বাংলা গানের ইতিহাসে প্রেম ও প্রকৃতি—এই দুই অনুভূতির সর্বাঙ্গীণ, সূক্ষ্ম ও চিরন্তন রূপকার হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর সৃষ্ট রবীন্দ্রসংগীতে প্রেম কখনো ব্যক্তিগত আবেগ, কখনো মানবিক মিলন, কখনো বা বিশ্বপ্রাণের সঙ্গে আত্মার নিবিড় সংলাপ; আর প্রকৃতি কখনো বাহ্য জগতের সৌন্দর্য, কখনো অন্তরের অনুভবের প্রতিধ্বনি। এই দুই পর্বের গান মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য সংগীতভুবন, যেখানে মানবহৃদয় ও প্রকৃতির ছন্দ একই সুরে বাঁধা।
রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান কেবল রোমান্টিক অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ নয়—এতে আছে বিরহ, প্রত্যাশা, আত্মসমর্পণ, সংশয় ও গভীর আত্মঅন্বেষা। অন্যদিকে প্রকৃতি-পর্বের গান ঋতুচক্র, আকাশ-বাতাস, নদী-পাহাড়, আলো-অন্ধকারের মধ্য দিয়ে জীবনের নিত্য পরিবর্তন ও চিরন্তন সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। অনেক সময় এই দুই পর্ব একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়—প্রেম হয়ে ওঠে প্রকৃতির ভাষা, আর প্রকৃতি হয়ে ওঠে প্রেমের প্রতীক।
এই সূচির উদ্দেশ্য হলো প্রেম ও প্রকৃতি পর্বের গানগুলিকে সুবিন্যস্তভাবে উপস্থাপন করা, যাতে পাঠক, শ্রোতা ও গবেষক সহজে রবীন্দ্রসংগীতের এই গভীর ও রসসমৃদ্ধ ধারার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। এই সূচি রবীন্দ্রনাথের গানের জগতে প্রবেশের একটি সহায়ক দ্বার—যেখানে অনুভব, সৌন্দর্য ও মানবতার মিলন ঘটে সুরের মাধ্যমে।
রবীন্দ্রনাথের প্রেম ও প্রকৃতি পর্বের গানের সূচি
গিয়াছে সে দিন
মন হতে প্রেম যেতেছে
কেন গো সে মোরে
তোরা বসে গাঁথিস মালা,
বলি, ও আমার
গোলাপ ফুল ফুটিয়ে আছে,
পাগলিনী, তোর লাগি কী
ওই কথা বলো সখী,
শুন নলিনী, খোলো গো
ও কথা বোলো না
সোনার পিঞ্জর ভাঙিয়ে
হৃদয় মোর কোমল অতি,
হৃদয়ের মণি আদরিণী
খুলে দে তরণী,
এ কী হরষ হেরি
আমি স্বপনে রয়েছি
গেল গেল নিয়ে গেল
হাসি কেন নাই ও
একবার বলো, সখী,
কতবার ভেবেছিনু আপনা
কেমনে শুধিব বলো
এ ভালোবাসার যদি দিতে
ওকি সখা, কেন মোরে
ওকি সখা, মুছ
হা সখী, ও আদরে
ওকে কেন কাঁদালি!
এতদিন পরে, সখী,
চরাচর সকলই মিছে মায়া,
তারে দেহো গো আনি.
সাধের কাননে মোর রোপণ
সেই যদি সেই যদি
দুজনে দেখা হল মধুযামিনী
দেখায়ে দে কোথা আছে
পুরানো সেই দিনের কথা
গা সখী, গাইলি যদি,
ও গান আর গাস্ নে,
সকলই ফুরাইল.
ফুলটি ঝরে গেছে রে.
সখা হে, কী দিয়ে
বলি গো সজনী,
সহে না যাতনা দিবস
যাই যাই, ছেড়ে দাও
অসীম সংসারে যার
অনন্তসাগরমাঝে দাও তরী
ফিরায়ো না মুখখানি,
হিয়া কাঁপিছে সুখে
দাঁড়াও, মাথা খাও,
কে যেতেছিস, আয় রে
আবার মোরে পাগল
জীবনে এ কি প্রথম
কাছে ছিলে, দূরে গেলে
যদি ভরিয়া লইবে কুম্ভ
বড়ো বিস্ময় লাগে হেরি
আজি মোর দ্বারে
বৃথা গেয়েছি বহু গান
তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা
বিধি ডাগর আঁখি
বঁধু, মিছে রাগ কোরো না,
কার হাতে যে
আমাকে যে বাঁধবে ধরে,
বুঝি এল, বুঝি এল
আজ বুকের বসন ছিঁড়ে
তরুণ প্রাতের অরুণ আকাশ
জলে-ডোবা চিকন শ্যামল
স্বপনলোকের বিদেশিনীকে যেন
হৃদয় আমার ওই বুঝি
ওরে বকুল পারুল,
হিয়ামাঝে গোপনে হেরিয়ে তোমারে
যেন কোন্ ভুলের ঘোরে
অবেলায় যদি এসেছ
তুমি তো সেই যাবেই
আপনহারা মাতোয়ারা আছি
কালো মেঘের ঘটা
ওগো জলের রানী,
সন্ন্যাসী, ধ্যানে নিমগ্ন
চরণরেখা তব যে পথে
গন্ধরেখার পন্থে তোমার
এবার বুঝি ভোলার বেলা
কী ধ্বনি বাজে
ওরা অকারণে চঞ্চল
আয় তোরা আয়
ও জলের রানী,
ভয় নেই রে তোদের
ঝাঁকড়া চুলের মেয়ের কথা
মনে হল পেরিয়ে এলেম
জানি জানি এসেছ এ
কী বেদনা মোর জানো
আমার কী বেদনা
চলে যাবি এই
আমরা ঝ’রে-পড়া ফুলদল
উদাসিনী সে বিদেশিনী কে
বারে বারে ফিরে ফিরে
রিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের
আজি কোন্ সুরে বাঁধিব
প্রেম এসেছিল নিঃশব্দচরণে.
নির্জন রাতে নিঃশব্দ চরণপাতে
এসো এসো ওগো
শ্রাবণের বারিধারা ঝরিছে
যারা বিহান-বেলায় গান এনেছিল
পাখি, তোর সুর ভুলিস নে
আমার হারিয়ে যাওয়া দিন