আমার রবীন্দ্রনাথ – কামাল লোহানী

আমার রবীন্দ্রনাথ [ কামাল লোহানী ] : নবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের অস্তিত্বের ঠিকানা। প্রাণ প্রাচুর্যের ভাণ্ডার। সাহস ও র বাজার অভিভাবক। তেমনই গর্ব করি আমরা। পাকিস্তানি দুঃশাসনকালেও কবিগুরুকে আমরা লড়াই করেই আমাদের শিরোপরি রেখেছি। পাকিস্তানি শাসকচক্র, কী মুসলিম লিগ, কী সামরিক শাসন, তাদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অভিভাবক মেনে রক্ষা করেছি।

আমার রবীন্দ্রনাথ - কামাল লোহানী
আমার রবীন্দ্রনাথ – কামাল লোহানী

ওরা চেয়েছিল তাঁকে সর্বকালের পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান থেকে একেবারে বিলুপ্ত করে দিতে। কিন্তু পূর্ববঙ্গের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সেদিন ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই’—এই নীতিতে বিশ্বাস করতেন বলে রবীন্দ্র বিরোধিতার সকল অপপ্রয়াসকে নস্যাৎ করে দিতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আজ আমাদের স্বাধীন-সার্বভৌম, মুক্তিযুদ্ধের রক্তোৎপল অস্তিত্ব— গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সমাজের সংস্কারে এক পথিকৃৎ প্রগতি ব্যক্তিত্ব। তাঁর লেখা সেই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রতিবাদী উচ্চারণ ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।

আজ আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। যে রবীন্দ্রনাথকে সমূলে উচ্ছেদ করতে চাওয়া হয়েছিল কুপিত চক্রান্তে, সেই রবীন্দ্রনাথই আজ প্রতিদিন গীত হয় প্রাতঃকালে। একই গান গাইছে সবাই শিশু-কিশোর, যুবা-বৃদ্ধ, হয় পাঠশালা কিংবা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে। যে পতাকা আমাদের অর্জন বিপুল রক্তখরচে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে।

আমার রবীন্দ্রনাথ - কামাল লোহানী
আমার রবীন্দ্রনাথ

স্বেচ্ছাচারী নিপীড়ক আর স্বৈরাচারী শাসকচক্র সামন্তবাদ আর ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে লড়তে রবীন্দ্রনাথকে আমরা পেয়েছি, ব্যবহার করেছি নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে অকপটে, লড়াইয়ের ময়দানে গেয়েছি উচ্চকিত কণ্ঠে সমস্বরে “মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলাভাষা।’

যে গান গেয়ে উদ্বোধন হয়েছিল অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রথম বিস্ফোরণ। সে কেবলমাত্র নবজাত পাকিস্তানের মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে। কিন্তু যাঁরা এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েও পিছিয়ে গিয়েছিলেন ১৯৪৮ সালে, তাঁদের নীরবতাকে ভেঙে প্রগতিশীল তরুণ ছাত্রসমাজ গেয়ে উঠেছিলেন ওই গান।

এবং সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে ১৯৫২ সালে নির্মম হত্যাকাণ্ডে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার প্রাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বাংলা’কে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। কিন্তু বাহান্নতে আমরা সেই পুরোনোদের পেলাম না। তরুণ পথনির্দেশনায় এগিয়ে এসেছিল পূর্ববঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টি। তখনও তো গাইত লড়াকু সংস্কৃতিকর্মীরা : “সঙ্কোচের বিহ্বলতায় নিজেরে অপমান।”

আমার রবীন্দ্রনাথ - কামাল লোহানী
আমার রবীন্দ্রনাথ

এমন অসংখ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের তৎকালীন পূর্ববঙ্গে মুসলিম লিগ শাসনের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করেছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে লড়াই করতে কবিগুরু আমাদের পাশেই থাকতেন। আজও আছেন একই বিভায়। কারণ আমাদের অস্তিত্বে মিশে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

তিনি আছেন লড়াই-সংগ্রামে, আনন্দ-বেদনায়, উৎসব-আয়োজনে, সুখে-দুখে। কী রাজনীতি, সমাজনীতিতে, এমনকী অর্থনীতিতেও আর সাহিত্য সংস্কৃতিতে তো পাকিস্তানি সামরিক শাসনকালে এল রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ। জেনারেল আইয়ুব খান কিছুতেই শতবার্ষিকী উদযাপন করতে দিতে চাননি। কিন্তু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির অস্তিত্ব, রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযাত্রী, তাঁর জন্মশতবর্ষ অবশ্যই পালন করতে দিতে হবে।

এ দাবিতে আমরা অনড় থাকায় সামরিক কর্তৃপক্ষ শতবর্ষ পালনে বাধা দিল না। সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই সকল অনুষ্ঠান পালিত হয়েছিল। কিন্তু তাজ্জবের ব্যাপার, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে তিনি দেশের বরেণ্য দুই শিল্পী—সুরকার শেখ লুৎফর রহমান ও আব্দুল লতিফকে ডেকে জিগ্যেস করেছিলেন, “আপনারা রবীন্দ্রসঙ্গীত লিখতে পারেন না?” দুজনই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।

আমার রবীন্দ্রনাথ - কামাল লোহানী
আমার রবীন্দ্রনাথ

এই ঘটনায় সামরিক শাসক ও তাদের তাবেদারদের জ্ঞান-বুদ্ধির বহর যাই প্রমাণিত হোক না কেন, রবীন্দ্র বিরোধিতায় তাদের জুড়ি ছিল না। ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি জাতীয় পরিষদে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি করে বলেছিলেন, Rabindranath Tagore was never a part of our culture and literature এই খবর প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদের ঝড় উঠল পূর্ববাংলায়।

পাকিস্তানে তখন জবরদস্ত মার্শাল ল’ চলছে। এরই মধ্যে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল মার্কসবাদী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী এবং প্রতিবাদ জানিয়েছিল সভা করে। যে সংবাদ ইংরেজি দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’ পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল Regimentation of Culture শিরোনামে। সামরিক শাসনকালে এমন সাহস প্রদর্শন করেছিলেন পত্রিকার তৎকালীন নিউজ এডিটর এ বি এম মুসা।

সংবাদটি প্রকাশের পর সচেতন জনগোষ্ঠী বিশেষ করে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী মহলে দারুণ প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ সৃষ্টি করেছিল। ‘ক্রান্তি’ বৈঠকী সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, এরা অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও যোগাযোগের মাধ্যমে সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

আমার রবীন্দ্রনাথ - কামাল লোহানী
আমার রবীন্দ্রনাথ

তবে অন্যরা মার্শাল ল-র কারণে হয়ত বা পিছিয়ে থাকল কিন্তু ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’ তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্যদের সকলের কাছে টেলিগ্রাম মারফত ওই উক্তির প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী শাহাবুদ্দিনকে জাতীয় সংসদের ফ্লোরেই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানায়। এমনকী পশ্চিম পাকিস্তান পরিষদের সদস্যদের কাছেও এই টেলিগ্রাম বার্তা পাঠিয়েছিলেন।

এরপর ক্রান্তি প্রেসক্লাবে এক ছাত্র-জনতার সমাবেশের আয়োজন করে। ইতিমধ্যে তৎকালীন পূর্ববাংলার জনপ্রিয় ও খ্যাতিমান রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা প্রতিষ্ঠান ‘ছায়ানট’ও এগিয়ে এসে কবি জসিউদ্দিনের বাসায় একটি পৃথক বৈঠক আয়োজন করে। পরে অবশ্য দুটি সভার উদ্যোক্তাদের সম্মিলন ঘটান শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক সিরাজউদ্দিন হোসেন (শহীদ), কে পি মোস্তাক (প্রয়াত), এ বি এম মুর্মু, ওয়াহিদুল হক, আব্দুল মতিন, কামাল লোহানী প্রমুখ।

ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে প্রেসক্লাবে দুইটি পৃথক উদ্যোগকে যৌথ বৈঠকের মাধ্যমে ‘সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদ’-এ রূপান্তরিত করা হয়। এর যুগ্ম আহ্বায়ক মনোনীত হন ওয়াদিদুল হক এবং আমি (কামাল লোহানী)। এই কমিটি খাজা শাহাবুদ্দিনের কবিগুরু সম্পর্কে কটূক্তি এবং বেতারে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারে নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে, কবিগুরুর সঙ্গীত, নৃত্যনাট্য, কবিতা আবৃত্তি ও নাটকে ব্যাপকভাবে উপস্থাপন করা  হবে।

আমার রবীন্দ্রনাথ - কামাল লোহানী
আমার রবীন্দ্রনাথ

দারুণ সাড়া পড়ে গেল শহরে তো বটেই, এমনকী ঢাকার বাইরে থেকেও বহু রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন অনুষ্ঠানমালায়। বেশ চলছিল প্রতিদিনের অনুষ্ঠান। লোকে লোকারণ্য ঢাকার তখনকার একমাত্র আধুনিক মিলনায়তন ইসকান্দার মীর্জা হল (বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট অডিটোরিয়াম)। কিন্তু অলক্ষ্যে ওই সময় পিশাচদের রক্তচক্ষু অবিরতই গণবিরোধী হিংস্রতায় বুঝি চলছিল। তাই আচমকাই হামলা করার অভিসন্ধি এঁটেছিল দুষ্কৃতির দল। ভড়কে গিয়েছিল জলস্রোতের প্রবল তোড়ে।

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁ যে দুষ্কৃতিদের দুটো ট্রাকে বোঝাই করে পাঠিয়েছিল, তারাও বোধহয় এমন দর্শক-শ্রোতা সমাগমে হিংস্রতা প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত হল। ভেবেছিল দ্বিতীয় শো’র সময়ে হামলা চালানো হবে। ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন এবং হায়দার আকবর খান রণো পাটখড়ির মতো শরীর নিয়ে হঠাৎ দেখি পাঁজাকোলা করে বেশ কিছু ‘হকিস্টিক’ আমাদের দিয়ে গেল, গ্রিনরুমে। তাজ্জব হয়ে জিগ্যেস করতেই বলল, “রেখে দিন, কাজে লাগতে পারে।”

এলেন ছাত্রনেতা রেজা আলি। ছাত্র ইউনিয়ন ও সংস্কৃতি সংসদ সংগঠক ছিলেন তিনি। খবর পেয়ে আমাদের উদ্ধারে ছুটে এসেছেন। বর্তমানে আওয়ামি লিগ সংসদ সদস্য। শেষ পর্যন্ত আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছিলাম সকলকে। এই তো এমনি করেই কবিগুরু আমাদের অস্তিত্বে মিশে আছেন। থাকবেনও। তিনিই বলেছিলেন, “বাধা দিলে বাধবে লড়াই,” বেধেছিল, সেই লড়াই, সেই আমরা লড়ে জিতে নিয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথকে।

[ লেখক কামাল লোহানী  বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ ]

আরও পড়ুন:

“আমার রবীন্দ্রনাথ – কামাল লোহানী”-এ 7-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন