আমার রবীন্দ্রনাথ – কেইকো আজুমা সেনসেই

আমার রবীন্দ্রনাথ [ কেইকো আজুমা সেনসেই ] : মার বাবা তিব্বতী ভাষার পণ্ডিত ছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আশাবানা থেকে ওঁকে চিনে পাঠানো হয় বাধ্যতামূলক যুদ্ধ করার জন্য। ১৯৪৫ সালে চিনের যুদ্ধে আমার বাবা যখন মারা গেলেন, আমার বয়স তখন ৯ বছর। কাজেই যুদ্ধের ক্ষত ছোটবেলা থেকেই আমার মনে ছিল। ১৯৫৭-তে আমি যখন টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় দর্শন বিভাগের স্নাতক শ্রেণির ছাত্রী, তখন ওই বিভাগেরই স্নানকোত্তর শ্রেণির এক ছাত্রের সঙ্গে আমার পরিচয় ও সখ্যতা হল। যুবকটি জার্মান ভাষার পাঠ শেষ করে ভারতীয় দর্শন বিভাগে ভরতি হয়েছিলেন। তাঁর নাম কাজুও আজুমা।

আমার রবীন্দ্রনাথ – কেইকো আজুমা সেনসেই
আমার রবীন্দ্রনাথ

১৯৬১ সালে জাপানে ভারতীয় কবি ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উদযাপন বেশ ঘটা করে পালিত হল। সেই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের নানা গ্রন্থ জাপানি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ১৯১৬ থেকে ১৯২৯ এর মধ্যে মোট পাঁচবার রবীন্দ্রনাথ জাপানে এসেছিলেন।

জাপানি সংস্কৃতিকে অন্তর থেকে ভালোবেসেও তিনি জাপানের উগ্র জাতীয়তাবাদ, বস্তুতান্ত্রিক মনোভাব ও সমরনীতির কড়া সমালোচনা করেছিলেন। সেজন্য জাপানে তাঁর বিরূপ সমালোচনা হলেও জাপান রবীন্দ্রনাথকে আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে আসছে। রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর থেকেই, ইংরেজি ভাষা থেকে জাপানি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের নানা রচনা অনূদিত হতে শুরু করে।

আমার রবীন্দ্রনাথ – কেইকো আজুমা সেনসেই
আমার রবীন্দ্রনাথ

কাজুও আজুমার কিছু ভারতীয় ও বাংলাদেশি বন্ধু ছিলেন যাঁরা বাংলা ভাষা জানতেন। বিশিষ্ট জাপানি পণ্ডিত, শ্যোকো ওয়াতানারের কাছে আমরা দুজনে বাংলা ভাষার চর্চা শুরু করেছিলাম। কাজুও আজুমার সঙ্গে আমার বিয়ে হল। আমার তো মনে হয় ভারতবর্ষের প্রতি আমাদের দুজনের আকর্ষণই আমাদের বিয়ের প্রকৃত ঘটকালি করেছিল।

টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের দুজনের গুরু ছিলেন প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ হাজিমো নাকামুরা। তাঁর মাধ্যমেই ১৯৬৭ সালে আমার স্বামী শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর জাপানি বিভাগে অধ্যাপনার আমন্ত্রণ পেয়ে তা গ্রহণ করলেন। আমরা দুজনেই তখন রবীন্দ্রনাথে মগ্ন। বাংলা ভাষাও আয়ত্তে এসেছে।

আমার রবীন্দ্রনাথ – কেইকো আজুমা সেনসেই
আমার রবীন্দ্রনাথ

এক বছরের জন্য শান্তিনিকেতনে গেলেও আমার স্বামী সেখানে থেকে গিয়েছিলেন সাড়ে তিন বছর। আমার স্বামী শান্তিনিকেতনে যাওয়ার এক বছর পর আমাদের দুই শিশুকন্যা, ইয়োশিকো ও সোনোকো-কে নিয়ে আমিও হাজির হলাম শান্তিনিকেতনে। তারপর আমরা শান্তিনিকেতনী হয়ে গেলাম।

রবীন্দ্রনাথের আশ্রমের আকাশ-বাতাস থেকে আনন্দের খোরাক সংগ্রহ করা, হাত দিয়ে ভাত খাওয়া, মুড়ি খাওয়া, সাইকেলের পিছনে চাপিয়ে মেয়েকে আনন্দ পাঠশালায় নিয়ে যাওয়া, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞদের সাথে গ্রামে ঘোরা—আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে গেল।

বাঙালি রান্না করা শিখলাম–ভাত, ডাল, মাংসের ঝোল, চাটনি। আমার মেয়ে আনন্দ পাঠশালায় প্রথম প্রথম খুবই গম্ভীর হয়ে থাকত। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার স্নানকোত্তর থিসিস-এর বিষয় ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’। তাই আমার বাংলা ভাষার চর্চা তো ছিলই। মেয়েকে বাংলা বলাবার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু খুব একটা কাজ হচ্ছিল না।

আমার রবীন্দ্রনাথ – কেইকো আজুমা সেনসেই
আমার রবীন্দ্রনাথ

হঠাৎ একদিন শুনি, আমার চার বছরের জাপানি মেয়ে শান্তিনিকেতনে বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করে বলছে, ‘এই এরকম কথা বলবে না কিন্তু!’ আর একদিন তার মুখেই শুনি, ‘সুর ধরতে দে। আমরা আপ্লুত হয়েছিলাম। মেয়ে চমৎকার রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখল। কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে গেয়ে প্রথম পুরস্কার পেল। রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে গেলেন মূলত সেই সময় থেকে।

(১৯৭১-এ আমরা জাপানে ফিরে এলাম। আমার স্বামী তারপর ৎসুকুবা, রেইতাকুর মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ দিন অধ্যাপনা করেছেন। আমাদের চিবা জেলার ইচিকাওয়ার বাড়িতে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে রবীন্দ্রনাথের বই-এর পাহাড় আমাদের ক্রমশই গ্রাস করেছে। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে আমাদের যোগসূত্র ক্রমাগত দৃঢ় হয়েছে। জাপানে আমাদের প্রতিষ্ঠিত জাপান-ভারত রবীন্দ্র সংস্থার মাধ্যমে মূলত রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে অসংখ্য বিনিময়মূলক অনুষ্ঠান হয়েছে।

আমার রবীন্দ্রনাথ – কেইকো আজুমা সেনসেই
আমার রবীন্দ্রনাথ

এই সংস্থারই উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের ‘নিপ্পন ভবন’ ও কলকাতায় ভারত জাপান সংস্কৃতি কেন্দ্র গড়ে উঠে জাপানের সঙ্গে ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন করেছে। অবশ্যই ঋষি-কবি রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে। শান্তিনিকেতন আর কলকাতা থেকে অগণিত গুণীজন এসেছেন জাপানে আমাদের ইচিকাওয়ার বাড়িতে।

রবীন্দ্রনাথের বই-এর পাহাড় দেখে তাঁরা অবাক হয়েছেন। আমরা স্বামী-স্ত্রী তাঁদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আলোচনা করেছি, রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে শুনিয়েছি, বাংলা ভাষায় কথা বলে বাঙালি রান্না করে খাইয়েছি।

আমার রবীন্দ্রনাথ – কেইকো আজুমা সেনসেই
আমার রবীন্দ্রনাথ

২০০২ নাগাদ আমার স্বামীর কিডনি দুটি অচল হয়ে যায়। তিনি এখন শয্যাশায়ী, প্রায় চেতনাহীন। গত দু-বছর তিনি হাসপাতালের নিঃসঙ্গ বিছানায়। যত দিন জ্ঞান ছিল, চিকিৎসার যন্ত্রণার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথের বই বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছেন।

শান্তিনিকেতন, বিশ্বভারতী বা কলকাতা থেকে কেউ এলে খুব কষ্ট করে কিছু দিন আগে পর্যন্ত হাসবার চেষ্টা করেছেন। যখন প্রায় জ্ঞান চলে যাচ্ছে, তখন হাসপাতালে ওঁকে দেখতে এসে কেউ একজন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাংলা ভাষা মনে আছে?’ আমার স্বামী কথা বলতে পারলেন না, শুধু ওঁর মুখটা সম্ভবত অভিমানে লাল হয়ে গেল। বাংলা ভাষা আর রবীন্দ্রনাথ সেই ছাত্রজীবন থেকে আমাদের রক্তে। জন্মসূত্রে ভারতীয় নই। কিন্তু আমরা দুজনে ষোলো আনা বাঙালি।

সাংস্কৃতিক কাজে আমার স্বামীর শেষ সঞ্চয়টুকু শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমরা স্বেচ্ছায় আমাদের উপার্জিত অর্থ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিতে কলকাতার রবীন্দ্র-ওকাকুরা ভবনের নির্মাণে দান করে কৃতার্থ হয়েছিলাম। আমার স্বামীর চিকিৎসার খরচ বাড়ছিল। কাজেই এক সময় ইচিকাওয়ায় আমাদের বহু স্মৃতি-বিজড়িত বাড়ি বিক্রি হয়ে গেল। তিল তিল করে সংগ্রহ করা বইগুলির নানা গ্রন্থাগারে পাঠিয়ে দিলাম। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক বইগুলি আমাদের পারিবারিক বন্ধু ও সন্তানসম নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে নিয়ে গেলেন।

জাপানে, আমার রবীন্দ্র-অন্তপ্রাণ স্বামী কাজুও আজুমা এখন একটি হাসপাতালে শয্যাশায়ী। প্রতিদিন, এক কামরার একটি ছোট্ট বাড়ি থেকে আমি তাঁর কাছে গিয়ে বসি। চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে রবীন্দ্রনাথের মুখ— যে মানুষটি আমাদের বেঁধে দিয়েছিলেন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে, যে মানুষটির পথ চেয়ে আমরা দুজন কাটিয়ে দিলাম একটি দীর্ঘ, আনন্দময় জীবন।

[ কেইকো আজুমা সেনসেই বিশিষ্ট রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ কাজুও আজুমার সহধর্মিনী, জাপান ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন