বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম গভীর দার্শনিক, আধ্যাত্মিক ও প্রকৃতি-সংলগ্ন লিরিক কবিতা হলো ‘যে ভাবে রমণীরূপে আপন মাধুরী’। এই কবিতায় কবি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পরম সুন্দরের লীলা এবং সৃষ্টির দ্বৈত সত্তার মাঝে নারীর রূপ ও মাধুর্যের এক অপূর্ব ঐকতান খুঁজে পেয়েছেন, যেখানে পার্থিব প্রেম ও মহাজাগতিক রহস্য একে অপরের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | যে ভাবে রমণীরূপে আপন মাধুরী |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | স্মরণ |
| প্রকাশের বছর | ১৮৯৭ (রবীন্দ্র শতবার্ষিকী বা বিশেষ সংকলন সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত) |
| কবিতার ধরন | দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমের লিরিক কবিতা (Philosophical and Spiritual Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের এক গভীর শোক, স্মৃতি ও আত্মিক অনুভবের সোনালী ফসল। ব্যক্তিগত বেদনার পটভূমিতে রচিত এই কাব্যের কবিতগুলোতে পার্থিব রূপের অন্তরালে এক পরম সত্য ও ঐশ্বরিক সত্তার প্রকাশ ঘটেছে। ‘যে ভাবে রমণীরূপে আপন মাধুরী’ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন যে বিশ্বপ্রকৃতির সমস্ত সৃষ্টি—লতার ফুল, নদীর লহরী, মেঘের বৃষ্টি কিংবা তটিনীর স্তন্যদান—সবকিছুর মূলেই রয়েছে সেই পরম সত্তার আনন্দময় খেলা। আর ঠিক একই ভাবে, এক নারীর রমণীরূপের মাঝে সেই বিশ্বপতির মাধুরী মূর্ত হয়ে ওঠে।
যে ভাবে রমণীরূপে আপন মাধুরী – সম্পূর্ণ কবিতা
যে ভাবে রমণীরূপে আপন মাধুরী
আপনি বিশ্বের নাথ করিছেন চুরি
যে ভাবে সুন্দর তিনি সর্ব চরাচরে,
যে ভাবে আনন্দ তাঁর প্রেমে খেলা করে,
যে ভাবে লতার ফুল, নদীতে লহরী,
যে ভাবে বিরাজে লক্ষ্মী বিশ্বের ঈশ্বরী,
যে ভাবে নবীন মেঘ বৃষ্টি করে দান,
তটিনী ধরারে স্তন্য করাইছে পান,
যে ভাবে পরম-এক আনন্দে উৎসুক
আপনারে দুই করি লভিছেন সুখ,
দুইয়ের মিলনাঘাতে বিচিত্র বেদনা
নিত্য বর্ণ গন্ধ গীত করিছে রচনা,
হে রমণী, ক্ষণকাল আসি মোর পাশে
চিত্ত ভরি দিলে সেই রহস্য আভাসে।
যে ভাবে রমণীরূপে আপন মাধুরী Romanized Version
Je bhabe romonirupe apon madhuri
Apni bishwer nath korichhen churi
Je bhabe shundor tini shorbo chorochore,
Je bhabe anondo tar preme khela kore,
Je bhabe lotar ful, nodite lohori,
Je bhabe biraje lokkhi bishwer ishworí,
Je bhabe nobin megh brishti kore dan,
Totini dhorare stonyo korachhe pan,
Je bhabe porom-ek anonde utshuk
Apnare dui kori lobhichen shukh,
Duer milno-aghate bichitro bedona
Nityo borno gondho git korichhe rochona,
He romoni, khonkal ashi mor pashe
Chitto vori dile shei rohoshyo abhase.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- বিশ্বের নাথের লীলা ও নারীরূপ:
“যে ভাবে রমণীরূপে আপন মাধুরী / আপনি বিশ্বের নাথ করিছেন চুরি”— বিশ্বপ্রকৃতির স্রষ্টা বা বিশ্বের নাথ যেন নিজেরই মাধুরী চুরি করে নারীর রূপ ধারণ করেছেন। নারীর সৌন্দর্যের মাঝে সেই ঐশ্বরিক মাধুর্যের প্রতিফলন ঘটে।
প্রকৃতি ও সৃষ্টির ঐক্য:
“যে ভাবে লতার ফুল, নদীতে লহরী, / যে ভাবে বিরাজে লক্ষ্মী বিশ্বের ঈশ্বরী, / যে ভাবে নবীন মেঘ বৃষ্টি করে দান, / তটিনী ধরারে স্তন্য করাইছে পান…”— লতার ফুল, নদীর ঢেউ, মেঘের বৃষ্টি এবং তটিনীর ধরিত্রীকে স্তন্যদান—এসবের মাঝে যে মাতৃত্ব ও সৃষ্টির উদারতা রয়েছে, তা মূলত সেই পরম এক ঈশ্বরেরই আনন্দ-উৎসের বহিঃপ্রকাশ।
- দ্বৈত সত্তার আনন্দ ও মিলন:
“যে ভাবে পরম-এক আনন্দে উৎসুক / আপনারে দুই করি লভিছেন সুখ, / দুইয়ের মিলনাঘাতে বিচিত্র বেদনা / নিত্য বর্ণ গন্ধ গীত করিছে রচনা…”— পরম সত্তা বা অদ্বৈত একাকী আনন্দ উপভোগ করার জন্য নিজেকে দুই ভাগে (দ্বৈতবাদে) বিভক্ত করে আনন্দ লাভ করেন। এই দুইয়ের মিলনাঘাত বা আকর্ষণের ফলেই পৃথিবীতে জন্ম নেয় বিচিত্র বর্ণ, গন্ধ ও সঙ্গীতের রচনা।
- রহস্যময় সান্নিধ্য: কবিতার শেষাংশে কবি সরাসরি সেই রমণীর উদ্দেশ্যে বলেন যে, তিনি ক্ষণকালের জন্য কবির পাশে এসে নিজের উপস্থিতির মাধ্যমে কবির চিত্তকে সেই মহাজাগতিক ও পরম রহস্যের আবাসে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (স্মরণ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।