বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিণত বয়সের আধুনিক গদ্যকবিতার সংকলন ‘শেষ সপ্তক’-এর ২৭ সংখ্যক কবিতা হলো ‘ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন’। শীতের রিক্ততা পেরিয়ে নববসন্তের আগমনে প্রকৃতির নবীন কিশলয়ের মাঝে কবি খুঁজে পান একদা অব্যক্ত রয়ে যাওয়া এক প্রেমের স্মৃতি—যা দ্বিধা ও অন্তরালের কারণে কোনোদিন পূর্ণ প্রকাশ পায়নি।
Table of Contents
শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থের ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন কবিতা
ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন (২৭ সংখ্যক কবিতা) |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | শেষ সপ্তক |
| প্রকাশের বছর | ১৯৩৫ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আধুনিক গদ্যকবিতা ও স্মৃতিকাতর প্রেমের লিরিক (Prose Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯৩৫ সালে প্রকাশিত ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ মুক্ত গদ্যছন্দে জীবনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি ও স্মৃতির বেদনাকে রূপায়িত করেছেন। পৌষের শীতের শেষে বাতাবিলেবু গাছে কচি পাতার আকস্মিক উন্মেষ কবিকে মনে করিয়ে দেয় প্রথম ছন্দের আবিষ্কারে বিস্মিত আদি কবি বাল্মীকিকে। প্রকৃতির এই নতুন প্রকাশ কবির মনে জাগিয়ে তোলে অতীতের এক অর্ধ-উন্মোচিত ভালোবাসার কথা। দখিন বাতাস বইলেও যে সংকোচের পর্দা সেদিন পুরোপুরি সরেনি, সেই অপূর্ণতা ও না-বলা বাণীর চিরন্তন হাহাকারই এই কবিতার মূল উপজীব্য।
ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন সম্পূর্ণ কবিতা:
ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন;
কৌতূহলী ভোরের আলো
কুয়াশার আবরণ দিলে সরিয়ে।
হঠাৎ দেখি শিশিরে-ভেজা বাতাবি গাছে
ধরেছে কচি পাতা;
সে যেন আপনি বিস্মিত।
একদিন তমসার কূলে বাল্মীকি
আপনার প্রথম নিশ্বসিত ছন্দে
চকিত হয়েছিলেন নিজে,–
তেমনি দেখলেম ওকে।
অনেকদিনকার নিঃশব্দ অবহেলা থেকে
অরুণ-আলোতে অকুণ্ঠিত বাণী এনেছে
এই কয়টি কিশলয়;
সে যেন সেই একটুখানি কথা
তুমিই বলতে পারতে,
কিন্তু না ব’লে গিয়েছ চলে।
সেদিন বসন্ত ছিল অনতিদূরে;
তোমার আমার মাঝখানে ছিল
আধ-চেনার যবনিকা
কেঁপে উঠল সেটা মাঝে মাঝে;
মাঝে মাঝে তার একটা কোণ গেল উড়ে;
দুরন্ত হয়ে উঠল দক্ষিণ বাতাস,
তবু সরাতে পারেনি অন্তরাল।
উচ্ছৃঙ্খল অবকাশ ঘটল না;
ঘণ্টা গেল বেজে,
সায়াহ্নে তুমি চলে গেলে অব্যক্তের অনালোকে।
ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Phuriye gelo pousher din;
Koutuholi bhorer alo
Kuyashar aboron dile shoriye.
Hothat dekhi shishire-bheja batabi gachhe
Dhorechhe kochi pata;
She jeno aponi bisshito.
Ekdin Tomoshar kule Balmiki
Aponar prothom nishshoshito chhonde
Chokito hoyechhilen nije,–
Temoni dekhlem oke.
Onekdinkar nishshobdo obohela theke
Orun-alote okunthito bani eneche
Ei koyti kisholoy;
She jeno shei ektukhani kotha
Tumi-i bolte parte,
Kintu na bo’le giyechho chole.
Shedin boshonto chhilo onotidure;
Tomar amar majkhane chhilo
Adh-chenar jobonika
Kempe uthlo sheta majhe majhe;
Majhe majhe tar ekta kon gelo ure;
Duronto hoye uthlo dokkhin batash,
Tobu shorate pareni ontoral.
Uchchhringkhol obokash ghotlo na;
Ghonta gelo beje,
Sayahne tumi chole gele obbokter onaloke.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- প্রকৃতির নবজাগরণ ও আদি কবির বিস্ময়:“হঠাৎ দেখি শিশিরে-ভেজা বাতাবি গাছে / ধরেছে কচি পাতা; / সে যেন আপনি বিস্মিত। / একদিন তমসার কূলে বাল্মীকি / আপনার প্রথম নিশ্বসিত ছন্দে / চকিত হয়েছিলেন নিজে,–“— শীতের কুয়াশা ভেদ করে বাতাবি গাছে কচি পাতার অকস্মাৎ জেগে ওঠাকে কবি তুলনা করেছেন ক্রৌঞ্চ-বিরহে তমসা নদীর তীরে বাল্মীকির মুখ দিয়ে প্রথম অনুষ্টুপ ছন্দ বের হওয়ার সেই ঐতিহাসিক ও অলৌকিক বিস্ময়ের সাথে।
- অব্যক্ত কথার প্রতীক কিশলয়:“অরুণ-আলোতে অকুণ্ঠিত বাণী এনেছে / এই কয়টি কিশলয়; / সে যেন সেই একটুখানি কথা / তুমিই বলতে পারতে, / কিন্তু না ব’লে গিয়েছ চলে।”— সকালের আলোয় সদ্য ফোটা সতেজ পাতাগুলো যেন সেই না-বলা কথাটিকেই স্পষ্ট করে দিচ্ছে, যা প্রিয়জন সেদিন বলতে পারত অথচ সংকোচে মুখ ফুটে না বলেই চিরতরে চলে গেছে।
- অর্ধ-উন্মোচিত অন্তরাল ও বিদায়ের ট্র্যাজেডি:“তোমার আমার মাঝখানে ছিল / আধ-চেনার যবনিকা / কেঁপে উঠল সেটা মাঝে মাঝে; … দুরন্ত হয়ে উঠল দক্ষিণ বাতাস, / তবু সরাতে পারেনি অন্তরাল। / উচ্ছৃঙ্খল অবকাশ ঘটল না; / ঘণ্টা গেল বেজে, / সায়াহ্নে তুমি চলে গেলে অব্যক্তের অনালোকে।”— বসন্তের আগমনী হাওয়া সেই আধো-চেনার পর্দাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সম্পূর্ণ উন্মোচন ঘটার অবকাশ মেলেনি। জীবনের চলার সময় শেষ হয়ে আসায় প্রিয়জন না-বলা কথা বুকে চেপেই বিদায়ের অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (শেষ সপ্তক কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।