরুর ছায়ায়,

অশ্বত্থবিদীর্ণ জীর্ণ মন্দিরপ্রাঙ্গণে, সে বৎসর

বিংশ লক্ষ মুদ্রা দিয়া রচি তব স্বর্ণদীপ্ত ঘর

দেবতারে সমর্পিলে। সে দিন কহিলা ভগবান–

“আমার অনাদি ঘরে অগণ্য আলোক দীপ্যমান

অনন্তনীলিমা-মাঝে; মোর ঘরে ভিত্তি চিরন্তন

সত্য, শান্তি, দয়া, প্রেম। দীনশক্তি যে ক্ষুদ্র কৃপণ

নাহি পারে গৃহ দিতে গৃহহীন নিজ প্রজাগণে

সে আমারে গৃহ করে দান!’ চলি গেলা সেই ক্ষণে

পথপ্রান্তে তরুতলে দীন-সাথে দীনের আশ্রয়।

অগাধ সমুদ্র-মাঝে স্ফীত ফেন যথা শূন্যময়

তেমনি পরম শূন্য তোমার মন্দির বিশ্বতলে,

স্বর্ণ আর দর্পের বুদ্‌বুদ্‌!’

                   রাজা জ্বলি রোষানলে,

কহিলেন, “রে ভন্ড পামর, মোর রাজ্য ত্যাগ করে

এ মুহূর্তে চলি যাও।’

                   সন্ন্যাসী কহিলা শান্ত স্বরে,

“ভক্তবৎসলেরে তুমি যেথায় পাঠালে নির্বাসনে

সেইখানে, মহারাজ, নির্বাসিত কর ভক্তজনে।’

 

কবিতার কাহিনি : সোনার মন্দির ও পথপ্রান্তের সাধু

কবিতার শুরুতে দেখা যায় এক বিস্ময়কর দৃশ্য। রাজভৃত্য রাজাকে জানায়—এক মহান সাধু রাজপ্রাসাদের সোনার মন্দিরে আশ্রয় না নিয়ে পথপ্রান্তের তরুচ্ছায় বসে নামসংকীর্তন করছেন। আশ্চর্যের বিষয়, সেই সাধুর চারদিকে সাধারণ মানুষ ভিড় করছে, আর রাজমন্দির হয়ে উঠেছে শূন্য।

এই সংবাদে ক্ষুব্ধ রাজা নিজে এসে সাধুর কাছে প্রশ্ন করেন—এত ঐশ্বর্যপূর্ণ মন্দির ছেড়ে তিনি কেন পথের ধুলায় বসে আছেন।

সাধুর বাণী : দান ও দয়ার প্রকৃত অর্থ

সাধুর উত্তর রাজাকে বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ করে তোলে—

“সে মন্দিরে দেব নাই।”

সাধু ব্যাখ্যা করেন, যে মন্দির রাজদম্ভ ও স্বর্ণের অহংকারে গড়া, সেখানে ঈশ্বরের বাস হতে পারে না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন সেই ভয়াবহ বছরের কথা, যখন দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার প্রজা গৃহহীন ও অনাহারে কাতর ছিল, অথচ সেই সময়েই রাজা বিপুল অর্থ ব্যয় করে সোনার মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

সাধুর ভাষায়, দেবতার আসল গৃহ হলো—সত্য, শান্তি, দয়া ও প্রেম। যে রাজা নিজের দীন প্রজাদের আশ্রয় দিতে পারে না, তার নির্মিত মন্দিরে ঈশ্বর অধিষ্ঠিত হন না।

দ্বন্দ্ব ও নির্বাসন : ক্ষমতার মুখোমুখি সত্য

এই কঠিন সত্য শুনে রাজা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে সাধুকে রাজ্য ত্যাগের আদেশ দেন। কিন্তু সাধুর শেষ বাণী আরও গভীর—

“ভক্তবৎসলেরে তুমি যেথায় পাঠালে নির্বাসনে,
সেইখানে, মহারাজ, নির্বাসিত কর ভক্তজনে।”

অর্থাৎ, দীন ও নিঃস্ব মানুষদের যেখানেই ত্যাগ করা হয়েছে, সেখানেই প্রকৃত ভক্ত ও ঈশ্বরের অবস্থান।

দার্শনিক তাৎপর্য

“দীন দান” কবিতায় রবীন্দ্রনাথ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—

  • দান যদি অহংকারের হয়, তা শূন্য

  • ধর্ম যদি মানবতাহীন হয়, তা মিথ্যা

  • ঈশ্বর থাকেন না স্বর্ণমন্দিরে, থাকেন দীন মানুষের পাশে

এই কবিতা রাজশক্তি ও ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক নির্ভীক মানবতাবাদী উচ্চারণ।

“দীন দান” কেবল একটি কাব্যকাহিনি নয়—এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামাজিক ও নৈতিক দর্শনের এক তীব্র প্রকাশ। কথা ও কাহিনী কাব্যগ্রন্থের এই কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দান মানে দেওয়ার গর্ব নয়, বরং দুঃখীর পাশে দাঁড়ানোর দায়। মানবিকতা যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে কোনো মন্দিরই ঈশ্বরের গৃহ হতে পারে না—এই চিরন্তন সত্যই কবিতাটির মূল বাণী।

মন্তব্য করুন