রবীন্দ্রনাথের গান সংকলন “বিচিত্র” রবীন্দ্রসংগীতের জগতে একটি স্বতন্ত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গানের বিপুল ভাণ্ডারকে বিষয়ভিত্তিক পর্যায়ে ভাগ করেছিলেন—যেমন পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, অনুষ্ঠান ইত্যাদি। এই সুস্পষ্ট শ্রেণিবিভাগের বাইরে যে সব গান পড়ে, সেগুলিকেই তিনি “বিচিত্র” পর্যায়ে স্থান দেন। ফলে ‘বিচিত্র’ কোনো নির্দিষ্ট ভাব বা অনুভূতির একক সংকলন নয়; বরং এটি বহুরঙা মানবমনের বিচিত্র অভিব্যক্তির সমাহার।
বিচিত্র পর্যায়ের গানে কখনো গভীর ব্যক্তিগত অনুভব, কখনো দর্শনচিন্তা, কখনো প্রেম-বিরহ, আবার কখনো সংশয়, প্রশ্ন কিংবা নাটকীয় আবেগ প্রকাশ পেয়েছে। এই গানগুলিতে রবীন্দ্রনাথ অনেক বেশি স্বাধীন—ভাষা, সুর ও ভাবনায় পরীক্ষানিরীক্ষার প্রবণতা স্পষ্ট। বহু ক্ষেত্রে এগুলি অন্তর্মুখী আত্মকথনের মতো, আবার কোথাও বা কথোপকথনধর্মী ও নাটকীয়।
সংকলন হিসেবে “বিচিত্র” রবীন্দ্রসংগীতের বৈচিত্র্যকে নতুনভাবে চিনতে সাহায্য করে। এখানে কবির ব্যক্তিমানস, জীবনবোধ ও শিল্পীসত্তা কোনো বাঁধা ছাঁচে আবদ্ধ নয়। তাই ‘বিচিত্র’ শুধু একটি গানের শ্রেণি নয়, বরং রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিশীল স্বাধীনতার এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য।
রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র গানের সূচি
আমায় ক্ষমো হে
নৃত্যের তালে তালে
নাই ভয়, নাই
প্রলয়-নাচন নাচলে যখন
দুই হাতে–কালের মন্দিরা
মম চিত্ত নিতি
আমার ঘুর লেগেছে–
কমলবনের মধুপরাজি, এসো
এসো গো নূতন
মধুর মধুর ধ্বনি
ওঠো রে মলিনমুখ
আমার নাইবা হল
যখন পড়বে না
গ্রামছাড়া ওই রাঙা
এই তো ভালো
রাঙিয়ে দিয়ে যাও
আমার অন্ধপ্রদীপ শূন্য-পানে
কেন যে মন
আমারে ডাক দিল
হাটের ধুলা সয়
আমি একলা চলেছি
স্বপন-পারের ডাক শুনেছি,
আপন-মনে গোপন কোণে
সকাল-বেলার কুঁড়ি আমার
পাগল যে তুই
খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি
গোপন প্রাণে একলা
আমার জীর্ণ পাতা
এ শুধু অলস
যে আমি ওই
দিনগুলি মোর সোনার
তরীতে পা দিই
আমি ফিরব না
আয় আয় রে
কোন্ সুদূর হতে
আকাশ হতে আকাশ-পথে
আলোক-চোরা লুকিয়ে এল
জাগ’ আলসশয়নবিলগ্ন
তোমার আসন শূন্য
মোরা সত্যের ‘পরে
আমাদের শান্তিনিকেতন
না গো, এই
জীবন আমার চলছে
কী পাই নি
আমি সব নিতে
আলো আমার, আলো
ওরে ওরে ওরে
হারে রে রে
আনন্দেরই সাগর হতে
খরবায়ু বয় বেগে
যুদ্ধ যখন বাধিল
গগনে গগনে ধায়
ভাঙো বাঁধ ভেঙে
ওই সাগরের ঢেউয়ে
দুয়ার মোর পথপাশে
নাহয় তোমার যা
সে কোন্ বনের
তোমার হল শুরু
এমনি ক’রেই যায়
আমারে বাঁধবি তোরা
ফিরে ফিরে আমায়
ফুরোলো ফুরোলো এবার
ওরে শিকল, তোমায়
আমাকে যে বাঁধবে
আমি চঞ্চল হে
ওরে সাবধানী পথিক,
তরী আমার হঠাৎ
আমি কেবলই স্বপন
শুধু যাওয়া আসা,
ওগো, তোরা কে
তোমাদের দান যশের
দূর রজনীর স্বপন
ওরে মাঝি, ওরে
চোখ যে ওদের
কৃষ্ণকলি আমি তারেই
তুমি কি কেবলই
আজ তারায় তারায়
ওরে প্রজাপতি, মায়া
নমো যন্ত্র, নমো–
ওগো নদী, আপন
প্রাঙ্গণে মোর শিরীষশাখায়
হে আকাশবিহারী-নীরদবাহন
যে কেবল পালিয়ে
ও কি এল
দূরদেশী সেই রাখাল
বাজে গুরু গুরু
ও জোনাকী, কী
হ্যাদে গো নন্দরানী,
আঁধারের লীলা আকাশে
দেখা না-দেখায় মেশা হে
তুমি উষার সোনার
আকাশ, তোমায় কোন্
আধেক ঘুমে নয়ন
পাখি বলে, ‘চাঁপা,
মাটির বুকের মাঝে
আমি সন্ধ্যাদীপের শিখা,
মাটির প্রদীপখানি আছে
আমি তোমারি মাটির
যাবই আমি যাবই
আমরা নূতন যৌবনেরই
তিমিরময় নিবিড় নিশা
হায় হায় রে
সুন্দরের বন্ধন নিষ্ঠুরের
আকাশে তোর তেমনি
কোথায় ফিরিস পরম
চাহিয়া দেখো রসের
রয় যে কাঙাল
সে কোন্ পাগল
পরবাসী, চলে এসো
ছিল যে পরানের
যে কাঁদনে হিয়া
আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল
ওগো, তোমরা সবাই
ভালো মানুষ নই রে
আমাদের ভয় কাহারে
আমাদের পাকবে না
পায়ে পড়ি শোনো
ও ভাই কানাই,
কাঁটাবনবিহারিণী সুর-কানা দেবী
আমরা না-গান-গাওয়ার দল
মোদের কিছু নাই
এবার যমের দুয়োর
হায় হায় হায়
ওগো ভাগ্যদেবী পিতামহী
ওর ভাব দেখে
আমরা খুঁজি খেলার
মোদের যেমন খেলা
সব কাজে হাত
কঠিন লোহা কঠিন
আমরা চাষ করি
তোমরা হাসিয়া বহিয়া
ওগো পুরবাসী,
আমার যাবার সময়
ওরে, যেতে হবে,
আমিই শুধু রইনু
সারা বরষ দেখি
যাহা পাও তাই
মেঘেরা চলে চলে
আমি শ্রাবণ-আকাশে ওই
সন্ন্যাসী যে জাগিল