রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি (১৯১০)-র এটি একটি সুপরিচিত ও পরম আধ্যাত্মিক প্রণয়-সঙ্গীতধর্মী কবিতা (পরবর্তীকালে রবীন্দ্রসঙ্গীত হিসেবেও বহুল গীত)। এতে জীবাত্মা ও পরমাত্মার নিভৃত অভিসারের অনন্ত আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। পার্থিব কোলাহল ও সংসারের কর্মজাল ছিন্ন করে একাকী পরমসত্তার সাথে অসীম সমুদ্রের বুকে নিরুদ্দেশ যাত্রায় ভেসে যাওয়ার যে আদিম প্রতিশ্রুতি, তারই ব্যাকুল স্মরণ এ রচনার মূল সুর। দিনশেষে যখন সায়াহ্নের অন্ধকার নেমে আসে এবং পাখিরা নীড়ে ফেরে, তখন সাধক অপেক্ষা করে থাকে সেই ঘাটের কাণ্ডারির জন্য—যিনি এসে মর্ত্যের অন্তিম বন্ধনটুকু কেটে দিয়ে অনন্তের পথে তরী ভাসিয়ে দেবেন।
কথা ছিল-এক-তরীতে কেবল তুমি আমি পুরো কবিতা:
কথা ছিল-এক-তরীতে কেবল তুমি আমি
যাব অকারণে ভেসে কেবল ভেসে,
ত্রিভুবনে জানবে না কেউ আমরা তীর্থগামী
কোথায় যেতেছি কোন্ দেশে সে কোন্ দেশে।
কূলহারা সেই সমুদ্র-মাঝখানে
শোনাব গান একলা তোমার কানে,
ঢেউয়ের মতন ভাষা-বাঁধন-হারা
আমার সেই রাগিণী শুনবে নীরব হেসে।
আজো সময় হয় নি কি তার, কাজ কি আছে বাকি।
ওগো ওই-যে সন্ধ্যা নামে সাগরতীরে।
মলিন আলোয় পাখা মেলে সিন্ধুপারের পাখি
আপন কুলায়-মাঝে সবাই এল ফিরে।
কখন তুমি আসবে ঘাটের ‘পরে
বাঁধনটুকু কেটে দেবার তরে।
অস্তরবির শেষ আলোটির মতো
তরী নিশীথমাঝে যাবে নিরুদ্দেশে।
Kotha chhilo—ek-torite kebol tumi ami kobita Romanize Version
Kotha chhilo—ek-torite kebol tumi ami
Jabo akarone bhese kebol bhese,
Tribhuvone janbe na keu amra tirthagami
Kothay jetecchi kon deshe, se kon deshe.
Kul-hara sei samudra-majkhane
Shonabo gaan ekla tomar kane,
Dheu-er moton bhasha-bandhan-hara
Amar sei ragini shunbe nirob hese.
Ajo shomoy hoy ni ki tar, kaj ki achhe baki.
Ogo, oi-je shondhya name sagar-tire.
Molin aloy pakha mele sindhuparer pakhi
Apan kulay-majhe shobai el fire.
Kokhon tumi ashbe ghat-er ’pare
Bandhontuku kete debar tore.
Osto-rabir shesh aloti-r moto
Tori nishith-majhe jabe niruddeshe.
- নিভৃত অভিসার ও অহৈতুকী আনন্দ: এই যাত্রার কোনো নির্দিষ্ট বৈষয়িক লক্ষ্য নেই; এটি নিছক ভেসে চলা। যেখানে কোনো লোকচক্ষুর নজর থাকবে না, কেবল মহাসমুদ্রের বুকে পরমতমের কানে শোনানো হবে বাণীর বন্ধনহীন অন্তরের গান।
- সায়াহ্নের প্রতীক্ষা ও মুক্তির আর্তি: সংসারের কাজ শেষ হলেও কাঙ্ক্ষিত ডাক কেন আসছে না, সেই মধুর সংশয় ব্যক্ত হয়েছে। অস্তগামী সূর্যের শেষ আভার মতো তরীটিকে রাতের অসীমে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য কেবল প্রভুর করুণাঘন হাতের পরশটুকুর অপেক্ষা।