বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর, ভাবনাবহ ও জীবনরসিক কবিতা হলো ‘শেষ’। ১৯০০ সালে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থের এই কবিতায় কবি জীবনের নশ্বরতা ও সমাপ্তির অবধারিত সত্যকে কোনো বিষাদ বা ভয়ের চোখে না দেখে, বরং তাকে এক পরম আনন্দের সাথে বরণ করে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন। জীবন ও সময় ক্ষণস্থায়ী বলেই ভালোবাসার তীব্রতা, অনুভূতির গভীরতা এবং প্রতি মুহূর্তের সৌন্দর্য এত বেশি মূল্যবান—এই অসাধারণ দার্শনিক সত্যই এখানে অনবদ্য ছন্দে প্রকাশিত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | শেষ |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | ক্ষণিকা |
| প্রকাশের বছর | ১৯০০ (১৩১৭ বঙ্গাব্দ বা সংকলন অনুযায়ী) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও লিরিক্যাল কবিতা (Philosophical and Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
বিশ শতকের প্রারম্ভে প্রকাশিত ‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিজীবনের এক লঘু, স্বচ্ছন্দ ও মুক্ত মনের পরিচায়ক। এই গ্রন্থের কবিতায় জীবনের ছোটোখাটো আনন্দ, বেদনা, ক্ষণস্থায়িত্ব এবং তা থেকে প্রাপ্ত প্রজ্ঞার এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে। ‘শেষ’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে, এই পৃথিবীতে স্থায়ী বলে কিছু নেই—সবকিছুরই একটি শেষ বা পরিণতি রয়েছে। কিন্তু সেই শেষকে ভয় না পেয়ে জীবনের স্বল্পস্থায়ী ছুটিটুকু পুরোপুরি উপভোগ করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।
শেষ – সম্পূর্ণ কবিতা
থাকব না ভাই, থাকব না কেউ–
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে যাও রে চলে
কালের পিছু পিছু।
অধিক দিন তো বইতে হয় না
শুধু একটি প্রাণ।
অনন্ত কাল একই কবি
গায় না একই গান।
মালা বটে শুকিয়ে মরে–
যে জন মালা পরে
সেও তো নয় অমর, তবে
দুঃখ কিসের তরে?
থাকব না ভাই, থাকব না কেউ–
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে যাও রে চলে
কালের পিছু পিছু।
সবই হেথায় একটা কোথাও
করতে হয় রে শেষ,
গান থামিলে তাই তো কানে
থাকে গানের রেশ।
কাটল বেলা সাধের খেলা
সমাপ্ত হয় ব’লে
ভাব্নাটি তার মধুর থাকে
আকুল অশ্রুজলে।
জীবন অস্ত যায় চলি, তাই
রঙটি থাকে লেগে,
প্রিয়জনের মনের কোণে
শরৎ-সন্ধ্যা-মেঘে।
থাকব না ভাই, থাকব না কেউ–
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে যাও রে ধেয়ে
কালের পিছু পিছু।
ফুল তুলি তাই তাড়াতাড়ি
পাছে ঝ’রেই পড়ে।
সুখ নিয়ে তাই কাড়াকাড়ি,
পাছে যায় সে স’রে।
রক্ত নাচে দ্রুতচ্ছন্দে,
চক্ষে তড়িৎ ভায়,
চুম্বনেরে কেড়ে নিতে
অধর ধেয়ে যায়।
সমস্ত প্রাণ জাগে রে তাই,
বক্ষ-দোলায় দোলে
বাসনাতে ঢেউ উঠে যায়
মত্ত আকুল রোলে।
থাকব না ভাই, থাকব না কেউ
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে চল্ রে ছুটে
কালের পিছু পিছু।
কোনো জিনিস চিনব যে রে,
প্রথম থেকে শেষ,
নেব যে সব বুঝে প’ড়ে–
নাই সে সময় লেশ।
জগৎটা যে জীর্ণ মায়া
সেটা জানার আগে
সকল স্বপ্ন কুড়িয়ে নিয়ে
জীবন-রাত্রি ভাগে।
ছুটি আছে শুধু দু দিন
ভালোবাসবার মতো–
কাজের জন্যে জীবন হলে
দীর্ঘজীবন হত।
থাকব না ভাই, থাকব না কেউ–
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে চল্ রে ছুটে
কালের পিছু পিছু।
আজ তোমাদের যেমন জানছি
তেমনি জানতে জানতে
ফুরায় যেন সকল জানা–
যাই জীবনের প্রান্তে।
এই যে নেশা লাগল চোখে
এইটুকু যেই ছোটে
অমনি যেন সময় আমার
বাকি না রয় মোটে।
জ্ঞানের চক্ষু স্বর্গে গিয়ে
যায় যদি যাক খুলি,
মর্তে যেন না ভেঙে যায়
মিথ্যে মায়াগুলি।
থাকব না ভাই, থাকব না কেউ
থাকবে না ভাই কিছু।
সেই আনন্দে চল্ রে ধেয়ে
কালের পিছু পিছু।
শেষ Romanized Version
Thakbo na bhai, thakbo na keu–
Thakbe na bhai kichhu.
Sei anonde jao re chole
Kaler pichhu pichhu.
Odhik din to boite hoy na
Shudhu ekti pran.
Ononto kal eki kobi
Gay na eki gan.
Mala bote shukiye more–
Je jon mala pore
Seo to noy omor, tobe
Duhkho kiser tore?
Thakbo na bhai, thakbo na keu–
Thakbe na bhai kichhu.
Sei anonde jao re chole
Kaler pichhu pichhu.
Sobi hethay ekta kothao
Korte hoy re shesh,
Gan thamile tai to kane
Thake ganer resh.
Katol bela sadher khela
Somapto hoy bole
Bhabnati tar modhur thake
Akul oshrujole.
Jibon oshto jay choli, tai
Rongti thake lege,
Priyojoner moner kone
Shorot-shondha-meghe.
Thakbo na bhai, thakbo na keu–
Thakbe na bhai kichhu.
Sei anonde jao re dheye
Kaler pichhu pichhu.
Ful tuli tai taratari
Pashe jhorei pore.
Sukh niye tai karakari,
Pashe jay se shore.
Rokto nache drutochchonde,
Chokhe torit bhay,
Chumbonere kere nite
Odhor dheye jay.
Somosto pran jage re tai,
Bokkho-dolay dole
Bashonate dheu uthe jay
Motto akul role.
Thakbo na bhai, thakbo na keu
Thakbe na bhai kichhu.
Sei anonde chol re chhute
Kaler pichhu pichhu.
Kono jinish chinbo je re,
Prothom theke shesh,
Nebo je sob buje pore–
Nai se somoy lesh.
JogotTa je jirno maya
Sheta janar age
Shokol shopno kuriye niye
Jibon-ratri bhage.
Chhuti আছে shudhu du din
Bhalobasbar moto–
Kajer jonno jibon hole
Dirghojibon hoto.
Thakbo na bhai, thakbo na keu–
Thakbe na bhai kichhu.
Sei anonde chol re chhute
Kaler pichhu pichhu.
Aj tomader jemon janchi
Temni jante jante
Furay jono shokol jana–
Zai jiboner pronte.
Ei je nesha laglo chokhe
Eituku jei chhote
Omoni jono somoy amar
Baki na roy mote.
Gnaner chokkhu sworge giye
Jay jodi jak khuli,
Morte jono na bhenge jay
Mithye mayaguli.
Thakbo na bhai, thakbo na keu
Thakbe na bhai kichhu.
Sei anonde chol re dheye
Kaler pichhu pichhu.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- মৃত্যু বা শেষের অবধারিত সত্য: জীবন চিরস্থায়ী নয়, এই ধ্রুব সত্যকে মেনে নিয়েই কবি আনন্দচিত্তে সময়ের সাথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। কোনো কিছুই চিরকাল থাকে না—মালা শুকায়, জীবন ফুরায়, তাই এই নশ্বরতাকে সহজভাবে গ্রহণ করাই প্রজ্ঞা।
- শেষ হয়ে যাওয়ার মাঝেই সৌন্দর্যের স্থায়িত্ব:
“গান থামিলে তাই তো কানে থাকে গানের রেশ।”— কোনো কিছু ফুরিয়ে গেলে তার স্মৃতি বা রেশ দীর্ঘকাল মানুষের মনে মধুর হয়ে বেঁচে থাকে। জীবনের অস্তমিত বেলাতেও প্রিয়জনের মনে তার রঙের ছায়া বা শরৎ-সন্ধ্যা-মেঘের মতো সুকোমল আবেগ রয়ে যায়।
- ভালোবাসার ক্ষণস্থায়ী ছুটি:
“ছুটি আছে শুধু দু দিন ভালোবাসবার মতো–“— মানবজীবন এত দীর্ঘ নয় যে সব কিছু হিসাব করে কাটানো যায়। তাই ভালোবাসার জন্য, সুখ পাওয়ার জন্য এবং জীবনকে পরিপূর্ণভাবে অনুভব করার জন্য এই স্বল্প সময়টুকুই সবচেয়ে মূল্যবান।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

![ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 1 শেষ shesh [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/শেষ-shesh-কবিতা-1.gif)