স্মরণ কাব্যগ্রন্থের মৃত্যুর নেপথ্য হতে আরবার এলে তুমি ফিরে কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর আবেগঘন, শোকসন্তপ্ত ও আধ্যাত্মিক প্রেমের কবিতা হলো ‘মৃত্যুর নেপথ্য হতে আরবার এলে তুমি ফিরে’। এই কবিতায় কবি মৃত্যুর ওপার থেকে প্রিয়জনের নিঃশব্দে অন্তরে ফিরে আসার এক পরম শান্ত ও অমর রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে লোকালয়ের কোলাহলহীন নিভৃত হৃদয়ে কেবল প্রীতি ও স্মৃতির মিলন ঘটে।

কবিতার মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
কবিতার নামমৃত্যুর নেপথ্য হতে আরবার এলে তুমি ফিরে
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থস্মরণ
প্রকাশের বছর১৮৯৭ (১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী সংস্করণেও বিশেষ গুরুত্ব পায়)
কবিতার ধরনশোকগাথা ও আধ্যাত্মিক লিরিক কবিতা (Elegy and Spiritual Lyrical Poem)

কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যক্তিগত জীবনের গভীর শোক ও বেদনার এক অমর সৃষ্টি। প্রিয়জনের প্রয়াণের পর শোককে কীভাবে ভালোবাসার এবং আত্মিক মিলনের আলোয় রূপান্তর করা যায়, এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে তার এক সুগভীর প্রকাশ ঘটেছে। ‘মৃত্যুর নেপথ্য হতে আরবার এলে তুমি ফিরে’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে মৃত্যুর সিংহদ্বার পেরিয়ে প্রিয়া যেন নতুন বধূর সাজে হৃদয়ের বিবাহমন্দিরে এসে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে কোনো জনতা বা উৎসবের কোলাহল নেই, আছে কেবল নীরব অশ্রু এবং অন্তরের প্রদীপের আলোয় গড়া মিলনের গান।

মৃত্যুর নেপথ্য হতে আরবার এলে তুমি ফিরে – সম্পূর্ণ কবিতা

মৃত্যুর নেপথ্য হতে আরবার এলে তুমি ফিরে
নূতন বধূর সাজে হৃদয়ের বিবাহমন্দিরে
নিঃশব্দ চরণপাতে। ক্লান্ত জীবনের যত গ্লানি
ঘুচেছে মরণস্নানে। অপরূপ নব রূপখানি
লভিয়াছ এ বিশ্বের লক্ষ্মীর অক্ষয় কৃপা হতে।
স্মিতস্নিগ্ধমুগ্ধমুখে এ চিত্তের নিভৃত আলোতে
নির্বাক দাঁড়ালে আসি। মরণের সিংহদ্বার দিয়া
সংসার হইতে তুমি অন্তরে পশিলে আসি, প্রিয়া।
আজি বাজে নাই বাদ্য, ঘটে নাই জনতা-উৎসব,
জ্বলে নাই দীপমালা আজিকার আনন্দগৌরব
প্রশান্ত গভীর স্তব্ধ বাক্যহারা অশ্রুনিমগন,
আজিকার এই বার্তা জানে নি, শোনে নি কোনো জন।
আমার অন্তর শুধু জ্বেলেছে প্রদীপ একখানি–
আমার সংগীত শুধু একা গাঁথে মিলনের বাণী।

মৃত্যুর নেপথ্য হতে আরবার এলে তুমি ফিরে Romanized Version

Mrityur nepothyo hote arbar ele tumi phire
Nuton bodhur shaje hridoyer bibaho-mondire
Nishobdo choronpate. Klanto jiboner joto glani
Ghucheche moron-snane. Oporup nobo rupkhani
Lobhiyachhe e bishwer lokkhmir okkhoy kripa hote.
Shmit-snigdho-mugdhomukhe e chitter nibhrito alote
Nirobok darale ashi. Moroner singhodwar diya
Shongshar hote tumi ontore poshile ashi, priye.
Aji baje nai badyo, ghote nai jonota-utsheb,
Jwale nai dipmala ajikar anondo-goroub
Proshanto gobhir stobdho bakyahara oshru-nimogon,
Ajikar ei barta jane ni, shone ni kono jon.
Amar ontor shudhu jeleche prodip ekhani–
Amar shongit shudhu eka ganthe miloner bani.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ

  • মরণের ওপার থেকে ফিরে আসা:
“মৃত্যুর নেপথ্য হতে আরবার এলে তুমি ফিরে / নূতন বধূর সাজে হৃদয়ের বিবাহমন্দিরে / নিঃশব্দ চরণপাতে।”
— মৃত্যুর সীমানা পেরিয়ে প্রিয়া যেন নতুন বধূর মতো নিঃশব্দ চরণে কবির অন্তরের মন্দিরে ফিরে আসেন। জীবনের সমস্ত গ্লানি মরণস্নানে ধুয়ে মুছে গেছে।
  • বাহ্যিক উৎসবহীন নিভৃত মিলন:
“আজি বাজে নাই বাদ্য, ঘটে নাই জনতা-উৎসব, / জ্বলে নাই দীপমালা আজিকার আনন্দগৌরব / প্রশান্ত গভীর স্তব্ধ বাক্যহারা অশ্রুনিমগন…”
— সাধারণ পার্থিব বিবাহের মতো এখানে কোনো ঢাক-ঢোল, বাদ্য বা জনতা-উৎসব নেই। এই মিলন সম্পূর্ণ নিঃশব্দ, গভীর, স্তব্ধ এবং অশ্রুনিমগ্ন।
  • অন্তর প্রদীপের আলোয় মিলনের বাণী:
“আমার অন্তর শুধু জ্বেলেছে প্রদীপ একখানি– / আমার সংগীত শুধু একা গাঁথে মিলনের বাণী।”
— বাইরের পৃথিবী এই মিলনের কোনো বার্তা জানে না। কবির একা অন্তর কেবল একটি প্রদীপ জ্বেলে রাখে এবং তাঁর সংগীত নিঃশব্দে সেই চিরন্তন মিলনের বাণী রচনা করে চলে।

উৎস

কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন