বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মমগ্নতা ও অন্তর্মুখী বোধের এক গভীর লিরিক কবিতা হলো ‘অবশেষে’। বহির্জগতের প্রখর তাপে পার্থিব তুচ্ছ সামগ্রী সংগ্রহের নিষ্ফল তৃষ্ণা ত্যাগ করে নিজের নিভৃত অন্তরে ফিরে আসা এবং একান্ত নির্জনতায় স্মৃতির রত্নরাজিকে আপন বক্ষে ধারণ করার শান্ত আহ্বান এ কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য:
| বিষয়বিবরণ | তথ্য |
| কবিতার নাম | অবশেষে |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | মহুয়া (অনলাইন কিছু প্রতিলিপিতে ‘পুনশ্চ’ হিসেবে উল্লেখিত হলেও কবিতাটি মূলত অন্ত্যমিলযুক্ত ছন্দে রচিত এবং ‘মহুয়া’ কাব্যের অন্তর্ভুক্ত) |
| প্রকাশের বছর | ১৯২৯ (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | আত্মোপলব্ধিমূলক অন্তর্মুখী লিরিক (Reflective Lyric / Introspective Song-Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট:
১৯২৯ সালে প্রকাশিত ‘মহুয়া’ কাব্যগ্রন্থে কবি বারবার বাইরের উদ্বেল কর্মকোলাহল থেকে অন্তরের প্রশান্ত নিভৃতে ফিরে আসার তাগিদ অনুভব করেছেন। বিবাগী মন সংসারে বা সাগরতীরে ঘুরে ঘুরে কেবল নুড়ি আর শামুকের মতো ভঙ্গুর উপাদানই কুড়িয়েছে; লবণাক্ত সাগরের ধারে রোদে পুড়ে তার তৃষ্ণা কখনো মেটেনি। তাই কবি চঞ্চল মনকে পুনরায় নিজের পুরাতন ঘরের নির্জনতায় ফিরে আসার ডাক দেন। ঘরের পরিবেশ হয়তো নিঃসঙ্গ, প্রদীপহীন ও সাথিহীন হতে পারে, কিন্তু সেই অন্ধকারের কোণেও জমা হয়ে আছে আত্মিক ধ্যানের ধন ও অমূল্য স্মৃতি। বাইরের ব্যর্থতা ভুলে অন্তরের সেই মাধুর্যটুকুকে বক্ষে ধারণ করাই মানুষের পরম আশ্রয়।
সম্পূর্ণ কবিতা:
বাহির-পথে বিবাগী হিয়া
কিসের খোঁজে গেলি,
আয় রে ফিরে আয়।
পুরানো ঘরে দুয়ার দিয়া
ছেঁড়া আসন মেলি
বসিবি নিরালায়।
সারাটা বেলা সাগর-ধারে
কুড়ালি যত নুড়ি,
নানারঙের শামুক-ভারে
বোঝাই হল ঝুড়ি,
লবণ-পারাবারের পারে
প্রখর তাপে পুড়ি
মরিলি পিপাসায়;
ঢেউয়ের দোল তুলিল রোল
অকূলতল জুড়ি,
কহিল বাণী কী জানি কী ভাষায়।
আয় রে ফিরে আয়।
বিরাম হল আরামহীন
যদি রে তোর ঘরে,
না যদি রয় সাথি,
সন্ধ্যা যদি তন্দ্রালীন
মৌন অনাদরে,
না যদি জ্বালে বাতি;
তবু তো আছে আঁধার কোণে
ধ্যানের ধনগুলি,
একেলা বসি আপনমনে
মুছিবি তার ধূলি,
গাঁথিবি তারে রতনহারে
বুকেতে নিবি তুলি
মধুর বেদনায়।
কাননবীথি ফুলের রীতি
নাহয় গেছে ভুলি,
তারকা আছে গগন-কিনারায়।
আয় রে ফিরে আয়।
সম্পূর্ণ কবিতার Romanized Version:
Bahir-pothe bibagi hiya
Kisher khoje geli,
Ay re phire ay.
Purano ghore duyar diya
Chhenra ashon meli
Boshibi niralay.
Sarata bela sagor-dhare
Kurali joto nuri,
Nanaronger shamuk-bhare
Bojhai holo jhuri,
Lobon-parabarer pare
Prokhor tape puri
Morili pipasay;
Dheu-er dol tulilo rol
Okultol juri,
Kohilo bani ki jani ki bhashay.
Ay re phire ay.
Biram holo aramhin
Jodi re tor ghore,
Na jodi roy sathi,
Shondhya jodi tondralin
Mouno onadore,
Na jodi jwale bati;
Tobu to achhe andhar kone
Dhyaner dhonguli,
Ekela boshi aponmone
Muchhibi tar dhuli,
Ganthibi tare rotonhare
Bukete nibi tuli
Modhur bedonay.
Kanonbithi phuler riti
Nahoy gechhe bhuli,
Taroka achhe gogon-kinaray.
Ay re phire ay.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:
- বহির্জগতের অলীক অন্বেষণ ও ক্লান্তি:“সারাটা বেলা সাগর-ধারে / কুড়ালি যত নুড়ি, / নানারঙের শামুক-ভারে / বোঝাই হল ঝুড়ি, / লবণ-পারাবারের পারে / প্রখর তাপে পুড়ি / মরিলি পিপাসায়;”— সমুদ্রতীরে নুড়ি ও শামুক সংগ্রহের রূপকে কবি জাগতিক মোহ ও নশ্বর সম্পদ অর্জনের নিরর্থকতা ফুটিয়ে তুলেছেন। লোনা জলের কিনারায় রোদে পুড়ে কেবল পিপাসাই বাড়ে, কিন্তু আত্মার চিরন্তন তৃপ্তি মেলে না।
- অন্তরের নিভৃতে প্রত্যাবর্তন:“পুরানো ঘরে দুয়ার দিয়া / ছেঁড়া আসন মেলি / বসিবি নিরালায়।”— কোলাহলময় জগৎ থেকে দুয়ার বন্ধ করে নিজের চেনা আত্মিক আশ্রয়ে ফিরে আসাই শান্তি। জৌলুসহীন ছেঁড়া আসনেই গড়ে ওঠে গভীর চিন্তার শান্ত পরিবেশ।
- নিঃসঙ্গতা ও ধ্যানের অমূল্য ধন:“তবু তো আছে আঁধার কোণে / ধ্যানের ধনগুলি, / একেলা বসি আপনমনে / মুছিবি তার ধূলি, / গাঁথিবি তারে রতনহারে / বুকেতে নিবি তুলি / মধুর বেদনায়।”— ঘরে সাথি না থাকলেও বা প্রদীপ না জ্বললেও অন্তরের নিভৃতে লুকিয়ে থাকে সাধনার সঞ্চয় ও স্মৃতিমালা। কাননের ফুল ঝরে গেলেও আকাশের কোণে ধ্রুবতারার মতো সত্য যেমন স্থির থাকে, তেমনি সেই অবিনাশী আত্মিক রত্নকে বুকে জড়িয়ে মানুষ তার সমস্ত ক্লান্তি মুছে ফেলতে পারে।
উৎস:
কবিতাটির মূল পাঠ, ছন্দবিন্যাস ও সংকলন-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (মহুয়া কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংকলন ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।