আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়

আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায় : বীন্দ্রনাথের সমতূল্য প্রতিভা বিশ্বে একান্তই বিরল। সাহিত্য সংস্কৃতির সর্ববিধ রধারায় বিশ্ব মাপের স্বাক্ষর এমন করে এঁকে দিতে দ্বিতীয় কেউ পারেন নি এই দাবি করলে নিছক ভারতীয়তার দায়ে পড়তে হবে না, কারণ এ সত্য।

আমার রবীন্দ্রনাথ - অনুনয় চট্টোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়

[ আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়, এক ]

সৃষ্টির অজস্র স্রোতবাহী উৎসারণের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্ত বিষয়ে সর্বদাই সচেতন মহান দার্শনিক ও চিন্তাবিদ রবীন্দ্রনাথ পরাধীন ভারতে গ্রাম সংগঠনের মতো কষ্টসাধ্য ও অনির্ণীত কাজের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছিলেন। গ্রামোন্নয়নের পরিকল্পনা ও বাস্তব ক্ষেত্রে সংগঠনে তিনিই ভারতে পৃথিকৃৎ। তাঁর পল্লী উন্নয়ন সংগঠনে সাফল্য যেমনই হোক স্বাধীন ভারতে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় তা উপেক্ষিত নয়।

গান্ধিজির ভাবনা চিন্তায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের মিল, অমিল দুইই পাওয়া যাবে। রবীন্দ্রনাথের ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধটি রচিত হয়েছিল ১৯০৪ সালে, ঐতিহাসিক স্বদেশী আন্দোলন সূচনার এক বছর আগে এবং গান্ধিজির ‘হিন্দ স্বরাজ’ গ্রন্থের চার বছর আগে। নাগরিক কবি যখন ঊনত্রিশ বছর বয়সে পারিবারিক জমিদারির দায়িত্ব পালনে অবিভক্ত বাংলার নদিয়া, পাবনা, রাজসাহী জেলায় পা দিলেন তখনই তাঁর নতুন জন্ম হল।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পল্লী বাংলার কঠোর কঠিন বাস্তবতা তাঁকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলল। এই প্রথম তিনি দেশকে আবিষ্কার করলেন, কবি হৃদয়ে সে এক উথাল পাথাল ঢেউ, একী হতশ্রী তাঁর দেশ। এত দরিদ্র্য, এত কষ্ট মানুষের।

পল্লী বাংলার শোষণ যন্ত্রণার চিত্র রবীন্দ্রনাথের আগে যে লেখা হয়নি তা নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে বঙ্কিমচন্দ্র কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের তীব্রনিন্দা করে লিখেছেন :

“পাঁচ-সাতজন টাকার গাদায় গড়াগড়ি দিবে, আর ছয় কোটি লোক অন্নাভাবে মারা যাইবে, ইহা অপেক্ষা অন্যায় আর কিছু কি সংসারে আছে? সেই জন্যই কর্ণওয়ালিশের বন্দোবস্ত অতিশয় দৃষ্য। প্রজাওয়ারি বন্দোবস্ত হইলে, এই দুই চারিজন অতিধনবান ব্যক্তির পরিবর্তে আমরা ছয় কোটি সুখী প্রজা দেখিতাম। দেশশুদ্ধ অম্লের কাঙাল, আর পাঁচ-সাতজন টাকা খরচ করিয়া ফুরাইতে পারে না, সে ভালো, না সকলেই সুখ স্বাচ্ছন্দে আছে, কাহারও নিষ্প্রয়োজনীয় ধন নাই, সে ভালো? দ্বিতীয় অবস্থা যে প্রথমোক্ত অবস্থা হইতে শতগুণে ভালো, তাহা বুদ্ধিমানেরা অস্বীকার করিবেন না।”

‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় ‘পল্লীগ্রামস্থ প্রজাদের দুরবস্থা বর্ণনা’ শিরোনামের প্রবন্ধে বলা হয়েছে :

“যে রক্ষক সেই ভক্ষক’ এই প্রবাদ বুঝি বাঙলার ভূস্বামীদিগের ব্যবহার দৃষ্টেই সূচিত হইয়া থাকিবেক। ভূস্বামী স্বাধিকারে অধিষ্ঠান করিলে প্রজারা একদিনের নিমিত্ত নিশ্চিন্ত থাকিতে পারে না? কি জানি কখন কি উৎপত্তি ঘটে ইহা ভাবিয়া তাহারা সর্বদাই শঙ্কিত। তিনি কি কেবল নির্দিষ্ট রাজার কর সংগ্রহ করিয়া পরিতৃপ্ত হয়েন? তিনি ছলে বলে কৌশলে তাহাদিগের যথাসর্বস্ব হরণে একাগ্রচিত্তে প্রতিজ্ঞারূঢ় থাকেন।”

‘সুলভ সমাচার’ পত্রিকায় লেখা হয় :

“চাষিরা দিনরাত্রি পরিশ্রম করিয়া যেসকল ফল-শস্য প্রস্তুত করে তাহা লইয়া বড় মানুষ ভদ্রলোকে কত সুখ ভোগ করিয়া থাকেন। কিন্তু কি দুঃখের বিষয় যাহারা এত খেটে মল তাহাদের দুঃখ ঘোচে না।…তাহাদের নিজেদের পরিবার পুত্র কন্যাগণ খাইতে পরিতে পারে না। কৃষিকর্মে যাহা কিছু জন্মে তাহা জমিদার এবং মফস্বলের কর্মচারিগণ নানাপ্রকার দাবীদাওয়া করিয়া হাত করিয়া লয়েন।

…জলে ঝড়ে শীতে রৌদ্রে কত কষ্ট পেয়ে যাহা কিছু উপার্জন করিতেছে তাহা পাঁচ জনে লুটিয়া বড়লোকদের দৌরাত্ম্য ও অত্যাচারের ভয়ে সর্বদা কম্পমান। পুলিশ থানার আমলারাও অনিষ্ট করিতে পারিলে ছাড়ে না। দরিদ্রদের প্রতি গবর্নমেন্টের তত অনুরাগ নাই। প্রজারা না খেতে পেয়ে মরে গেলেও কেহ চেয়ে দেখে না। কিন্তু তাহাদের গায়ের রক্ত লইয়া সকলে বড় মানুষী করেন।” •

আমার রবীন্দ্রনাথ - অনুনয় চট্টোপাধ্যায়
আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়

১৮০২ থেকে ১৮৫৪ সালের মধ্যে বঙ্গদেশ তথা ভারতবর্ষে মোট ১৩ বার দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসেবে ৫০ লক্ষ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। ১৮৬০ থেকে ১৮৭৯ সালের মধ্যে ১৬টি দুর্ভিক্ষে ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ মারা যায়। উনিশ শতকের শেষ দশ বছরে ‘গড়ে প্রতি মিনিটে ৪ জন প্রতিঘণ্টায় ২৪০ জন এবং প্রতিদিনে ৫৭৬০ জনের অনাহারে মৃত্যু হইয়াছে।’

এই হতদ্দশার জন্য এদেশে যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারি শোষণ প্রধানত দায়ী এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। পারিবারিক ভাগ বাটোয়ারার পরে রবীন্দ্রনাথের ভাগে থাকে শিলাইদহ ও পতিসর। জামিদারি নিঃসন্দেহে তাঁর পরিবারের ভরণপোষণের উপায় কিন্তু তিনি কখনও এই ব্যবস্থা সম্পর্কে খুশি ছিলেন না। তিনি স্বীকার করেছেন, ‘জমিদার জমির জোঁক, সে প্যারাসাইট, পরাশ্রিত জীব।’ তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘আমার জন্মগত পেশা জমিদারি। কিন্তু আমার স্বভাবগত পেশা আসমানদারী।” কিংবা “জমিদারির জমি আঁকড়ে থাকতে অন্তরের প্রবৃত্তি নেই।” ব্রিটিশের ভয়াবহ শোষণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :

“ভারতের যে ধনে বিদেশী বণিক বা রাজপুরুষেরা ধনী তার ন্যূনতম উচ্ছিষ্টমাত্রই ভারতের ভাগে পড়ে। পাটের চাষির শিক্ষার স্বাস্থ্যের সুগভীর অভাবগুলো অনাবৃষ্টির নালা ডোবার মতো হাঁ করে রইল, বিদেশগামী মুনাফা থেকে তাঁর দিকে কিছুই ফিরল না। যা গেল তা নিঃশেষে গেল…অতীতকালের ভারতবর্ষের কী পরিমাণ ধন বৃটিশ দ্বীপে চালান গিয়েছে এবং বর্তমানে কী পরিমাণ অর্থ বর্ষে বর্ষে নানা প্রণালী দিয়ে সেই দিকে যাচ্ছে তার অঙ্ক সংখ্যা নিয়ে তর্ক করতে চাইনে। কিন্তু অতি স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি, এবং অনেক ইংরেজ লেখকও তা স্বীকার করেন। যে, আমাদের দেশে রক্তহীন দেহ মন চাপা পড়ে গেছে। জীবনে আনন্দ নেই, আমরা অন্তরে বাহিরে মরছি।”

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৮৯০ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত বিশেষ করে জমিদার রবীন্দ্রনাথকে দেখা গেল পল্লী উন্নয়নের সংগঠক এক মানুষ। ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য জমিদারদের মতো তিনি absentee land lord ছিলেন না, নিবিড়ভাবে মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছিলেন। গ্রামের বিশেষ করে কৃষক সমাজের ভালোবাসা যেমন তিনি পেয়েছিলেন তাদের প্রতি তাঁর কর্তব্যও তিনি সাধ্যমত সম্পাদন করেছিলেন, যা সে সময়ের আর কোনও জমিদারের মধ্যে লক্ষ করা যায় না। চাষির শ্রম ও দানে যে জমিদারের বাঁচামরা তাঁর মতো করে আর কোন জমিদার স্বীকার করেছেন? তাঁর কথনে এমনই একটি স্বীকৃতি :

“একটা ঘটনা আমার খুব মনে পড়ে। একবার মাঠের মাঝখান দিয়ে পাল্কীতে চলেছি, দুপুরের প্রচণ্ড রোদে চাষিরা ক্ষেতে কাজ করছে। পাল্কীতে বসে বসে বোধ হয় ‘ক্ষণিকা’র কবিতা লিখছি – একটা লোক মাঠের মাঝখানে কাজ করছিল, হঠাৎ হই হই করে ছুটে এসে পাল্কী থামাল। আমি বললুম, কী চাস? সে বললে, একটু দাঁড়া। দাঁড়াব কী, আমার গাড়ির সময় হয়ে যাবে যে, সে কি শোনে?

বলে একটুখানি দাঁড়া না। রইলুম পাল্কী থামিয়ে, সে ক্ষেত্রে মধ্যে আঁকাবাঁকা আলের পথ ধরে দৌড়ে চলে গেল। একটু পরে ফিরে এসে একটা টাকা আমার পায়ের কাছে রাখলে। আমি বললুম, এর কি প্রয়োজন ছিল? কেন শুধু শুধু এজন্য আমায় দাঁড় করালি? সে বলে–দেব না, আমরা না দিলে তোরা খাবি কি? আমার ভারী মিষ্টি লাগল তার এমন সহজ করে সত্যি কথা বলা। তাই মনে আছে আজ পর্যন্ত, — আমরা না দিলে তোরা খাবি কি?”

আবার জমিদার হিসেবে তাঁদের যে কর্তব্য সে সম্পর্কেও চমৎকারভাবে বলেছেন জামাতা নগেন্দ্রনাথকে লেখা এক পত্রে :

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“তোমরা দুর্ভিক্ষ পীড়িত প্রজার অন্নগ্রাস কিছু পরিমাণও যদি বাঁচিয়ে দিতে পার তাহলে এই ক্ষতিপূরণ হয়ে মনে সান্ত্বনা পাব। মনে রেখো জমিদারের টাকা চাষির টাকা এবং এই চাষিরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যয়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে এবং না খেয়ে বহন করছে। এদের এই ঋণ সম্পূর্ণ শোধ করার দায় তোমাদের উপর রইল। নিজেদের সাংসারিক উন্নতির চেয়েও এইটাই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে। অনাহার থেকে দেশের লোককে যথাসম্ভব বাঁচানোই তোমাদের জীবনের ব্রত হবে। এতে তোমাদের নিজেদের যদি ক্ষতি হয় তাও স্বীকার করতে হবে।”

পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও জামাতা নগেন্দ্রনাথকে তিনি কৃষি বিজ্ঞানে শিক্ষিত করে পল্লী উন্নয়নকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন উপরের চিঠিটি তারই সাক্ষ্য।

পল্লী বাংলার সমস্যা যে কত গভীর তাঁর একটি বক্তৃতায় তা সুস্পষ্ট :

“মুখে আমরা যাই বলি, দেশ বলতে আমরা যা বুঝি সে হচ্ছে ভদ্রলোকের দেশ। জনসাধারণকে আমরা বলি ছোটলোক। এই সংজ্ঞাটা বহুকাল থেকে আমাদের অস্থিমজ্জায় প্রবেশ করেছে।…তারা ভদ্রলোকের ছায়াচর, তাদের প্রকাশ অনুজ্জ্বল। অথচ দেশের অধিকাংশই তারা। সুতরাং দেশের অন্তত বারো আনা অনালোকিত।…

দেশের যে অতি ক্ষুদ্র অংশে বুদ্ধি, বিদ্যা, ধন, মান সেই শতকরা পাঁচ পরিমাণ লোকের সঙ্গে পঁচানব্বই পরিমাণ লোকের ব্যবধান মহাসমুদ্রের ব্যবধানের চেয়ে। বেশি। আমরা এক দেশে আছি, অথচ আমাদের এক দেশ নয়। যখন দেশকে ‘মা’ বলে আমরা গলা ছেড়ে ডাকি তখন মুখে যাই বলি মনে মনে জানি, সে মা গুটিকয়েক আদুরে ছেলের মা। এই করেই কি আমরা বাঁচব? শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার পেয়েই আমাদের চরম পরিত্রাণ “

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গ্রাম সমাজের এমন সত্য-চিত্র সমকালের কোনও রাজনৈতিক নেতার মুখেও শোনা যায়নি, এমনকী গান্ধি-চিত্তরঞ্জনের মুখেও নয়। পরবর্তীকালে কমিউনিস্টদের মুখে গ্রাম সামাজের বা আর্থিক দিক দিয়ে নিম্নবর্গের মানুষের অবস্থা সম্পর্কে যে শ্রেণি বিশ্লেষণ পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথে তার পূর্বগামিতা করা যাবে। কবি অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা এক পত্রে তিনি মন্তব্য করছেন :

“মানুষের যে সভ্যতার রূপ আমাদের সামনে বর্তমান, সে সভ্যতা মানুষ খাদক। তার ঐশ্বর্য, তার আরাম, এমনকি তার সংস্কৃতি উপরে মাথা তোলে নিম্নতলস্থ মানুষের পিঠের ওপর চড়ে, এই নিয়মেই ইউরোপে শ্রেণিগত বিপ্লবের লক্ষণ প্রবল হয়ে উঠেছে…দুর্বলের প্রতি নির্মম সভ্যতার ভিত্তি বদল না হলে ধনীর ভোজের টেবিল থেকে উপেক্ষায় নিক্ষিপ্ত রুটির টুকরো নিয়ে আমরা বাঁচব না।”

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৯০৮ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মিলনীর পাবনা অধিবেশনের সভাপতিরূপে যুব সম্প্রদায়ের সামনে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ও বাংলার পল্লি উন্নয়নের জন্য বাস্তবিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে তাঁর ভাষণে স্বয়ং জমিদার হয়ে বাংলার জমিদারদের উদ্দেশ্যে আবেদন জানিয়ে বলেন :

“দেশের জমিদারগিদকে বলিতেছি, হতভাগ্য রায়তদিগকে পরের হাত এবং নিজের হাত হইতে রক্ষা করিবার উপযুক্ত শিক্ষিত, সুস্থ ও শক্তিশালী করিয়া না তুলিলে কোনও ভালো আইন বা অনুকূল রাজশক্তির দ্বারা ইহারা কদাচ রক্ষা পাইতে পারিবে না। ইহাদিগকে দেখিবামাত্র সকলেরই জিহ্বা লালায়িত হইবে। এমনি করিয়া দেশের অধিকাংশ লোককেই যদি জমিদার, মহাজন, পুলিস, কানুনগো, আদালতের মামলা, যে ইচ্ছা সেই অনায়াসেই সারিয়া যায় ও মারিতে পারে তবে দেশের লোককে মানুষ হইতে না শিখাইয়াই রাজা হইতে শিখাইব কি করিয়া?”

১৩২১ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ (১৯১৪ এপ্রিল) শ্রীনিকেতনের প্রতিষ্ঠা হল এবং • বৃহত্তর ক্ষেত্রে পাব না সম্মিলনে জমিদারদের প্রতি যে আবেদন জানিয়েছিলেন, নিজেই সে কাজের পথপ্রদর্শক হলেন।

[ আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়, দুই ]

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ দেশের অধিকাংশ সংখ্যক মানুষ অর্থাৎ চাষিদের তথা পল্লীর জনগণকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন না। ১৯৩০ সালে লিখিত এক প্রবন্ধে তিনি বলছেন :

“কেবলই ভাবছি আমাদের দেশজোড়া চাষিদের দুঃখের কথা। আমার যৌবনের আরম্ভকাল থেকেই বাংলাদেশের পল্লীগ্রামের সঙ্গে আমার নিকট-পরিচয় হয়েছে। তখন চাষিদের সঙ্গে আমার প্রত্যহ ছিল দেখা, শোনা—ওদের সব নালিশ উঠেছে আমার কানে। আমি জানি, ওদের মতো নিঃসহায় জীব অল্পই আছে। ওরা সমাজের যে তলায় তলিয়ে সেখানে জ্ঞানের আলো অল্পই পৌঁছয়, প্রাণের হাওয়া বয় না বললেই হয়। তখনকার দিনে দেশের পলিটিক্স নিয়ে যাঁরা আসর জমিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে একজনও ছিলেন না যাঁরা পল্লীবাসীকে এদেশের লোক বলে অনুভব করতেন।” ৯

রাজনীতি তার নিজের পথে চলুক, তিনি চেয়েছিলেন সার্বিক দেশ সেবায় সকলের আত্মনিয়োগ। শুধু ইংরেজ শাসকের মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেদের সাধ্যমতো পল্লী উন্নয়নে তাঁর অধিক মনোযোগ। তাঁর কথায়:

“…দেশের সেবার দ্বারা, ত্যাগের দ্বারা, নিজের দেশকে নিজে সত্যভাবে অধিকার করবার চেষ্টা সর্বাগ্রে করতে হবে।”

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার মিল-অমিল দুইই ছিল। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার (১৯২৯) পরেও কমিউনিস্টদের মতামত সম্পর্কে তাঁর অভিমত লক্ষ করা যায়নি, তবে তিনি যে ওয়াকিবহাল ছিলেন তা বোঝা গেল টিসোভিয়েত রাশিয়ায় গিয়ে দেশের অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্যে। কিন্তু এদেশের মূল রাজনৈতিক সংগঠন কংগ্রেসের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাঁর যে যথেষ্ট আস্থা ছিল না, তা তিনি অকপটে প্রকাশ করেছেন :

“আমরা কংগ্রেস করেছি, তীব্রভাষায় হৃদয়াবেগ প্রকাশ করেছি, কিন্তু যেসব অভাবের তাড়ানায় আমাদের দেহ রোগে জীর্ণ, উপবাসে শীর্ণ, কর্মে অপটু, আমাদের চিত্ত অন্ধসংস্কারে ভারাক্রান্ত, আমাদের সমাজ শতখণ্ডে খণ্ডিত, তাকে নিজের বুদ্ধি দ্বারা, বিদ্যার দ্বারা, সংঘবদ্ধ করার চেষ্টার দ্বারা দূর করার কোনও উদ্‌যোগ করিনি। কেবলই নিজেকে এবং অন্যকে এই বলেই ভোলাই যে, যেদিন স্বরাজ হাতে আসবে তার পরদিন থেকেই সমস্ত আপনিই ঠিক হয়ে যাবে। এমন করে কর্তব্যকে সুদূরে ঠেকিয়ে রাখা—অকর্মণ্যতার শূন্যগর্ভ কৈফিয়ত রচনা করা—নিরুৎসুক নিরুদ্যম দুর্বল চিত্তের পক্ষেই সম্ভব।”

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুতরাং এটা স্পষ্ট যে রবীন্দ্রনাথ পলিটিক্সের পাশাপাশি সমাজের কাছে কর্তব্যমন্যতা বা কর্মণ্যতা দাবি করেছেন। জাত ধর্মে বর্ণে শতধা বিভক্ত সমাজের মিলনক্ষেত্র সন্ধানের প্রয়াসে তিনি সকলকে সচেষ্ট হতে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর কথায় :

“প্রত্যেক জেলার ভদ্র শিক্ষিত সম্প্রদায় তাঁহাদের জেলার মেলাগুলিকে যদি নবভাবে সজীব করিয়া তুলতে পারেন, ইহার মধ্যে দেশের শিক্ষিতগণ যদি তাঁহাদের হৃদয় সঞ্চার করিয়া দেন, এই সকল জেলায় যদি তাঁহারা হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব স্থাপন করেন, কোনওরকম নিস্ফল পলিটিক্সের সংস্রব না রাখিয়া বিদ্যালয় পথ-ঘাট জলাশয় গোচর-জমি প্রভৃতি সম্বন্ধে জেলায় যে সমস্ত অভাব আছে তাহার প্রতিকারের পরামর্শ করেন, তবে তিনি অল্প কালের মধ্যে স্বদেশকে যথার্থই সচেষ্ট করিয়া তুলিতে পারিবেন।”

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ভারতবাসীর নিদারুণ দারিদ্র্য ও সীমাহীন দুরবস্থার জন্য যেমন ইংরেজ সরকারের শোষণ-নিষ্পেষণকে অভিযুক্ত করেছেন, তেমনি নিজেদের হতশ্রী অবস্থা নিরসনে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে অগ্রসর হওয়ার জন্য সচেষ্ট হতে শিক্ষা দিয়েছেন। দেশকে আত্মীয় করে না তুললে পরাশাসনকেও দূর করা যায় না। তিনি বলছেন :

“আমাদের নিজেদের দেশ যে নিজের হয়নি তার কারণ এ নয় যে, এদেশ বিদেশীর শাসনাধীনে। আসল কথা এই যে, যে দেশে দৈবক্রমে জন্মেছি মাত্র সেই দেশকে সেবার দ্বারা, ত্যাগের দ্বারা, বোঝার দ্বারা সম্পূর্ণ আত্মীয় করে তুলিনি— একে অধিকার করতে পারিনি। নিজের বুদ্ধি দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, শ্রম দিয়ে যাকে গড়ে তুলি তাকেই আমরা অধিকার করি; তারই পরে অন্যায় আমরা মরে গেলেও সত্য করতে পারিনে।” ১৩

আবার ১৯২৯ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ভারতবর্ষের গ্রামগুলির হীন অবস্থার জন্য ব্রিটিশ শাসনকে সরাসরি দায়ি করেছেন। তিনি লিখেছেন :

“গ্রামে গ্রামে তার যে সামাজিক স্বরাজ পরিব্যাপ্ত ছিল, রাজশাসন তাকে অধিকার করল। যখন থেকে এই অধিকার পাকা হয়ে উঠল তখন থেকে গ্রামে গ্রামে দিঘিতে গেল জল শুকিয়ে। জীর্ণ মন্দিরে, শূন্য অতিথিশালার উঠানে অশখ গাছ, জাল জালিয়াতি মিথ্যা মোকদ্দমাতে বাধা দেওয়ার কিছুই ছিল না, রোগে তাপে দৈন্যে অজ্ঞানে অধর্মে সমস্ত দেশ রসাতলে তলিয়ে গেল।”

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সুতরাং এই দরিদ্র পল্লীসমাজের উন্নয়নে যখন রাজনীতিকদের ভূমিকা শূন্য তখন জমিদার রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সেই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে যা নজির বিহীন। কাজটা সহজ ছিল না। একদিকে পারিবারিক স্বার্থরক্ষা, অপর দিকে দরিদ্র পল্লিবাসীদের শোষণ থেকে রক্ষা করা।

জামিদারি তো একটা পাকাপোক্ত ব্যবস্থা, এর মধ্যে নায়েব-গোমস্তা-পাইক-বরকন্দাজ-সরকারি আমলা যেমন আছে, তেমনি অজস্র মামলা মোকদ্দমা, শেরেস্তার রাশি রাশি দলিল-দস্তাবেজ, তহশিল প্রভৃতি সমন্বিত এক জটিল শোষণযন্ত্র। সেই সঙ্গে মানুষের মঙ্গলসাধনে বিশ্বাসযোগ্য হওয়াও সহজ সাধ্য নয়। গ্রামীণ জীবনের শতাব্দীব্যাপী স্থবিরতাও অন্যতম বাধা। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:

“গ্রামের মধ্যে চেষ্টার কোনও লক্ষণ নাই।…লোকহিতের কোনও উচ্চ আদর্শ, পরার্থে আত্মত্যাগের কোনও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মাঝখানে আর নাই; কোনও বিধি নিষেধের শক্তি ভিতর হইতে কাজ করিতেছে না। আইনে যে কৃত্রিম বাঁধ দিতে পারে তাহাই আছে মাত্র।… অন্ন নাই, স্বাস্থ্য নাই, আনন্দ নাই, ভরসা নাই, পরস্পরের সহযোগিতা নাই, আঘাত উপস্থিত হইলে মাথা পাতিয়া লই। মৃত্যু উপস্থিত হইলে নিশ্চেষ্ট হইয়া মরি, অবিচার উপস্থিত হইলে নিজের অদৃষ্টকেই দোষী করি এবং আত্মীয়দের বিপদ উপস্থিত হইলে দৈবের উপর তাহার ভার সমর্পণ করিয়া বসিয়া থাকি।” (পাবনা কংগ্রেসে ভাষণ)

ইংরেজ রাজত্বে গ্রামীণ অর্থনীতির ভাঙন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ। আরও দেখিয়েছেন এ যুগে নাগরিক সুখ বিলাসের লোভে জমিদাররাও বাসা বেঁধেছেন শহরে। ফলে গ্রামের মানুষ দুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রথমত আগের মতো জমিদারের আয় আর গ্রামে ব্যয় হয় না, ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দ্বিতীয়ত, অনুপস্থিত জমিদাররা বাধা আয়ের বিনিময়ে জমিদারি ইজারা দিয়ে নিশ্চিত আয়ের ভোগী হতে চাইল। ফলে শোষণ বৃদ্ধি পেল, খাজনার হার বেড়ে যেতে লাগল। বর্ধিত খাজনা দিতে হল গ্রামবাসীদের। নিজে একজন জমিদার হয়ে এমন নির্মোহ দৃষ্টিতে কেমন করে ঠিক রোগটি নির্ণয় করতে সক্ষম হলেন ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।

জমিদার রায়তের সম্পর্ক বিষয়ে শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ যে মৌলিক সত্যের উদ্ঘাটন করতে পেরেছিলেন সমকালীন কংগ্রেস নেতৃত্ব তা পারেননি। মানুষের দুঃখ দারিদ্র্য তাঁর স্পর্শকাতর ও মরমী হৃদয়ে যে ঢেউ তুলেছিল তাতে তিনি উত্তরকালে জমিদারির প্যারাসাইট জীবনে গ্লানি অনুভব করেছেন, নিজেদেরকে জমির জোঁক রূপে অভিহিত করতেও দ্বিধাবোধ করেন নি। তাঁর এই সমাজ সচেতনতা গণচেতনতারই নামান্তর। এ-সবের প্রতিকার চিন্তায় তাঁর মন্তব্য অনুধাবনযোগ্য :

“আমার এই দরিদ্র চাষি প্রজাগুলোকে দেখলে ভারী মায়া করে—এরা যেন বিধাতার শিশু সন্তানের মতো নিরুপায়, তিনি এদের মুখে নিজের হাতে কিছু তুলে না দিলে এদের আর গতি নেই। পৃথিবীর স্তন যখন শুকিয়ে যায় তখন এরা কেবল কাঁদতে জানে; কোনও মতে একটুখানি খিদে ভাঙলেই আবার তখনি সমস্ত ভুলে যায়।

সোশিয়ালিস্টরা যে সমস্ত পৃথিবীময় ধন বিভাগ করে দেয় সেটা সম্ভব কি অসম্ভব ঠিক জানিনে—যদি একেবারেই অসম্ভব হয় তাহলে বিধির বিধান বড়ো নিষ্ঠুর, মানুষ ভারী হতভাগ্য! কেন না, পৃথিবীতে যদি দুঃখ থাকে তো থাক, কিন্তু তার মধ্যে এতটুকু একটু ছিদ্র একটু সম্ভাবনা রেখে চেষ্টা করতে পারে, একটা আশা পোষণ করতে পারে। যারা বলে, কোনও কালে পৃথিবীর সকল মানুষকে জীবনের কতকগুলি মূল আবশ্যকীয় জিনিস বন্টন করে দেওয়াও নিতান্ত অসম্ভব অমূলক কল্পনামাত্র কখনওই সকল মানুষ খেতে পরতে পারে না, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ চিরকালই অর্ধাশনে কাটাবেই এর কোনও পথ নেই–তারা ভারী কঠিন কথা বলে।” ১৫

 

[ আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়, তিন ]

 

সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে ‘স্ত্রীমজুর’, ‘কর্মের উমেদার’ এবং সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বিষয়ে ‘ক্যাথলিক সোশিয়ালিজম’, ‘সোশিয়ালিজম’ প্রবন্ধগুলি রচন করেন। শুধু সমস্যা চিন্তা করেই তিনি বুদ্ধিজীবী সুলভ ক্ষান্ত দেননি, তিনি পল্লীসেবায় আত্মনিয়োগ করেন লেখার কাজ কিছুটা পাশে সরিয়ে রেখে। তাই বাধ্য হন:

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

“to come out of the seclusion of my literary career and take part in the world of practical activities. The solitary enjoyment of the infinite in meditation no longer satisfied me and the text which I used for my silent worship lost their inspiration without my knowing it.”

প্রথর বাস্তবতা ও সমাজ সচেতনতা নিয়ে তিনি ১৯০০ সালে শিলাইদহে শুরু করেন পল্লী পুনর্গঠনের কাজ। পরে ১৯১৪-১৫ সালে নোবেল পুরস্কারের অর্থে শুরু করেন জমিদারির তিনটি পরগনাতেই এবং ১৯২২ সালে বীরভূমের শ্রীনিকেতনে এই কাজ আরও পরিকল্পিত ভাবে পরিচালনা করেন। এই পর্বে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যাদর্শ ব্যক্ত হয়েছে পঞ্চভূতের ‘মনুষ্য’ প্রবন্ধে। দরিদ্রদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে অন্যতম চরিত্র স্রোতস্বিনী বলছে :

“আমার মনে হয়, যাহাদের মহিমা নাই, যাহারা একটা অস্বচ্ছ আবরণের মধ্যে বন্ধ হইয়া আপনাকে ভালোরূপে চেনে না, মুকমুগ্ধভাবে সুখ দুঃখ বেদনা সহ্য করে তাহাদিগকে মানবরূপে প্রকাশ করা, তাহাদিগকে আত্মীয়রূপে পরিচিত করাইয়া দেওয়া, তাহাদের উপর কাব্যের আলোক নিক্ষেপ করা আমাদের এখনকার কবিদের কর্তব্য।”

এই আদর্শবোধ থেকেই অলসভাবে নীরবে অন্যায় সহ্য করার পরিবর্তে আপন হতে প্রতিকার প্রচেষ্টা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছিলেন কবি :

 

এই সব মূঢ় স্নান মূক মুখে

দিতে হবে ভাষা, এই সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে

ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা; ডাকিয়া বলিতে হবে

মুহূর্ত তুলিয়া শির একত্র দাঁড়াও দেখি সবে,

যায় ভয়ে তুমি ভীত, সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে,

যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার

তখনি সে পথ কুক্কুরের মতো সংকোচে সন্ত্রাসে যাবে মিশে।

 

(এবার ফিরাও মোরে)

 

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অসীম ধৈর্য ও আন্তরিকতার মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করেন। আমলাদের সংযত করে, নায়েব গোমস্তাদের ক্ষমতা খর্ব করে গ্রামের গুণী মানুষদের মর্যাদা দিয়ে অন্যায় আদায় বন্ধ করে এবং কাছারিতে হিন্দু-মুসলমানের প্রতি বৈষম্যমূলক ব্যবহার নিরসন করে নিজের জমিদারির মধ্যে গুণগত পরিবর্তন ঘটিয়ে দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীর প্রথম চৌধুরীমশাই লিখে গেছেন, তিনি একবার আড়াই লক্ষ টাকার ‘ওজরী খাজনা’ মকুব করেছেন প্রজাদের দুরবস্থা বিবেচনা করে। সমবায় ব্যাঙ্ক খুলে তার মারফত অল্প সুদে কৃষকদের ঋণ দিয়ে তিনি মহাজনদের চড়া সুদের ঋণজাল থেকে তাদের রক্ষা করেন। ফলে প্রজাদের কাছে তিনি পিতৃতুল্য সম্মান পান। কবির অঙ্গীকার—

“বড়ো দুঃখ, বড়ো ব্যথা সমুখেতে কষ্টের সংসার

বড়োই দরিদ্র, শূন্য, বড়ো ক্ষুদ্র, বদ্ধ অন্ধকার।

অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাহি মুক্ত বায়ু,

চাই বল, চাই স্বাস্থ্য আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু

সাহসবিস্তৃত বক্ষপট। এ দৈন্য মাঝারে কবি

একবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি।”

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চাষির জীবনে অগ্রগতি আনতে গেলে প্রয়োজন শিক্ষার, বিশেষ করে। মেয়েদের মধ্যে। জমিদারি এলাকার মধ্যে তিনি মেয়েদের স্কুল স্থাপন করেন, সেখানে তাঁর পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী পড়াতেন। পরে ১৯০১ সালে বোলপুর ব্রহ্মচর্যাশ্রম শান্তিনিকেতনে যা পরে বিশ্বভারতীতে রূপান্তরিত, যেখানে শুধু সারা ভারত নয়, সমগ্র বিশ্বের মিলনক্ষেত্র হয়েছিল। শিক্ষাশাস্ত্রী রূপে কবি রবীন্দ্রনাথের নাম বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ল, এও এক বিস্ময় এবং নজিরবিহীন।

গ্রামোন্নয়ন এবং শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন পরিচালনার জন্য কবি ক্রমান্বয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। একে একে পুরীর সমুদ্রতটের বাড়ি, স্ত্রীর যাবতীয় গহনা বিক্রি এবং কয়েকটি বই প্রকাশকদের কাছে নামামাত্র টাকায় ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি পদক্ষেপ তাঁকে নিতে হয়েছিল।

তাঁর পল্লী উন্নয়নের কাজে শুধু জামাই নগেন্দ্রনাথ, পুত্র রথীন্দ্রনাথ নয়, এক বড় ভূমিকা নিয়ে এলেন ইংরজ যুবক এলমহার্স্ট। এক ধনবতী আমেরিকান মহিলা ডরোথি স্ট্রেট সুরুলের গ্রামোন্নয়নের জন্য কবিকে এককালীন পঞ্চাশ হাজার টাকা দানস্বরূপ প্রদান করেন। এলমহার্স্টের সঙ্গে এই বিধবা মহিলার বিবাহ হয় এবং এই মহিলা বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার পূর্বে পর্যন্ত প্রতি বছর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য বাবদ সাহায্য করেছেন।

এ থেকে রবীন্দ্রনাথের সম্মোহনী ক্ষমতা ও কাজের প্রতি বিদেশীদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধার পরিচয় পাওয়া যায়, যা আর কোনও ভারতীয় নেতা বা মনীষীর ভাগ্যে জোটেনি।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘শান্তিনিকেতন কর্মসমিতি’, ‘সুরুল কৃষি সমিতি’ পরবর্তীকালে ‘শ্রীনিকেতন গ্রামোন্নয়ন সমিতি’ ইত্যাদির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল কুটির শিল্প, কৃষি, গোপালন, হাঁস মুরগি, মৌমাছি পালন, মাছের চাষ, মাছের খাদ্য তৈরি, গ্রামে গ্রামে কুয়ো খোঁড়া, মজা ও পচা পুকুর সংস্কার, ম্যালেরিয়া নিবারণ কল্পে বিভিন্ন ব্যবস্থা অবলম্বন, জঙ্গল কেটে পথঘাট তৈরি, জলকষ্ট নিবারণ, আদিবাসী সহ গ্রামের মানুষের জন্য দিবা ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন ইত্যাদি।

সেই সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের পরস্পরের মিলন ক্ষেত্র রচনার জন্য বৃক্ষরোপণ, হলকর্ষণ, কৃষিমেলা, পৌষমেলা, বাউলমেলা, বর্ষামঙ্গল, শারদোৎসব, বসন্তোৎসব প্রভৃতি অসাম্প্রদায়িক মেলা সংগঠিত করা। এককথায় সমগ্র গ্রামীণ জীবনে এক অভূতপূর্ব প্রাণের জোয়ার আনতে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াস। সাময়িকভাবে হলেও নিশ্চিত সাফল্য অর্জন করেছিল।

এইসঙ্গে লোকসাহিত্য, লোকসঙ্গীত, ছড়া, প্রবাদবচন, লোকচিকিৎসা ইত্যাদির উদ্ধার ও সংরক্ষণেও এক বিশাল কর্মকাণ্ড লক্ষ করা যায়। এই সব কাজে এলমহার্স্ট ছাড়াও কালীমোহন ঘোষ এবং আরও কিছু সেবাব্রতীকে রবীন্দ্রনাথ পাশে পেয়েছিলেন। কবির নির্দেশে কালীমোহন স্থানীয় সাঁওতাল গ্রামগুলির সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে আত্মনিয়োগ করেন।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৯২৮ সালে আদিবাসী সহায়ক সমিতি গঠিত হয়, পরের বছর শান্তিনিকেতন সংলগ্ন ৭০০ একর জমির অধিগ্রহণ করে বিশ্বভারতীকে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩০০ বিঘা ডাঙা জমি সাঁওতাল পরিবারগুলির মধ্যে বিলি করা হয়, ১৯৩৪ সালে শ্রীনিকেতন সংলগ্ন পাঁচটি সাঁওতাল পাড়া নিয়ে একটি সাঁওতালী পল্লীসেবা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। বেশ কিছু দাতব্য চিকিৎসালয় ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। পাশাপাশি গড়ে ওঠে অনেকগুলি সমবায় ঋণদান সমিতি। ‘শিক্ষাসত্র’ এবং ‘লোকশিক্ষা সংসদ’ সে সময় বিপুলভাবে ফলপ্রসূ হয়েছিল।

১৯০৪ সালেই রবীন্দ্রনাথ স্বদেশী সমাজ ও সরকার অনপেক্ষ কর্মকাণ্ড গ্রহণে আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং হাতেকলমে সাধ্যমত করে দেখিয়েছিলেন। জমিদারি কর্তৃত্বের খর্বতা, কৃষকের হাতে শুধু জমি দিলে হবে না জমিরক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে, চাষির খাজনা হ্রাস ইত্যাদি দাবি বিভিন্ন সময় উত্থাপিত হলেও জমিদারির বিলোপের বিষয়টি স্বাধীনতার আগে আসে নি।

তবে রাশিয়া ভ্রমণের পরে জামিদারি ব্যবস্থা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বিতৃষ্ণা এবং জমিদারি ত্যাগের অভিপ্রায় বিষয়ে মনোভাবগত আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠাই উচিত, বিশেষ করে যে মানুষটি গ্রামীণ সমাজের জন্য এত কাণ্ড করেছেন, ভারতবর্ষে এর দ্বিতীয় নজির কোথায়। দুই বিঘা জমি’ কবিতা তো একজন জমিদার কবিরই রচনা। কবিতাটির মধ্যে জমি হারা কৃষকের বেদনার সঙ্গে কবির ক্ষোভ প্রকাশের বয়ানে শ্রেণিদ্বন্দ্বের ইঙ্গিতও স্পষ্ট। জমিকে উদ্দেশ্য করে উপেনের মুখে কবির কথন :

“আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন,

তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন।

ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন

কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোনো চিহ্ন

কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি, ক্ষুধাহারা সুধারাশি।

যত হাসো আজ, যত করো সাজ, ছিলে দেবী হলে দাসী।”

(দুই বিঘা জমি)

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিকে দেবী থেকে দাসীতে পরিণত করেছে, আর এই দাসত্বের প্রভু জমিদাররা, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন আর একজন জমিদার। উপরের অংশটি ছাত্রপাঠ্য সংকলনে বর্জিত হয়েছে, কেন কে জানে! দেশ স্বাধীন হয়েছে, পঞ্চায়েতরাজ স্থাপিত হয়েছে কিন্তু গ্রামোন্নয়নে ‘রবীন্দ্র মডেলটি কিছুটা প্রসারিত করে রূপায়িত করার বিষয়টির প্রতি স্বাধীন দেশের সরকার এখনও দৃষ্টিপাত করেনি।

[ আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়, চার]

বাংলা ছোটগল্পের পথিকৃৎ রবীন্দ্রনাথ। আর এই গল্প সৃষ্টি বিলম্বিত হত যদি না তিনি জমিদারি উপলক্ষে গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে না পড়তেন। তাঁর ছোটগল্পেই প্রথম সাক্ষাৎ পাওয়া গেল অখ্যাত অজ্ঞাত সাধারণ মানুষের। ইতিহাসের ধর্মশাস্ত্রে, পুরাণে তাদের পূর্বছায়া নেই, তারা সংসারের নামগোত্রহীনদের দল, তারা সৃজনরাজ্যের হরিজন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন :

“আমি বলব আমার গল্পে বাস্তবের অভাব ঘটেনি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা…ভেবে দেখলে বুঝতে পারবে আমি যে ছোট ছোট গল্পগুলো লিখেছি, বাঙালি সমাজের বাস্তব জীবনের ছবি তাতেই প্রথম ধরা পড়ে।

… আমার রচনায় যাঁরা মধ্যবিত্ততার সন্ধান করে পাননি। বলে নালিশ করেন, তাঁদের কাছে আমার একটা কৈফিয়ৎ দেওয়ার সময় এলো। এক সময় মাসের পর মাস আমি পল্লিজীবনের গল্প রচনা করে এসেছি। আমার বিশ্বাস এর পূর্বে বাংলা সাহিত্যে পল্লিজীবনের চিত্র এমন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হয়নি। তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির লেখকের অভাব ছিল না, তাঁরা প্রায় সকলেই প্রতাপ সিংহ বা প্রতাপাদিত্যের ধ্যানে নিবিষ্ট ছিলেন। আমার আশঙ্কা হয়, এক সময়ে গল্পগুচ্ছ বুর্জোয়া লেখকের সংসর্গ দোষে অসাহিত্য বলে অস্পৃশ্য হবে।” ১৮

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবির অভিমান ও আশঙ্কা সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি। তাঁর ছোটগল্প শুধু বাংলা নয় ভারতীয় সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কেউ কেউ দাবি করেন তাঁর ছোট গল্প পূর্ব বাংলার প্রকৃতি সঞ্জাত। দাবি মিথ্যা নয়। রবীন্দ্রনাথ বলছেন :

“পোস্টমাস্টার আমার বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে দিয়েছি।” সোনারতরী কাব্যের মুখবন্ধে অনুরূপ বক্তবা “ক্ষণে ক্ষণে যতটুকু গোচরে এসেছিল তার চেয়ে অনেকখানি প্রবেশ করেছিল মনের অন্দর মহলে আপন বিচিত্র রূপ নিয়ে।”

পূর্ব বাংলার প্রকৃতি ও মানুষ যৌগিক পদার্থের মতো তাঁর ছোটগল্পগুলিতে মিশে গেছে। তবে তাঁর গল্পে মানুষই রাসায়নিক প্রাধান্য পেয়েছে বেশি, যেমন কবিতায় প্রাধান্য প্রকৃতির। রবীন্দ্রনাথের

“ছোটগল্পের মধ্যে পাই সুখ দুঃখ বিরহ মিলনপূর্ণ মানবসমাজে প্রবেশের আকাঙ্ক্ষা আর তৎকালীন কবিতায় পাই বিশেষ সোনারতরী, চিত্রার ন্যায় কাব্যের নিরুদ্দেশ সৌন্দর্যলোকে উধাও হইয়া যাইবার আকাঙ্ক্ষা।” ১৯

 

[ আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়, পাঁচ ]

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গল্পগুচ্ছের পল্লিভিত্তিক গল্পগুলি বিশ্লেষণ করলে ‘গোটা পল্লিজীবনকেই হয়তো চিত্রিত দেখতে পাব’। একথার মধ্যে অতিশয়োক্তি থাকলেও অনেকাংশেই সত্য। পল্লিবাংলার দারিদ্র, দুঃখ, সরলতা, কুটিলতা, সম্পত্তি-বিরোধ, পণপ্রথা, শরিকি কলহ গল্পের বিষয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তজাত ভূমিব্যবস্থা কীভাবে শোষণের তীব্রতা সৃষ্টি করেছে। গ্রামীণ সমাজে তার অসামান্য দৃষ্টান্ত ‘শাস্তি’ গল্প। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন :

“চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের রথযাত্রাই আমাদের গত দেড় শতাব্দীব্যাপী সংস্কৃতির একটা বৃহদংশ রচনা করেছে, সেই রথাযাত্রায় বাংলাদেশে জমিদারির নাটমঞ্চ আলোকোজ্জ্বল ও উৎসবমুখর হয়েছে, সাংস্কৃতিক মেলা জমজমাট হয়েছে, সেই রথযাত্রার কল্যাণে ও প্রসাদে উদ্ভূত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই বাজারে হাসিমুখে কেনাকাটা করেছে এ সবই সত্য;

কিন্তু তার চেয়ে আরও সত্য এই যে অগণিত নির্বাক দরিদ্রের উপরে বংশানুক্রমিকভাবে এই রথের দড়ি টানার ভার পড়েছিল, তাদের কত জনের শ্রমের স্বেদজলে ও ক্লেশের অশ্রুজলে সেই রথের গতিপথ কত পিচ্ছল হয়েছে, এবং সেই জগদ্দল যন্ত্রের চাকায় যে কত জনের অস্থিপঞ্জর চূর্ণ হয়ে গিয়েছে তার হিসাব এই বৃহৎ কালব্যাপী সংস্কৃতির পৃষ্ঠায় কদাচিৎ লিপিবদ্ধ। যে যৎসামান্য দুর্লভ স্থানে তার কথা ধরা আছে তার মধ্যে ‘শাস্তি’ গল্পটি অন্যতম।” ২০

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অভিশাপ কেলাসিত রূপে প্রকাশিত হয়েছে ‘শাস্তি’ গল্পে। দারিদ্রপীড়িত এক দিনমজুর পরিবারের দুই ভাই ও বউদের নিয়ে এক অসামান্য ট্রাজেডি রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সামাজিক অন্যায়ের পটভূমিতে পদ্মার কূলবর্তী গ্রাম্যবধূ চন্দরার ফাঁসির মঞ্চে যাত্রার কাহিনিটি লেখক কী আশ্চর্য মুন্সিয়ানায় এঁকেছেন তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ডক্টর শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘এই নীচজাতীয়া রমণীর মধ্যে এরূপ অনমনীয় ইচ্ছাশক্তি ও সংসারের প্রতি নিবিড় ঘৃণা এক রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কোনও পল্লিপ্রেমিক সাহিত্যিক আবিষ্কার করিতে পারিতেন কিনা সন্দেহ। লক্ষ করিবার বিষয় এই যে, অতি দীন কৃষক পরিবারের চিত্রাঙ্কনে কাব্যাভিষেকের একবিন্দু জলও লেখকচিত্তকে আর্দ্র করে নাই।

তিনি কঠোর মনস্তাত্ত্বিক উপায়ে, চরিত্রসঙ্গতির উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করিয়া জীবনদ্বন্দ্বের অনিবার্য পরিণতিটুকু দেখাইয়াই ক্ষান্ত হইয়াছেন। বাংলার কোমল মৃত্তিকায় গ্রিক ট্রাজেডির পাষাণ প্রতিমা নির্মিত হইয়াছে।’ ২’ ‘মেঘ ও রৌদ্র’, ‘উলুখড়ের বিপদ, ‘হালদার গোষ্ঠী’ প্রভৃতি গল্পেও জমিদার শাসিত গ্রামজীবনের নানা সমস্যা ধরা পড়েছে। বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পল্লিসমাজের ব্যাধি নির্ণয়ে রবীন্দ্রনাথ কত সিদ্ধহস্ত ছিলেন তার প্রমাণ ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্প।

ছিন্নপত্রে ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্পের জন্মমুহূর্ত সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন :

“আজ সকালবেলায় তাই গিরিবালা নাম্নী উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ একটা ছোট অভিমানী মেয়েকে আমার কল্পনারাজ্যে অবতারণা করা গেছে। সবে মাত্র পাঁচটি লাইন লিখেছি।

এবং সে পাঁচ লাইনে কেবল এই কথা বলেছি যে, কাল বৃষ্টি হয়ে গেছে, আজ বর্ষণ-অস্তে চঞ্চল মেঘ এবং চঞ্চল রৌদ্রের পরস্পর শিকার চলছে–হেনকালে পূর্বসঞ্চিত বিন্দু বিন্দু বারি-শীকরবর্ষী তরুতলে গ্রামপথে উক্ত গিরিবালার আসা উচিত ছিল, তা না হয়ে আমার বোটে আমলাবর্গের সমাগম হল।”

এই গল্পের চালচিত্র বেশ প্রশস্ত। ‘গোরা’ উপন্যাসের দেশ ও জাতিবিধৃত মহাকাব্যিক আয়োজনের অঙ্কুর এই গল্পে দূরলক্ষ নয়। এ গল্পের রচনাকাল ১৩০২ সাল। সিপাহি বিদ্রোহের নিগূঢ় প্রভাবে না হলেও শিক্ষিত সমাজের মধ্যে বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদের দৃষ্টান্ত এই গল্প। দেশীয় মানুষদের প্রতি ইংরেজের সহনশীলতা প্রায় শূন্যের কোঠায়, প্রশাসন সব সময় যেন মারমুখী হয়ে আছে। নিপীড়নের মাত্রাধিক্য দেশীয় মানুষদের ন্যূনতম মানবাধিকারকেও বিপন্ন করে তুলেছে।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সবচেয়ে পীড়াদায়ক জনগণের নিষ্ক্রিয়তা ও জাতীয়তাবাদী মুক্তি আন্দোলনের ক্লীবতা। কংগ্রেস রাজনীতির গণভিত্তি তখনও তেমন গড়ে ওঠেনি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কল্যাণে দেশীয় সামন্তশ্রেণি শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করেছে, শ্রমিকশ্রেণি সংখ্যার দিক থেকে তেমন গড়ে ওঠেনি। সুতরাং শিক্ষিত যুবসম্প্রদায়ের উপর খানিকটা ভরসা, তাও সমষ্টিগত শক্তিতে নয়। এ গল্পের নায়ক ভূমিনির্ভর শিক্ষিত যুবক, সমাজের কোনও কাজেই লাগে না।

নিজের ক্ষীণজীবী অস্তিত্ব নিয়ে কোনওক্রমে দিনাতিপাত করার চেষ্টায় মগ্ন। রুগ্‌ণ ও দুর্বল দৃষ্টিশক্তি নায়ক শশী যেন তৎকালীন বাঙালি শিক্ষিত যুবসম্প্রদায়ের প্রতীক। কিন্তু লেখক সেই নির্জীব চরিত্রটিকেই ভেতর বাইরের দ্বন্দ্বে গড়েপিটে জাতির প্রতি চাপিয়ে দেওয়া অপমানের অঙ্কুশ দিয়ে আঘাত করতে করতে প্রতিবাদী করে তুলেছেন, জেল খাটিয়েছেন।

আত্মসমর্পিত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বিদ্রোহীসত্তায় রূপান্তরিত হয়েছে, যদিও সে বিদ্রোহ একক, বৃহত্তর জনগণের সম্পৃতিবর্জিত। তথাপি জাতীয় সম্মান রক্ষায় ও জনগণের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য এই ধরনের একক বিদ্রোহেরও প্রয়োজন ছিল। আইনের উচ্চতম শিক্ষায় শিক্ষিত যুবকের যখন ইংরেজের আইনের শাসন সম্পর্কে চূড়ান্ত মোহমুক্তি ঘটেছে তখন সে চরমপন্থা গ্রহণ করে সরকারি আমলাকে দৈহিকভাবে আক্রমণ করে জাতীয় সম্মান রক্ষায় উদ্যোগী হয়েছে।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

একে সন্ত্রাসবাদের সূচনা বলা হলে বাড়িয়ে বলা হবে, বরং বুর্জোয়া মানবিক ক্রোধের প্রকাশ বলেই বিবেচনা করা সঠিক কেন না সন্ত্রাসবাদীদের গণভিত্তি রচনার কর্মসূচি না থাকলেও অন্তত একটি সংগঠন থাকত। গল্পের সমাপ্তিতে নায়কের রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যতের কোনও ইঙ্গিত নেই।

আবার কাহিনির ব্যক্তিগতভাবে প্রথমাংশের মতো শেষেও শশী ও গিরিবালার মধ্যে বাতায়নের ব্যবধান থেকেই গেল। নানা অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও উপন্যাসের লক্ষণাক্রান্ত এই গল্পটি ‘গোরা’ উপন্যাসের প্রস্তাবনা বলে স্বীকৃত হতে পারে। ‘গোরা’ ১৯০৫ সালের দেশব্যাপী আন্দোলনের প্রভাবে বিচ্ছিন্নভাবে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছে। এখানে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধিজাত স্বীকৃতি রয়েছে :

“আমি যে একা আমি নহি, আমার যেমন এই ক্ষুদ্র শরীর তেমনি আমার যে একটি বৃহৎ শরীর আছে, আমার দেশের মাটি জল আকাশ যে আমারই দেহের বিস্তার, তাহারই স্বাস্থ্যে যে আমারই স্বাস্থ্য, আমার সমস্ত স্বদেশীদের সুখ দুঃখময় চিত্ত যে আমারই চিত্তের বিস্তার, তাহারই উন্নতি যে আমারই চিত্তের উন্নতি, এই একান্ত সত্য আমরা যতদিন না উপলব্ধি করিয়াছি ততদিন আমরা দুর্ভিক্ষ হইতে দুর্ভিক্ষে,

দুর্গতি হইতে দুর্গতিতে অবতীর্ণ হইয়াছি, ততদিন কেবলই আমরা ভয়ে ভীত এবং অপমানে লাঞ্ছিত হইয়াছি। একবার ভাবিয়া দেখুন, আজ যে বহুদিনের দাসত্বে পিষ্ট, অন্নাভাবে ক্লিষ্ট কেরানি সহসা অপমানে অসহিষ্ণু হইয়া ভবিষ্যতের বিচার বিসর্জন দিয়াছে তাহার কারণ কী! তাহার কারণ তাহারা অনেকটা পরিমাণে আপনাকে সমস্ত বাঙালির সহিত এক বলিয়া অনুভব করিয়াছে।”

এই উপলব্ধি রবীন্দ্রনাথের আর কোনও গল্পে তেমন করে আর পাওয়া যায়নি। অন্যত্র সন্ত্রাসবাদকে খানিকটা নির্মমভাবে আঘাত করে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিচয় দিয়েছেন। পরবর্তীকালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘নামঞ্জুর’ ও ‘সংস্কার’ গল্পদুটিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের পেটিবুর্জোয়াসুলভ অন্তঃসারশূন্যতাকে ব্যঙ্গ করেছেন কিন্তু কোনও ইতিবাচক নির্দেশ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

‘দুর্বুদ্ধি’, ‘রাজটিকা’ গল্পদুটিকেও রাজনীতি আশ্রয়ী গল্প বলা চলে। এই সব গল্পের মধ্যে সমকালীন জাতীয় চরিত্র ও দেশকালের চেহারা এমনভাবে বিজড়িত আছে যে গভীর মনোনিবেশের দাবি রাখে। স্টেট নামক মারণযন্ত্রের এক ছোট প্রতিনিধি দারোগার নিষ্ঠুরতার বীভৎস কাহিনি ‘দুর্বুদ্ধি’।

এ গল্পে রবীন্দ্রনাথ নির্মম বাস্তব শোষিত মানুষের বেদনা ও লাঞ্ছনার করুণ রসটি ফুটিয়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে কাপুরুষতা বিসর্জন দিয়ে প্রতিবাদ করার তথাকথিক দুবুদ্ধিতার মধ্যেই যে প্রতিকারের উপায় রয়েছে সেদিকে অঙ্গুলি সংকেত করেছেন। তিনি আরও দেখিয়েছেন মধ্যবিত্তের এই মুহূর্তের ফুঁসে ওঠা কতখানি সাময়িক এবং কত দ্রুত আপসকামী। কিন্তু করতে চাইলেই আপস হয় না। অভ্যন্তরীণ জন্য অনিবার্য পরিণতির দিকে নিয়ে যাবেই।

“বহু উৎপীড়িতভাবে অশ্রুসেচনে দারোগার সহিত ডাক্তারের যে প্রণয় বাড়িয়া উঠিয়াছিল তাহা এই ঝড়ে ভূমিসাৎ হইয়া গেল। অনতিকাল পরে দারোগার পায়ে ধরিয়াছি, তাঁহার মহাসদয়তার উল্লেখ করিয়া অনেক স্তুতি এবং নিজের বুদ্ধিভ্রংশ লইয়া অনেক আত্মধিক্কার প্রয়োগ করিয়াছি, কিন্তু শেষটা ভিটা ছাড়িতে হইল।” কাব্য ও রোমান্সবর্জিত এমন নির্মম বাস্তবতামণ্ডিত সৃষ্টি রবীন্দ্রসাহিত্যে আর দ্বিতীয়টি নেই।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথের অপর কৃতিত্ব প্রকৃতির সঙ্গে অভিন্নসত্তা মানবচরিত্র সৃজনে। পদ্মা-শিলাইদহ-সাজাদপুরের অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে এই চরিত্রগুলি অঙ্কুরিত হয়েছে এবং বুনো ফুলের সার্থকতা ব্যর্থতা নিয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছে, কখনও ঝরে পড়েছে। সুভা গল্পের সুভা, ছুটির ফটিক, অতিথির তারাপদ, আপদ গল্পের নীলকণ্ঠরা শুধু গ্রাম্য প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশই নয়, মানব সংসারের বিচিত্র সৃষ্টি। সংসারের নিয়মে তারা সৃষ্ট নয়—তাই দ্বন্দ্ব।

প্রকৃতির সঙ্গে মানব সমাজের যেন রয়েছে দ্বন্দ্ব, রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন সংসারের নিয়ম রীতির সঙ্গে তেমন রয়েছে এদের দ্বন্দ্ব। এদের বেদনা, এদের যন্ত্রণা ট্রাজেডি সংসারের জটিলতার সঙ্গে, নির্দয়তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার পরিণতি। ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘রুথ’ প্রকৃতির সন্তান, রবীন্দ্রনাথের সুভা শুধু প্রকৃতির সন্তান নয়, প্রকৃতি তার ধাত্রীও বটে।

বাকশক্তিহীন সুভা, কিন্তু “প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূর্ণ করিয়া দেয়। যেন তাহার হইয়া কথা কয়। নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মরধ্বনি, সমস্ত মিশিয়া চারিদিকের চলাফেরা আন্দোলন-কম্পনের সহিত এক হইয়া, সমুদ্রের তরঙ্গরাশির ন্যায়, বালিকার চিরনিস্তব্ধ হৃদয় উপকূলের নিকটে আসিয়া ভাঙিয়া পড়ে।” প্রকৃতি তার বেদনা বোঝে কিন্তু সংসারের চৌকাঠ ডিঙিয়ে অভ্যন্তরে ভীরু পদক্ষেপমাত্রই বেসুর বেজে উঠল।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সংসারের সহানুভূতি পায়নি ফটিক, মৃত্যুতে তার করুণ পরিণতি। অকাল বসন্তের মতোই সংসার থেকে পলায়ন করেছে তারাপদ। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো কোনও প্রকৃতি নির্ভর পলায়নপর দার্শনিকতা এই গল্পগুলিতে প্রচার করার চেষ্টা করেননি। বরং তিনি যেন এই সব চরিত্রের জন্য নিষ্করুণ সংসার তথা সমাজের কাছে সহানুভূতি প্রার্থনা করেছেন। এখানেই স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্ব। রবীন্দ্রসমাজদৃষ্টির মণিমুক্তো এই গল্পগুলি।

ঊনিশ শতকীয় সমাজচেতনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাবোধ। সেই শ্রদ্ধাবোধ কবিতা ও গল্পের ক্ষেত্রে প্রথম পরিলক্ষিত হয় রবীন্দ্রনাথের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছোটগল্পে যেমন সুভা, ফটিক, তারাপদদের মাতৃসম গভীর মমতায় স্থান দিয়েছেন, তেমনি অপরিসীম শ্রদ্ধাবোধে স্থান করে দিয়েছেন রামকানাই, রাইচরণ, রাধামুকুন্দ প্রমুখকে, যাঁরা লোভ-হিংসা-দ্বেষের মধ্যেও সুস্থ মূল্যবোধের দীপশিখাটি জ্বেলে রাখেন সমাজজীবনে।

‘রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’, ‘দান প্রতিদান’, ‘দিদি’, ‘সমস্যাপূরণ’, ‘অনধিকার প্রবেশ প্রভৃতি গল্পের সাধারণ গ্রাম্য, মলিন, আপাততুচ্ছ চরিত্রগুলির মহত্ত্ব সর্বকালের সম্পদ। পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ‘রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা’ গল্পের ব্যারিস্টার, ‘সমস্যাপূরণ’ গল্পের বিপিন ও উকিল প্রমুখ শুধু নিষ্প্রভ নয় অশ্রদ্ধেয় ও বটে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন :

“দেশের কেন্দ্রস্থলের কলরব উচ্ছ্বাস থেকে অনেক দূরে দারিদ্র্যে, অশিক্ষায় ও নির্জনতায় নির্বাসিত বাংলার পল্লিজীবনে সত্য ও জীবনমহিমার সহজ মাহাত্ম্য সহজে দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা নয়; রবীন্দ্রনাথ তাদের থেকে লৌকিক দূরত্বে অবস্থিত থেকেও অভ্রান্তভাবে তাদের দেখতে পেয়েছেন এবং আমাদের দেখিয়েছেন।”

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রামকানাই, রাইচরণ ইত্যাদির চরিত্রের নিছক ভালোমানুষি আধুনিক কালের সাহিত্যচরিত্র হিসেবে সমালোচকদের হয়তো অপছন্দ কিন্তু এমন সত্যাশ্রয়ী সৎ ও মানবিক চরিত্র যদি সমাজে প্রচুর সংখ্যায় সম্ভব হত তাহলে সমাজে যে সুস্থ পরিবেশ বজায় থাকত তা বলাই বাহুল্য। সৎ মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে এই চরিত্রগুলি চিরকাল পাঠকের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করবে, বিশেষ করে মূল্যবোধের তীব্র সংকটের কালে।

[ আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়, ছয় ]

রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ নিক্ষিপ্ত হয়েছে শহর থেকে গ্রাম সমাজের নিরক্ষর নিরন্ন অসহায় মানব সমাজের মধ্যে। গোরা চরঘোষপুর গ্রামের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গভীরতর অর্থে মিলিত হয়ে দেশকে আপন করে পেতে চেয়েছিল। গোরা বুঝেছিল দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী থেকে সে বিচ্ছিন্ন, তাই তার সন্ধান প্রকৃত ভারতবর্ষের শিক্ষিত শহরবাসী মধ্যবিত্তের প্রকৃত identity-র সন্ধান। গ্রামীণ সমাজে রয়েছে যে সমাজ, যা কাল থেকে কালান্তরে শ্রেণিতে শ্রেণিতে বিত্ত ও বর্ণের মাধ্যমে ব্যবধানের দুর্লঙঘ দেওয়াল তুলে রেখেছে গোরা তা অতিক্রম করতে চেয়েছে। তাই গোরার উপলব্ধি :

“আজ এই ভারতবর্ষের সকলের জাতিই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন।…আজ আমি সত্যকার সেবার অধিকারী হয়েছি, সত্যকার কর্মক্ষেত্র আমার সামনে এসে পড়েছে—সে আমার মনের ভিতরকার ক্ষেত্র নয়—সে এই বাইরে পঞ্চবিংশতি কোটি লোকের যথার্থ কল্যাণ ক্ষেত্র।…আজ আমি এমন শুচি হয়ে উঠছি যে চণ্ডালের ঘরেও আমার আর অপবিত্রতার ভয় রইল না।”

(গোরা)

এ এক মহৎ সৃষ্টি। মনে রাখতে হবে ১৯০৮ সালে অর্থাৎ প্রায় এক দশক আগে, সর্বহারা মানুষের সমাজের কেন্দ্রে মুক্তির আলোয় স্নাত গোরা। ‘দুই বিঘা জমি’-র উপেনের দীর্ঘশ্বাস :

‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’

জমির প্রতি মানুষের মমত্ব যে একটা identity তা বোঝা যাবে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য থেকে :

“নিজের সম্পত্তির প্রতি নিজের মমতা, ওটা তর্কের বিষয় নয়। ওটা আমাদের সংস্কারগত। নিজেকে আমরা প্রকাশ করতে চাই। সম্পত্তি সেই প্রকাশের একটা উপায়।

… সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্পত্তি আপন ব্যক্তিরূপের ভাষা—সেটা হারালে সে যেন বোবা হয়ে যায়। সম্পত্তি যদি কেবল আপন জীবিকার জন্যে হত, আত্মপ্রকাশের জন্যে না হত, তাহলে যুক্তির দ্বারা বোঝানো সহজ হত যে, ওটা ত্যাগের দ্বারাই জীবিকার উন্নতি হতে পারে।” ২২

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উপেনের অসহায় যন্ত্রণায় চোখের জল স্তব্ধ হয়ে গেছে কিন্তু রাশিয়া প্রত্যাগত ছিয়াত্তর বছর বয়স্ক রবীন্দ্রনাথের ‘ছড়ার ছবি’ কাব্যের ‘সুধিয়া’ নামের কবিতায় সামরু নিশ্চেষ্ট নয়, প্রত্যাঘাতে এক প্রতীক বিপ্লবী মূর্তি।

অনাবৃষ্টি মন্বন্তর ও বন্যায় বিপর্যস্ত সামরুর প্রাণপ্রিয় গাইগরুটিকে (সুধিয়া) শেঠজি দুনিচাদ তার ছেলের সখ মেটাবার কারণে দেনার দায়ে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে সামরু একটি ভোজালি নিয়ে দুনিচাঁদকে শাসিয়েছে গরু ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। পুলিশের ভয় সে পায়নি বরং চরম শিক্ষা দেওয়ার শ্রেণিগত সাবধানবাণী শুনিয়ে এসেছে এবং গরু ফিরে এসেছে। দুনিচাঁদ যখন বলল—

“গোল কর তো ডাকব পুলিশ। সামরু বললে ডেকো।
ফাঁসি আমি ভয় করিনে, এইটে মনে রেখো।
দশ বছরের জেল খাটব, ফিরব তারপর,
সেই কথাটাই ভেবো বসে, আমি চললাম ঘর।”

প্রোলেতারিয়েতের এমন রাগী চেহারা ১৯৩৭ সালে রচিত আরেকটি কবিতায়। ‘মাধো’। মাধ্যের পোষা কুকুরকে মারার জন্য জমিদারের ছেলে দুলাল চাবুক তুলেছে। মাধো রুখে দাঁড়িয়েছে ‘মারলে কুকুর ফেলব তোমায় পেড়ে’। মাধ্যের বাবা এই বিদ্রোহের পরিণাম ভালো করেই জানে, সে ছেলেকে ধরে এনে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে—’এত বড় বুকের পাটা, মনিবকে তুই মারিস।’ স্বামীর এই আত্মসমর্পণ মাধ্যের মার ভালো লাগেনি। সে পুত্রের বিদ্রোহে সাহায্য করেছে। ছেলেকে বন্ধন মুক্ত করে দিয়েছে ঘৃণায়—

“মাধো চাইল চলে যেতে, আমি বললাম ‘যেও
এমন অপমানের চেয়ে মরণ ভালো সেও’।
স্বামীর পরে হানল দৃষ্টি দারুণ অবজ্ঞার;
বললে, ‘তোমার গোলামিতে ধিক সহস্রবার।”

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এই প্রতিবাদী প্রোলেতারিয়েতকে পাওয়া যাবে ‘রথের রশি’ নাটকে। রাজসৈনিক কবিকে জিজ্ঞাসা করছে—

“একী উলটো পালটা ব্যাপার, কবি।
পুরুষের হাতে চলল না রথ, রাজার হাতে না
মানে বুঝলে কিছু?”

কবির উত্তর যা ঐতিহাসিক তাৎপর্যে বিধৃত—

“এই বেলা থেকে বাঁধনটাকে দাও মন
রথের দড়িটাক নাও বুকে তুলে, ধূলোয় ফেলো না;
রাস্তাটাকে ভক্তিরসে দিয়ো না কাদা করে।
আজকের মতো বলো সবাই মিলে—
যারা একদিন মরে ছিল তারা উঠুক বেঁচে;
যারা যুগে যুগে খাটো হয়ে তারা দাঁড়াক এবার মাথা তুলে।”

নির্যাতিত শোষিত শ্রেণির হাতে ক্ষমতা আসুক রবীন্দ্রনাথ সে দিকেই স্পষ্টতই ইশারা করেছেন। ‘মুক্তধারা’ নাটকে খাজনা দেওয়া বিষয়ে কৃষক-নেতা ধনঞ্জয় বৈরাগীর সঙ্গে রাজা রণজিতের কথপোকথন স্মরণ করা যেতে পারে এই প্রসঙ্গে :

মহারাজ—'(খাজনা) দেবে না? এত বড় আস্পর্ধা?
ধনঞ্জয় – যা তোমার নয় তা তোমাকে দিতে পারব না।’
মহারাজ—’আমার নয়??
ধনঞ্জয়— আমার উদ্বৃত্ত অন্ন তোমার, ক্ষুধার অন্ন তোমার নয়।’

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ধনঞ্জয়ের গ্রেপ্তারের পর কৃষকরা যখন হাতিয়ার নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে উদ্যত তখন কিন্তু ধনঞ্জয় এই সশস্ত্র বিদ্রোহ থেকে কৃষকগোষ্ঠীকে নিরস্ত করেন, ‘আমি মারকে না-মারা দিয়ে ঠেকাব।’ ধনঞ্জয়রূপী রবীন্দ্রনাথ হয়তো ভেবেছেন দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত নয়, কিন্তু তিনি লড়াই মুলতুবি করতে চান না, জারি রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকের ধনঞ্জয়কেও একই ভূমিকায় দেখা যাবে।

রাজা বা জমিদারের শোষণকে রবীন্দ্রনাথ কখনও আড়াল করেননি। বিশেষ করে ‘হালদারা গোষ্ঠী’ গল্পের জমিদার মনোহরলাল চরিত্রটি বারবার আমাদের স্মরণে আসে। মনোহরলাল ও নায়েব নীলকণ্ঠের নৃশংস প্রজা বিদ্বেষ অসীম নিপুণতায় নিপীড়িত মানুষের প্রতি ভালোবাসায় তিনি অসামান্য করে এঁকেছেন।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সব জমিদারকে তিনি একই চালচ্চিত্রে একই রঙে আঁকেননি, সাহিত্যে তা উচিতও নয়। শ্রেণি চরিত্রের বাইরেও ব্যক্তি মানুষ কিছুটা স্বাতন্ত্র্য দাবি করে। যোগাযোগ’ উপন্যাসের বিপ্রদাস তেমনি একটি চরিত্র। সামন্ত ব্যবস্থার গর্ভ থেকে নবীন পুঁজির যে উত্থান ঘটছে কুমুদিনীর স্বামী চরিত্রের মধ্যে তা অনিবার্যভাবে এক নতুন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। রবীন্দ্রনাথের সহানুভূতি বিপ্রদাসের প্রতি। নতুন ব্যবস্থার ভোগলালসার রূপটি আরও বীভৎস বা তীব্র বলে তাঁর মনে হয়েছে।

সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন না করা গেলে শুধুমাত্র ভালোমানুষি করে জমিদারি ছেড়ে দিলে যে বাঞ্ছিত ফল পাওয়া যায় না রবীন্দ্রনাথ সম্যকভাবে বুঝেছিলেন, এটা বাস্তব সত্য, এর জন্য তাঁর শ্রেণি অবস্থানটাকে কটাক্ষ করে লাভ নেই। তিনি জানেন, “জমিদার জমির জোঁক, সে প্যারাসাইট, পরাশ্রিত জীব।” তা সত্ত্বেও তাঁর প্রশ্ন :

“এখন জমিদারি ছেড়ে দিলেই তো হয়? কিন্তু কাকে দেব?… প্রজাকে ছেড়ে দেব? তখন দেখতে দেখতে এক বড়ো জমিদারের জায়গা দশ ছোট জমিদার গজিয়ে উঠবে। রক্ত পিপাসায় বড়ো জোঁকের চেয়ে ছিনে জোঁকের প্রকৃতির কোনও পার্থক্য আছে তা বলতে পারিনে। তুমি বলছ জমি চাষ করে যে জমি তারই হওয়া উচিত। কেমন করে তা হবে জমি যদি পণ্যদ্রব্য হয়, যদি তার হস্তান্তরে বাধা না থাকে?” ২৩

অর্থাৎ জমিদারি সমূলে উচ্ছেদ নাহলে যে কৃষকের প্রকৃত উপকার সাধিত হবে না রবীন্দ্রনাথ সঠিকভাবেই বুঝেছিলেন। জমিদারি মানে শুধু উপস্থিত বা অনুপস্থিত জমিদার নয়, এটা একটা ব্যবস্থা, এর সঙ্গে অনেকগুলি সামাজিক জোট ও জট জড়িয়ে আছে। বড় জমিদার, ছোট জমিদার, মহাজন, কৃষক, ভূমিহীন কৃষক, বর্গাদার, ক্ষেত মজুর—এক জটিল শোষক-শোষিতের জালচক্র।

আমার রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

স্বাধীন ভারতে জমিদারি উচ্ছেদ আইনের পরেও প্রকৃত কৃষক অর্থাৎ জমি যে চাষ করে সে কতটা উপকৃত হয়েছে স্বাধীনতার বাষট্টি বছর পরেও তার খতিয়ান কে করবে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে। পশ্চিমবঙ্গে উদ্বৃত্ত জমি চাষির হাতে গেছে, বর্গাদারের স্বার্থ সুরক্ষিত, ক্ষেতমজুরকে রক্ষার জন্য আইন ও আন্দোলন আছে— বামফ্রন্ট সরকার সেটুকু নিশ্চয়তা বিধান করেছে।

কিন্তু ভারতের অন্যান্য রাজ্যে বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে কতটুকু উদ্বৃত্ত জমি কৃষকের হাতে গেছে? সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ প্রশ্ন ‘জমি যদি পণ্যদ্রব্য হয়, যদি তার হস্তান্তরে বাধা না থাকে?? জমি তো পণ্যদ্রব্যই। তাইতো চাষির দারিদ্রের সুযোগে জমি চালান হয়ে যায়, তাহলে উত্তর কী হবে? সহজ উত্তর নেই।

শ্রেণিব্যবস্থায় এই সব নিরন্তর প্রশ্নের সমাধানে সংগ্রাম জারি করতে হয়, রবীন্দ্রনাথের ধনঞ্জয় বৈরাগীর সংলাপে সেই নির্দেশই রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এখানেই কালজয়ী দ্রষ্টা এবং সংগ্রামপর স্রষ্টা।

অনুনয় চট্টোপাধ্যায়  বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক

অনুনয় চট্টোপাধ্যায় এর “আমার রবীন্দ্রনাথ” এর তথ্য সূত্র :

১. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় – বিবিধ প্রসঙ্গ—বঙ্গদেশের কৃষক, আইন পৃ. ৩১৯

২. তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, বৈশাখি সংখ্যা ১৮৫০

৩. সুলভ সমাচার ১৮৭০

৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—রাশিয়ার চিঠি, পৃ.৯৯

৫. মৈত্রেয়ী দেবী—মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, পৃ.১৯২

৬. মাসিক বসুমতী, চৈত্র ১৩৯৩

৭. রবীন্দ্রনাথ—পল্লিসেবা, পৃ.৬৫

৮. রবীন্দ্রনাথের পত্র অমিয় চক্রবর্তীকে, প্রবাসী, বৈশাখ ১৩৪২

৯. রবীন্দ্রনাথ—কালান্তর, পৃ. ৩৪৫

১০. রবীন্দ্রনাথ কালান্তর, পৃ. ৩৪৫

১১. রবীন্দ্রনাথ—কালান্তর, পৃ. ৩৪৩

১২. রবীন্দ্রনাথ—’স্বদেশী সমাজ’, প্রবন্ধ

১৩. রবীন্দ্রনাথ—কালান্তর, পৃ.৩৪৩

১৪. রবীন্দ্রনাথ—ঐ পূ. ৩৪৩

১৫. রবীন্দ্রনাথ—ছিন্নপত্রাবলী, পত্র সংখ্যা ১৫

১৬. রবীন্দ্রনাথ – The Religion of Man পৃ. ১৬৫

১৭. রবীন্দ্রনাথ – পঞ্চভূত

১৮. রবীন্দ্র রচনাবলী-১৪, পৃ.৫৩৮

১৯. প্রমথনাথ বিশী রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প, পৃ. ১১

২০. তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়—রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার পল্লি পৃ. ৪

২১. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়—রবীন্দ্র সৃষ্টি সমীক্ষা, পৃ. ৫৯২

২২. রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার চিঠি, পঞ্চম পত্র

২৩. রবীন্দ্রনাথ—–কালান্তর, ‘রায়তের কথা’, পৃ. ২৯৫

আরও পড়ুন:

“আমার রবীন্দ্রনাথ – অনুনয় চট্টোপাধ্যায়”-এ 5-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন