আমার রবীন্দ্রনাথ – অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

আমার রবীন্দ্রনাথ [ অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ] : দূর মেলবোর্ন থেকে সাত সকালে কিশোরী এক কবি যাদবপুরে এসে হাজির। কাঁধে ঝুলছে শান্তিনিকেতনের ঝুলি, পায়ে ধূলিধূসরিত স্যান্ডাল। না, ওকে ট্যুরিস্ট ঠাউরে সশ্রদ্ধচিত্তে খারিজ করে দেওয়া চলবে না। সমেহে আপ্যায়নের সুযোগ না দিলে ঝুঁকে প্রণাম করতে উদ্যত হলেই তাকে সিরিয়াসলি বরণ করে নিতে হল। এক নজরেই ঠাহর করতে পারলাম, খ্যাপা এই মেয়েটি পরশপাথর খুঁজতেই বেরিয়েছে।

বিশিষ্ট কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
বিশিষ্ট কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

[ লেখক অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বিশিষ্ট কবি ]

সেই স্পর্শমণির নাম রবীন্দ্রনাথ, একদা আমাদের বহু সাধনার ধন যাঁকে আমরা আজ অভ্যাসের অনাদরে সরিয়ে রেখেছি, শুধু কিনা এক একবার পাবর্ণের অছিলায় স্মরণ করতে বাধ্য হই। ‘স্মরণ’ শব্দটি মরণঘেঁষা। তবু কীভাবে জানি না, মাতৃভাষায় আজ আমাদের দৈন্য দর্পেরই সমার্থক হয়ে উঠেছে বলেই হয়তো আমাদের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর থেকে যে প্রেস্টিজ পারিতোষিক দেওয়া হয় তার নাম রবীন্দ্রপুরস্কার নয়, ‘রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার।’

এরকম আচ্ছন্ন দশায় মেয়েটির অন্বেষা লক্ষ করে কোলোন শহরে। রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘তুমি ঊষার সোনার বিন্দু’ গানটি অনিবার্যতই আমার মনে পড়ে। গেল। এক লহমায় কোথায় উঠে গেল আমার সাংস্কৃতিক নৈরাশ্যবাদ।

অচিরেই জানতে পারলাম সে তার রবীন্দ্রনাথকে খুঁজতেই বেরিয়ে পড়েছে। আর তৎক্ষণাৎ শুরু হয়ে গেল আমার শিক্ষাসুলভ বিশ্রস্তালাপ। সে তার সেতুস্পর্শী লছমন ঝোলায় অজস্র প্রশ্ন জড়ো করে এনেছিল, কিন্তু সে সবই গচ্ছিত রইল। শুধু সমবেত একটি জিজ্ঞাসার—নাকি বিজন আত্মজিজ্ঞাসার—ভরকেন্দ্র ঘিরেই ঘুরপাক খেতে থাকল আমার বাচাল জল্পজাল : রবীন্দ্রনাথ এই মুহূর্তে কোথায়?

আমার রবীন্দ্রনাথ - অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
আমার রবীন্দ্রনাথ

যদি মেলবোর্নের এই মেয়েটিকে বলতাম, তিনি নিখিল ভারতে এখনও ব্যাপ্ত ও বিরাজিত তাহলে ঝামেলা মিটে যেত। কিন্তু সেটা হত ডাহা নির্লজ্জ অমৃতকথন। এই তো ক’দিন আগেই আমাদের রাজধানীতে আবিশ্ব বঙ্গবিদ্যার মঞ্চে সাহিত্য আকাদেমির সহৃদয় সচিবকে প্রকাশ্যেই জিগ্যেস করে বসলাম : শতবার্ষিকীর বিভাবে আমাদের একান্ত বরেণ্য কবি অজ্ঞেয় (সচ্চিদানন্দ হিরানন্দ বাৎসায়ন) ‘গোরা’র কালজয়ী হিন্দি অনুবাদ ঘটিয়ে আধুনিক সাহিত্যে ভারতীয়তার ধ্যানধারণাকে পুনর্নব করে তুলতে পেরেছিলেন, সে কি শুধুই আকাদেমির তৎকালীন সচিবের কৃষ্ণকৃপায় লীন হওয়ার সৌজন্যেই? আসন্ন সার্ধশতবার্ষিকীর মুখে আপনারা কী করছেন?’

আমার এই নাঈভ কৌতূহল ব্যক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই সেমিনার ঘরে শ্মশানের ছমছমে নৈঃশব্দ্য নেমে এল। তাকে আকাদেমিক একটি আত্মপ্রসাদের আচ্ছাদন দেওয়ার প্রাণান্ত প্রয়াসে ডক্টরেট প্রার্থী পরিসংখ্যাতুর দুটি বালিকা ওভারহেড প্রোজেক্টের কাজে লাগিয়ে প্রতিপন্ন করলেন : কবির ‘বউঠাকুরাণীরহাট’ ও ‘নৌকাডুবি’ নামক দুটি নাটক (!?) সমভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় কবেই সু-অনূদিত হয়ে গেছে। এরপর মূর্খের মতো লজ্জায় মাথা হেঁট করে থাকা ছাড়া কোনও গত্যন্তর ছিল না আমার।

আমার রবীন্দ্রনাথ - অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
আমার রবীন্দ্রনাথ

সামগ্রিক সিনারিওটি যে এতই নিদারুণ শোচণীয় সেটা বললে কিন্তু সত্যের অপলাপ হবে। প্রাচ্যেরই আরেকটি দেশ, দক্ষিণ কোরিয়া সরকার আমাদের দেশের প্রধান প্রধান ভাষাসাহিত্যগুলির প্রত্যেকটিকে স্বতন্ত্র সম্মান না জানিয়ে আদ্যোপান্ত ভারতবর্ষ জুড়ে রবীন্দ্রপুরস্কার অর্পণ করবার পুণ্যভার নিয়েছেন। আনন্দের কথা, আমাদের সাহিত্য আকাদেমির হাত দিয়েই অবশ্য সেই পুরস্কার বিতরিত হবে। এবং হয়েছেও। সৌভাগ্যের বিষয়, বাংলা ভাষার সর্বাগ্রণী পারমার্থিক কবি অলোক সরকারকে এবারকার সেই মর্যাদা জ্ঞাপন করা হয়েছে।

সাহিত্য আদাদেমিকে আন্তর ধন্যবাদ। বিশ্বজগতের অন্তর্গত আরেকটি দেশের প্রসারিত হাতে হাত মিলিয়েছে। কিন্তু সৌজন্যমূলক এটুকু ব্রত পালনের সঙ্গে সঙ্গেই কি তার সব আনুষঙ্গিক কাজ হয়ে গেল? আমার এই প্রশ্ন, বলা বাহুল্য, কোনও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্থার উদ্দেশ্যেই নয়, আমার নিজের এবং আমাদের প্রত্যেকের অভিমুখেই নিবদ্ধ। উপরন্তু, আমি জানি, এ ধরনের উদ্যম এবং উদ্যোগের পরতে পরতেই এক রকম অপরাধবোধ অনন্যোপায় প্রৈতির মতো কাজ করে এবং সচরাচর যা হয়, সময়োপোযোগী দায়নির্বাহের লগ্নে শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক রিচুয়্যালের মধ্যেই গোটা ব্যাপারটা পর্যবর্ষিত হয়ে থাকে।

আমার রবীন্দ্রনাথ - অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
আমার রবীন্দ্রনাথ

সবচেয়ে নান্দনিক হয় যখন কিনা আলাদা কোনও প্রস্তুতি গ্রহণের দরকার। পড়ে না, বরং রবীন্দ্রায়নের যথার্থ নাগরিকেরা যখন কিনা উপলব্ধি করেন, সত্যি বলতে ও কাজটা তো আমরা প্রতিদিনই করে আসছি, এবং সেই প্রবহমান প্রক্রিয়ার ভিতর থেকে এক একটি সজীব ঋতুরঙ্গ যেন যথাসময়ে আমরা পরিবেশন করে। উঠতে পারি। দিল্লির সেই বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে এই সৃজনী বিবেকের প্রতিভূস্বরূপ হয়ে উপস্থিত ছিলেন আমাদের বিদগ্ধ বন্ধু আনিসুজ্জামান। তাঁকে কী দিব্যদুর্ভাবনাহয় শীলভদ্র সুন্দর দেখাচ্ছিল।

আসলে মানবিক সৌন্দর্যে তখনই যথার্থের লাবণ্য আসে যখন তার ভিত্তিপুটে মহান কোনও দায়িত্ববোধের অঙ্গীকার ও উত্তরাধিকার অনুস্যুত হয়ে থাকে : কথায় কথায় জানতে পারলাম, সামনের বার ওই সম্মেলন বাংলাদেশেই অনুষ্ঠিত হবে এবং তারই সঙ্গে অনবদ্য জোড়কলমে—এটা অবশ্য আমারই উস্কানি—অন্বিত করে, একই পারমিতায়, রবীন্দ্রনাথের দেড়শো বছরের জন্মোৎসব। পুরো এই যজ্ঞের ঋত্বিক আমাদের সবাকারে আনিস ভাই স্বয়ং।

আমার রবীন্দ্রনাথ - অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
আমার রবীন্দ্রনাথ

কই, কোথাও তো সেই মর্মে তাঁর পরনে কোনও লোক দেখানো যজ্ঞোপবীত নেই, অথবা ধড়াচুড়ো! এমন মানুষকেই মানায় রবীন্দ্রনাথের প্রতি দায়বদ্ধতার ভার বহন করার অধিকার পোষণ, এমন মণীষাকেই আমরা বলতে পারি আমাদের হয়ে তিনি যেন আমাদের রক্ষাকবচপ্রতীম কবির সঙ্গে দোভাষিতা করেন, যেহেতু তিনি জানেন, শেষ অবধি ওই কবি তাঁর উত্তরসূরিদের যত গুরুভার দিয়েছেন সে সব তিনি নিজেই সহজবোধ্য করে দেবেনই দেবেন।

মেলবোর্ন থেকে আমার দেশে শরণার্থী সেই মেয়েটিকে সেদিন আমি বলেছিলাম : ‘তুমি কি ভাবছ তা কিন্তু আদৌ সত্যি নয়। কবুল করে তোমায় বলছি, ভারতবর্ষের যে সব অঞ্চলে বাংলাভাষা নেই সে সব জায়গায় রবীন্দ্রনাথ আজ কেউ নন।’ তাকে আমি সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে এটাও বলেছিলাম : দুই বাংলার এই কবি, যিনি ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা, দুই বাংলার ঈশ্বর হয়েই দাপটে চিরকাল আছেন, এবং এখানেই তাঁর চিরন্তনী ভিসা।

তোমাকে তোমার জন্য আমি, প্রবোধ দেওয়ার জন্য, এটুকুই যোগ করে দিতে পারি, এই কবি বাংলাভাষিত এই দুটি অঞ্চল এবং ভারতবহির্ভূত ভূমণ্ডলের মধ্যে আদিগন্ত যদিও খণ্ডিত ইন্দ্রধনুর সাঁকো হয়ে তখন এবং এখনই, বিরাজমান। পুব বাংলা ও ত্রিপুরাকে জড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ সেই কবিমনীষীর করতলে আশ্রিত। অন্যদিকে ভূমণ্ডল। (বিশেষত ইয়োরোপে) এই সন্ধিক্ষণে, তাঁর আত্মার প্রপন্নার্তি নিয়ে তাঁরই চরণতলে আশ্রয় খুঁজছে।

আমার রবীন্দ্রনাথ - অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
আমার রবীন্দ্রনাথ

আজকের এই দৃশ্যটি বড়ই মনোরম। আমার এই তথ্যসমর্থিত। বিশ্ববীক্ষা কট্টর স্বদেশিদের কাছে ঈষৎ প্রত্যুত্তপ্রবণ বলে মনে হতেই পারে। তাঁরা তো তাঁদের স্মৃতিশক্তির পেশিসঞ্চালন সহকারে বলতেই পারেন, একদা, অর্থাৎ ১৯২১-এ জার্মানির ডার্মস্টার্ট শহরে মৃদঙ্গমন্দিরা বাজিয়ে সেই যে প্রথমতম কবিপক্ষের উদ্বোধন সূচিত হয়েছিল, সেই উদ্দীপনার এতটুকুও রেশ সেখানে আজ কোথায়। চিদ্ঘন সেই তীর্থমুহূর্তে ফ্রাঙ্কফুর্টের নিকটবর্তী ডার্মস্টার্ট শহর বনে গিয়েছিল ধর্মনগর, গিরিবালা হেরগটেন্সবার্গ ব্রহ্মবার্গে, আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘গণেশ’— যে মাহেন্দ্রযোগের আশীর্বাদে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পেয়ে গিয়েছিলেন চিরন্তন রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের সাম্প্রতিকের দুর্মর দোলাচলের মধ্যে থেকে সিদ্ধিদাতা গণেশের রূপক ছবি।

সত্যিই তো, আমি চিরদিনই বধির আঞ্চলিকতা বরবাদ করে দিয়ে সুদূরেরই পীয়াসী। তৎসত্ত্বেও সত্যের খাতিরে এখন এ কথা বলবার সময় এসেছে, ইয়োরোপ তার পরবর্তী রবীন্দ্রবিমুখতার ভুলভ্রান্তি সংশোধন করবার জন্য আজ কেমন যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই তো দেখছি আমার নিকটতম পারিপার্শ্বে অহরহ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হৃদয়ে মন্ত্রিল ডমরু গুরু গুরু।

যদি আমায় তুমি বাঁচাও তবে jodi amay tumi bachao tobe [ কবিতা ] - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [ Rabindranath Tagore ]
এই অনাহত গুরুগম্ভীরা কখনও স্বগত একক, কখনও বা সম্মেলক বৈতালিকে, এই উত্তাল রবীন্দ্রবরণের প্রতিবেদন যখন লিখছি, সুইজারল্যান্ডের এক লালনোপম ফকির—তাঁর নাম আলেক্স গোরেক্স —রবীন্দ্রনাথ ও নৃত্যনাট্যের সম্ভার ভাঙিয়ে সাউন্ডস্কেপের একটি ঐন্দ্রজালিক কোলাজ মঞ্চায়নের জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন।

বাংলা ভাষায় তাঁর প্রবেশাধিকার অকরুণ অর্থেই ক্ষীণ পরিসর। তাই জানি, তাঁর মঞ্চায়ন মহতী ব্যর্থতায় পণ্ড হবেই হবে, অন্যদিকে আমি যে শহরের ক্ষণিকের অতিথি, সেই কোলোনের অদূরেই সংস্কৃতজ্ঞ এক মহাপণ্ডিত, তাঁর নাম এগবার্ট রিশটার, ব্যুহদুরূহ সিন্ধুলিপির চূড়ান্ত পাঠোদ্ধার সম্পন্ন করে সদ্যই মেতে উঠেছেন ‘গীতাঞ্জলী’র জার্মান ভাষান্তরে।

একটু আগেই অদূরভাষে তাঁর সঙ্গে নিবিড় বিনিময় হল। তিনি স্পর্ধিত আত্মপ্রতীতির গরিমায় আমাকে জানালেন, গত কয়েকদিন ধরেই তিনি নিরন্তর তর্জমা করে চলেছেন। একটি হৃদয়কাড়া রবীন্দ্রগীতি : ‘তুমি ঊষার সোনার বিন্দু’। সেটাই নাকি হবে তাঁর এই সমাসন্ন সার্ধশতবার্ষিকী অর্ঘ্যপ্রসূন।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন