শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের একদিন তুচ্ছ আলাপের ফাঁক দিয়ে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ৪১ সংখ্যক কবিতা হলো ‘একদিন তুচ্ছ আলাপের ফাঁক দিয়ে’। জীবনের প্রাত্যহিক তুচ্ছতার মাঝে হঠাৎ ঘটে যাওয়া ক্ষণস্থায়ী কিন্তু চিরদুর্লভ এক অনুভূতির চমক এবং পরবর্তী জীবনে নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোতে সেই অমূল্য স্মৃতির ফিরে ফিরে আসার ব্যাকুলতা এ কবিতায় গভীর কাব্যিক নিবিড়তায় ব্যক্ত হয়েছে।

শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের একদিন তুচ্ছ আলাপের ফাঁক দিয়ে কবিতা

একদিন তুচ্ছ আলাপের ফাঁক দিয়ে কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামএকদিন তুচ্ছ আলাপের ফাঁক দিয়ে (৪১ সংখ্যক কবিতা)
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থশেষ সপ্তক
প্রকাশের বছর১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনআধুনিক গদ্যকবিতা ও মনস্তাত্ত্বিক স্মৃতিচারণমূলক লিরিক (Prose Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:

১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্তছন্দের আশ্রয়ে জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সংবেদন ও স্মৃতির আলো-আঁধারিকে রূপ দিয়েছেন। মানুষের প্রাত্যহিক সাধারণ কথাবার্তার ভিড়ে কখনো কখনো অপ্রত্যাশিতভাবে এমন এক পলক দৃষ্টি বা হাসির দেখা মেলে, যা সারাজীবনের জন্য হৃদয়ে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যায়। এই কবিতায় একদা দেখা সেই ‘অমৃতরেখা’ কীভাবে বৃষ্টিমুখর প্রবাসে, সায়াহ্নের নীরবতায় কিংবা শীতের রিক্ত মাঠের নিঃসঙ্গ দুপুরে বিরহের গভীর সুর হয়ে ফিরে আসে—কবি তারই নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক চিত্র এঁকেছেন।

একদিন তুচ্ছ আলাপের ফাঁক দিয়ে (সম্পূর্ণ কবিতা):

একদিন তুচ্ছ আলাপের ফাঁক দিয়ে

কোন্‌ অভাবনীয় স্মিতহাস্যে

আমার আত্মবিহ্বল যৌবনটাকে

দিলে তুমি দোলা;

হঠাৎ চমক দিয়ে গেল তোমার মুখে

একটি অমৃতরেখা;

আর কোনোদিন তার দেখা মেলেনি।

জোয়ারের তরঙ্গলীলায় গভীর থেকে উৎক্ষিপ্ত হল

চিরদুর্লভের একটি রত্নকণা

শতলক্ষ ঘটনার সমুদ্র-বেলায়।

এমনি এক পলকে বুকে এসে লাগে

অপরিচিত মুহূর্তের চকিত বেদনা

প্রাণের আধখোলা জালনায়

দূর বনান্ত থেকে

পথ-চলতি গানে।

অভূতপূর্বের অদৃশ্য অঙ্গুলি বিরহের মীড় লাগিয়ে যায়

হৃদয়-তারে

বৃষ্টিধারামুখর নির্জন প্রবাসে,

সন্ধ্যাযূথীর করুণ স্নিগ্ধ গন্ধে,

রেখে দিয়ে যায় কোন্‌ অলক্ষ্যে আকস্মিক

আপন স্খলিত উত্তরীয়ের স্পর্শ।

তার পরে মনে পড়ে

একদিন সেই বিস্ময়-উন্মনা নিমেষটিকে

অকারণে অসময়ে;

মনে পড়ে শীতের মধ্যাহ্নে,

যখন গোরুচরা শস্যরিক্ত মাঠের দিকে

চেয়ে চেয়ে বেলা যায় কেটে;

মনে পড়ে, যখন সঙ্গহারা সায়াহ্নের অন্ধকারে

সূর্যাস্তের ওপার থেকে বেজে ওঠে

ধ্বনিহীন বীণার বেদনা।

একদিন তুচ্ছ আলাপের ফাঁক দিয়ে সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:

Ekdin tuchchho alaper phank diye
Kon obhaboniyo smitohasshe
Amar atmobihbol joubontake
Dile tumi dola;
Hothat chomok diye gelo tomar mukhe
Ekti omritorekha;
Ar konodin tar dekha meleni.
Jowarer torongolilay gobhir theke utkkhipto holo
Chirodurlobher ekti rotnokona
Shotolokkho ghotonar shomudro-belay.
Emni ek poloke buke eshe lage
Oporichito muhurter chokito bedona
Praner adhkhola jalnay
Dur bonanto theke
Poth-cholti gane.
Obhutopurber odrishsho onguli biroher mir lagiye jay
Hridoy-tare
Brishtidharamukhor nirjon probashe,
Shondhyajuthir korun snigdho gondhe,
Rekhe diye jay kon olokkhye akossmik
Apon skholito uttoriye-r shporsho.
Tar pore mone pore
Ekdin shei bisshoy-unmona nimeshtike
Okaron-e oshomoye;
Mone pore shiter moddhahne,
Jokhon goruchora shosshyorikto mather dike
Cheye cheye bela jay kete;
Mone pore, jokhon shonggohara sayahner ondhokare
Shurjaster opar theke beje othe
Dhonihin binar bedona.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • ক্ষণিকের দ্যোতনা ও চিরদুর্লভ রত্নকণা:
    “একদিন তুচ্ছ আলাপের ফাঁক দিয়ে / কোন্‌ অভাবনীয় স্মিতহাস্যে / আমার আত্মবিহ্বল যৌবনটাকে / দিলে তুমি দোলা; / হঠাৎ চমক দিয়ে গেল তোমার মুখে / একটি অমৃতরেখা; / আর কোনোদিন তার দেখা মেলেনি।”
    — জীবনের অগভীর ও সাধারণ আলাপের মাঝে হঠাৎ প্রেমাস্পদের মুখে ভেসে ওঠা এক টুকরো হাসি কবির যৌবনে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। শতলক্ষ ঘটনার সমুদ্রতটে সেই অনন্য মুহূর্তটি ছিল গভীর সমুদ্র থেকে ভেসে আসা এক অমূল্য রত্নকণার মতো, যা আর দ্বিতীয়বার ফিরে আসেনি।
  • অলক্ষ্য বিরহ ও প্রকৃতির ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য স্পর্শ:
    “অভূতপূর্বের অদৃশ্য অঙ্গুলি বিরহের মীড় লাগিয়ে যায় / হৃদয়-তারে / বৃষ্টিধারামুখর নির্জন প্রবাসে, / সন্ধ্যাযূথীর করুণ স্নিগ্ধ গন্ধে,”
    — সেই ক্ষণিক দেখার স্মৃতি দূরবর্তী কোনো পথচলতি গানের সুর, বৃষ্টির শব্দ কিংবা সন্ধ্যাযূথীর স্নিগ্ধ ঘ্রাণের সাথে মিশে হৃদয়ে এক মিষ্টি বিরহবেদনা জাগিয়ে তোলে। স্মৃতিটি যেন এক অদৃশ্য উত্তরীয়ের স্পর্শের মতো অলক্ষ্যে ছুঁয়ে যায়।
  • রিক্ততায় স্মৃতির অবগাহন ও নীরব বীণা:
    “মনে পড়ে শীতের মধ্যাহ্নে, / যখন গোরুচরা শস্যরিক্ত মাঠের দিকে / চেয়ে চেয়ে বেলা যায় কেটে; / মনে পড়ে, যখন সঙ্গহারা সায়াহ্নের অন্ধকারে / সূর্যাস্তের ওপার থেকে বেজে ওঠে / ধ্বনিহীন বীণার বেদনা।”
    — জীবনের শেষভাগে এসে অবসরে ও শূন্যতায় সেই ক্ষণিক মুহূর্তটি অকারণে মনে পড়ে। শীতের ফসলহীন রিক্ত মাঠ এবং নিঃসঙ্গ সন্ধ্যার অন্ধকারে সূর্যাস্তের ওপার থেকে যেন বেজে ওঠে এক শব্দহীন সুর—যা অপূর্ণ প্রেমের চিরন্তন হাহাকারকে মূর্ত করে তোলে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন