বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থের একটি অন্যতম রোমান্টিক, প্রেমমূলক ও মনস্তাত্ত্বিক লিরিক কবিতা হলো ‘আপনারে তুমি করিবে গোপন’। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় প্রিয়ার কৌতুকপূর্ণ ছদ্মবেশ, মান-অভিমান এবং তাঁর ছলনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত প্রেমের স্বরূপ উদ্ঘাটনের এক চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ফুটে উঠেছে।
Table of Contents
কবিতার মূল তথ্য
| বিষয় | বিবরণ |
| কবিতার নাম | আপনারে তুমি করিবে গোপন |
| কবির নাম | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| মূল কাব্যগ্রন্থ | উৎসর্গ |
| প্রকাশের বছর | ১৯১৪ (১৩২১ বঙ্গাব্দ) |
| কবিতার ধরন | রোমান্টিক ও মনস্তাত্ত্বিক লিরিক কবিতা (Romantic and Psychological Lyrical Poem) |
কবি পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থটি তাঁর কাব্যজীবনের একটি বিশেষ পর্যায়, যেখানে প্রেম, প্রকৃতি ও আত্মজিজ্ঞাসার এক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই পর্বের কবিতায় প্রেমের বিচিত্র রূপ, মান-অভিমান এবং বিরহের পাশাপাশি প্রেমের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ‘আপনারে তুমি করিবে গোপন’ কবিতায় কবি তাঁর প্রিয়ার কৌতুকপূর্ণ রূপের বর্ণনা দিয়েছেন, যেখানে প্রিয়া নিজেকে লুকাতে চাইলেও তার ভেতরের প্রেম চোখের পাতায় ঠিকরে পড়ে। কবি প্রিয়ার এই ছলনা বুঝতে পারেন এবং হাসিমুখে তাঁর এই কৌতুক গ্রহণ করেন।
আপনারে তুমি করিবে গোপন – সম্পূর্ণ কবিতা
আপনারে তুমি করিবে গোপন
কী করি।
হৃদয় তোমার আঁখির পাতায়
থেকে থেকে পড়ে ঠিকরি।
আজ আসিয়াছ কৌতুকবেশে,
মানিকের হার পরি এলোকেশে,
নয়নের কোণে আধো হাসি হেসে
এসেছ হৃদয়পুলিনে।
ভুলি নে তোমার বাঁকা কটাক্ষে,
ভুলি নে চতুর নিঠুর বাক্যে
ভুলি নে।
করপল্লবে দিলে যে আঘাত
করিব কি তাহে আঁখিজলপাত।
এমন অবোধ নহি গো।
হাসো তুমি, আমি হাসিমুখে সব
সহি গো।
আজ এই বেশে এসেছ আমায়
ভুলাতে।
কভু কি আস নি দীপ্ত ললাটে
স্নিগ্ধ পরশ বুলাতে।
দেখেছি তোমার মুখ কথাহারা–
জলে-ছলছল ম্লান আঁখিতারা,
দেখেছি তোমার ভয়-ভরে সারা
করুণ পেলব মুরতি।
দেখেছি তোমার বেদনাবিধুর
পলকবিহীন নয়নে মধুর
মিনতি।
আজি হাসিমাখা নিপুণ শাসনে
তরাস আমি যে পাব মনে মনে
এমন অবোধ নহি গো
হাসো তুমি, আমি হাসিমুখে সব
সহি গো।
Romanized Version
Aponare tumi koribe gopon
Ki kori.
Hridoy tomar ankhir patay
Theke theke pore thikri.
Aj ashiyachho koutukobeshe,
Maniker har pori elokeshe,
Noyoner kone adho hashi heshe
Eshechho hridoypuline.
Bhuli ne tomar banka kotakkhe,
Bhuli ne chotur nithur bakye
Bhuli ne.
Koropollobe dile je aghat
Koribo ki tahe ankhijolopat.
Emon obodh nohi go.
Hasho tumi, ami hashimukhe shob
Sohi go.
Aj ei beshe eshechho amay
Bhulate.
Kobhu ki asho ni dipto lolate
Snigdho porosh bulate.
Dekhechhi tomar mukh kothahara–
Jole-chholchhol mlan ankhitara,
Dekhechhi tomar bhoy-bhore shara
Korun pelob muroti.
Dekhechhi tomar bedonabidhur
Polokbihin noyone modhur
Minoti.
Aji hashimakha nipun shashone
Torash ami je pabo mone mone
Emon obodh nohi go
Hasho tumi, ami hashimukhe shob
Sohi go.
কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ
- প্রিয়ার কৌতুক ও ছলনা:
“আজ আসিয়াছ কৌতুকবেশে, / মানিকের হার পরি এলোকেশে, / নয়নের কোণে আধো হাসি হেসে / এসেছ হৃদয়পুলিনে।”— প্রিয়া আজ নিজেকে সাজিয়েছেন মানিকের হারে আর এলোকেশে। তাঁর চোখেমুখে আধো হাসি আর কৌতুকের ছদ্মবেশ। কবি বুঝতে পারছেন যে এটি তাঁর প্রকৃত রূপ নয়, বরং নিজের আবেগ গোপন করার এক নিপুণ ছলনা মাত্র।
- প্রেমিকের উপলব্ধির গভীরতা:
“করপল্লবে দিলে যে আঘাত / করিব কি তাহে আঁখিজলপাত। / এমন অবোধ নহি গো।”— প্রিয়ার নিঠুর বাক্য বা কৌতুকপূর্ণ আঘাতে কবি কষ্ট পেয়ে চোখের জল ফেলবেন না। তিনি এতটা অবোধ নন যে প্রিয়ার এই ছলনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীর প্রেমটুকু বুঝতে পারবেন না।
- অতীতের স্নিগ্ধ রূপের স্মৃতি:
“দেখেছি তোমার মুখ কথাহারা– / জলে-ছলছল ম্লান আঁখিতারা, / দেখেছি তোমার ভয়-ভরে সারা / করুণ পেলব মুরতি।”— কবি মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে তিনি প্রিয়ার সেই রূপও দেখেছেন যখন তিনি ভয়ে করুণ, চোখে জল আর মিনতি নিয়ে কবির কাছে এসেছেন। তাই আজকের এই হাসিমাখা শাসনে কবি ভয় না পেয়ে বরং হাসিমুখেই সব মেনে নিচ্ছেন।
উৎস
কবিতাটির মূল পাঠ, বানানরীতি এবং ঐতিহাসিক তথ্যাবলি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগৃহীত ও যাচাই করা হয়েছে।