রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “স্বদেশ” পর্যায়ের গান কেবলমাত্র সংগীতরচনা নয়—এগুলি এক বিশেষ ঐতিহাসিক মুহূর্তের মানসিক দলিল। এই গানগুলির মধ্যে দিয়ে কবিগুরু ভারতের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা ও সামষ্টিক চেতনার ভাষা নির্মাণ করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে, যখন দেশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভারে ক্লান্ত, বিভক্ত ও দিশাহীন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে স্বদেশকে কেবল ভৌগোলিক সীমানা হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত নৈতিক সত্তা হিসেবে কল্পনা করেন।
স্বদেশ পর্যায়ের গানগুলিতে নেই যুদ্ধোন্মাদনার ডাক বা সংকীর্ণ বিদ্বেষ। বরং এখানে আছে আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধির আহ্বান এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা। “আমার সোনার বাংলা”-র মতো গানে মাতৃভূমি হয়ে ওঠে স্নেহময়ী জননী, আবার অন্যত্র স্বদেশ মানে দায়িত্ব—শ্রম, শিক্ষা, সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত দেশপ্রেম আসে অন্তরের পরিশুদ্ধি থেকে; বাহ্যিক উত্তেজনা নয়, নৈতিক শক্তিই জাতিকে সত্যিকারের স্বাধীন করে।
এই পর্যায়ের গানগুলিতে গ্রামবাংলা, প্রকৃতি, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং সাধারণ জীবনের চিত্র গভীরভাবে মিশে আছে। স্বদেশ এখানে রাজনীতির মঞ্চ নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত এক অন্তরঙ্গ বাস্তবতা। তাই এই গানগুলি শোনার সময় আমরা শুধু ইতিহাসের এক অধ্যায়কে নয়, মানবিক মূল্যবোধের এক চিরকালীন আহ্বানকে অনুভব করি।
স্বদেশ পর্যায়ের গানের এই সূচি পাঠকের সামনে রবীন্দ্রনাথের সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে উন্মোচিত করবে—যেখানে দেশ মানে দায়িত্ব, প্রেম মানে কর্তব্য, আর স্বাধীনতা মানে আত্মার মুক্তি। এই গানগুলি আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ এগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়: স্বদেশকে ভালোবাসা মানে তাকে ন্যায়, করুণা ও সত্যের পথে এগিয়ে নেওয়া।
রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ পর্যায়ের গানের সূচি
আমার সোনার বাংলা
ও আমার দেশের
যদি তোর ডাক শুনে
তোর আপন জনে
এবার তোর মরা গাঙে
নিশিদিন ভরসা রাখিস
আমি ভয় করব না
আপনি অবশ হলি
আমরা মিলেছি আজ
আমরা সবাই রাজা
সঙ্কোচের বিহ্বলতা
নাই নাই ভয়
আমাদের যাত্রা হল শুরু
জনগণমন-অধিনায়ক
হে মোর চিত্ত
দেশ দেশ নন্দিত করি
মাতৃমন্দির-পুণ্য-অঙ্গন
আগে চল্, আগে চল্
আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে
বাংলার মাটি, বাংলার জল
আজি বাংলাদেশের হৃদয়
আমায় বোলো না
অয়ি ভুবনমনোমোহিনী
সার্থক জনম আমার
যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক
যে তোরে পাগল বলে
ওরে, তোরা নেই
যদি তোর ভাবনা
মা কি তুই
ছি ছি, চোখের জলে
ঘরে মুখ মলিন
এখন আর দেরি
বুক বেঁধে তুই
আমরা পথে পথে
এ ভারতে রাখো
রইল বলে রাখলে কারে
জননীর দ্বারে আজি
আজি এ ভারত
চলো যাই, চলো
শুভ কর্মপথে ধর
ওরে, নূতন যুগের
ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা
ওদের বাঁধন যতই
বিধির বাঁধন কাটবে
খ্যাপা তুই আছিস
সাধন কি মোর